মহাবিশ্বের কেন্দ্র আসলে কোথায়? 

মহাবিশ্বের কেন্দ্র কোথায়? এই প্রশ্নটি হয়তো ছোটবেলা থেকে আমাদের সবার মনেই উঁকি দিয়েছে। আমরা কি মহাবিশ্বের মাঝখানে আছি? নাকি সূর্য? নাকি অন্য কোনো ব্ল্যাকহোল? হাজার বছর ধরে মানুষ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে। কখনো ভেবেছে পৃথিবীই সবকিছুর কেন্দ্র, আবার কখনো সূর্যকে কেন্দ্র ভাবা হয়েছে।

কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান কী বলছে? বিগ ব্যাং কি কোনো নির্দিষ্ট বিন্দুতে হয়েছিল? আজকের আর্টিকেলে আমরা মহাবিশ্বের কেন্দ্র নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা এবং বিজ্ঞানের বিস্ময়কর সত্যগুলো জানব।

মহাবিশ্বের কেন্দ্র নিয়ে মানুষের আদি ধারণা (ইতিহাস)

প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ নিজেকে বিশেষ কিছু ভাবতে পছন্দ করত। তাই মহাবিশ্বের কেন্দ্রের ধারণাটি যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়েছে। চলুন ইতিহাসের পাতা থেকে একটু ঘুরে আসি:

  • জিওসেন্ট্রিক মডেল (পৃথিবী কেন্দ্রিক): খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দে অ্যারিস্টটল ধারণা দিয়েছিলেন যে, পৃথিবীই মহাবিশ্বের কেন্দ্র। তখন মনে করা হতো চাঁদ, সূর্য এবং অন্যান্য নক্ষত্র পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে।

  • হেলিওসেন্ট্রিক মডেল (সূর্য কেন্দ্রিক): ১৫৪৩ সালে নিকোলাস কোপার্নিকাস এই ভুল ভাঙেন। তিনি বলেন, পৃথিবী নয়, সূর্যই মহাবিশ্বের কেন্দ্র এবং পৃথিবীসহ অন্য গ্রহগুলো সূর্যের চারপাশেই ঘুরছে।

  • গ্যালিলিও ও ব্রুনোর মতবাদ: পরবর্তীতে গ্যালিলিও জুপিটারের উপগ্রহ আবিষ্কার করে প্রমাণ করেন যে, সবকিছু পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘোরে না। আর ১৫৮০-এর দশকে জর্দান ব্রুনো প্রস্তাব করেন যে, মহাবিশ্ব অসীম হতে পারে এবং আকাশে থাকা প্রতিটি তারার নিজস্ব জগত আছে। যদিও এজন্য তাকে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হয়েছিল।

আমরা কি আসলে মহাবিশ্বের কেন্দ্রে আছি? (অবজারভেবল ইউনিভার্স)

বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে আমরা জেনেছি যে সূর্যও মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়, এটি মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির হাজার কোটি নক্ষত্রের মধ্যে একটি সাধারণ নক্ষত্র মাত্র। তাহলে কেন্দ্র কোথায়?

এর উত্তর পেতে হলে আমাদের ‘অবজারভেবল ইউনিভার্স’ বা দৃশ্যমান মহাবিশ্বের ধারণাটি বুঝতে হবে।

  • দৃশ্যমান মহাবিশ্ব কী? পৃথিবী থেকে আমরা যতদূর পর্যন্ত দেখতে পাই (টেলিস্কোপের সাহায্যে), সেটাই আমাদের অবজারভেবল ইউনিভার্স। এর ব্যাসার্ধ প্রায় ৪৬.৫ বিলিয়ন আলোকবর্ষ।

  • কেন্দ্রের আপেক্ষিকতা: আপনি যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, সেখান থেকেই আপনার দৃশ্যমান মহাবিশ্বের শুরু। অর্থাৎ, অবজারভেবল ইউনিভার্সের বিচারে আপনি নিজেই কেন্দ্র।

  • যদি কোনো এলিয়েন অন্য কোনো গ্যালাক্সিতে থাকে, তবে তার সাপেক্ষে দৃশ্যমান মহাবিশ্ব হবে ভিন্ন। অর্থাৎ, এটি সম্পূর্ণ আপেক্ষিক একটি বিষয়। যার কোনো নির্দিষ্ট বা পরম কেন্দ্র নেই।

সহজ উদাহরণ: সাগরে মাঝখানে দাঁড়িয়ে আপনি যেমন চারদিকে শুধু পানি দেখেন এবং নিজেকে মাঝখানে মনে হয়, মহাবিশ্বের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ঠিক তেমনই।

বিগ ব্যাং কোথায় হয়েছিল? সেখানেই কি কেন্দ্র?

অনেকের ধারণা, বিগ ব্যাং বা মহাবিশ্বের সৃষ্টি কোনো একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে বা পয়েন্টে হয়েছিল। আর সেই বিন্দুটিই হয়তো মহাবিশ্বের কেন্দ্র। কিন্তু এটি একটি মস্ত বড় ভুল ধারণা।

কেন বিগ ব্যাং কোনো নির্দিষ্ট বিন্দুতে হয়নি?

অনলাইনের বিভিন্ন সোর্সের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিগ ব্যাং কোনো আতশবাজির বিস্ফোরণ নয় যা একটি ফাঁকা জায়গায় ঘটেছে। বরং বিগ ব্যাং-এর আগে স্থান (Space) বা সময় (Time) কোনো কিছুরই অস্তিত্ব ছিল না।

  • বেলুন থিওরি: একটি বেলুনের গায়ে অনেকগুলো ফোঁটা (গ্যালাক্সি) এঁকে যদি ফোলানো হয়, তবে ফোঁটাগুলো একে অপরের থেকে দূরে সরে যাবে। কিন্তু বেলুনের পৃষ্ঠের কোনো কেন্দ্র নেই।

  • স্পেসের প্রসারণ: বিগ ব্যাং মহাবিশ্বের প্রতিটি স্থানে একই সময়ে ঘটেছে। অর্থাৎ, পুরো মহাবিশ্বটাই বিগ ব্যাং-এর কেন্দ্র।

মহাবিশ্বের কি কোনো ভরকেন্দ্র (Center of Mass) আছে?

আমাদের সৌরজগত সূর্যের ভরের কারণে সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি তার কেন্দ্রে থাকা সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলকে কেন্দ্র করে ঘোরে। তাহলে পুরো মহাবিশ্ব কি কোনো বিশাল ভরকে কেন্দ্র করে ঘুরছে?

আধুনিক কসমোলজিক্যাল প্রিন্সিপাল অনুযায়ী:

১. কসমিক ওয়েব (Cosmic Web): মহাবিশ্বের গঠন জালের মতো।

২. সমজাতীয়তা (Homogeneity): আপনি মহাবিশ্বের যেদিকেই তাকান না কেন, বড় স্কেলে ভরের ঘনত্ব সবজায়গাতেই প্রায় সমান।

কোথাও এমন কোনো বিশাল পুঞ্জীভূত ভর নেই যাকে কেন্দ্র করে পুরো মহাবিশ্ব ঘুরবে। তাই বিজ্ঞানের ভাষায়, মহাবিশ্বের কোনো নির্দিষ্ট ভরকেন্দ্র নেই।

মহাবিশ্বের আকৃতি ও আমাদের সীমাবদ্ধতা

মহাবিশ্বের কেন্দ্র না থাকার আরেকটি কারণ হলো এর আকৃতি। আমরা জানি না মহাবিশ্ব সসীম নাকি অসীম।

  • অসীম মহাবিশ্ব: যদি মহাবিশ্ব অসীম হয়, তবে জ্যামিতিকভাবে তার কোনো কেন্দ্র নির্ণয় করা অসম্ভব।

  • সীমাবদ্ধতা: আমরা মহাবিশ্বের ভেতরে আছি, তাই এর পুরো আকৃতি বাইরে থেকে দেখা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। অনেকটা একটি বিল্ডিংয়ের ভেতর রুমের মধ্যে বন্দি থেকে পুরো বিল্ডিংয়ের নকশা বোঝার চেষ্টার মতো।

শেষ কথা

তাহলে সহজ কথায় উত্তর কী? উত্তর হলো: মহাবিশ্বের কোনো পরম কেন্দ্র নেই।

  • জিওমেট্রিক বা জ্যামিতিক ভাবে এর কোনো কেন্দ্র নেই।

  • বিগ ব্যাং সবজায়গাতেই ঘটেছে, তাই সব জায়গাই কেন্দ্র।

  • দৃশ্যমান মহাবিশ্বের বিচারে, প্রত্যেক দর্শকই (Observer) তার নিজস্ব মহাবিশ্বের কেন্দ্র।

মহাবিশ্ব সম্পর্কে আপনার এই কৌতূহল মেটানোই ছিল আজকের আর্টিকেলের উদ্দেশ্য। বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত নতুন নতুন তথ্য আমাদের সামনে আনছে, কে জানে ভবিষ্যতে হয়তো আমরা আরও বিস্ময়কর কিছু জানতে পারব!

Leave a Comment

Scroll to Top