বাংলাদেশ সরকার কর ব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। ধনীদের ওপর কর আরোপের ক্ষেত্রে প্রচলিত ‘সারচার্জ’ (Surcharge) পদ্ধতি বাতিল করে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নতুন করে ‘সম্পদ কর’ (Wealth Tax) চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সাথে, জমি ও স্থাবর সম্পত্তির মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও আসছে যুগান্তকারী পরিবর্তন।
এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিত জানব নতুন এই সম্পদ কর কী, কাদের ওপর এটি প্রভাব ফেলবে এবং সাধারণ করদাতাদের জন্য এর অর্থ কী।
সম্পদ কর (Wealth Tax) কী?
সম্পদ কর বা Wealth Tax হলো একজন ব্যক্তির মালিকানাধীন মোট সম্পত্তির বাজার মূল্যের ওপর ধার্য করা একটি বার্ষিক কর। বর্তমানে বাংলাদেশে সরাসরি কোনো ‘সম্পদ কর’ নেই, তবে নির্দিষ্ট সীমার বেশি সম্পদ থাকলে আয়করের ওপর একটি অতিরিক্ত ‘সারচার্জ’ দিতে হয়। নতুন নিয়মে এই সারচার্জ পদ্ধতি বাতিল করে সরাসরি সম্পদের মূল্যের ওপর কর বসানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সম্পদ করের নতুন নিয়ম
সরকারের এই নতুন উদ্যোগের ফলে কর ব্যবস্থায় মূলত দুটি বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে:
১. প্রচলিত সারচার্জ পদ্ধতি বাতিল
বর্তমানে নিট সম্পদের পরিমাণ একটি নির্দিষ্ট সীমা (যেমন: ৪ কোটি টাকা বা তার বেশি) অতিক্রম করলে করদাতাদের তাদের প্রদেয় আয়করের ওপর ১০% থেকে ৩৫% পর্যন্ত সারচার্জ দিতে হয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে এই পদ্ধতিটি আর থাকছে না। এর বদলে সরাসরি মোট সম্পদের ওপর ভিত্তি করে ‘সম্পদ কর’ নির্ধারণ করা হবে।
২. সম্পত্তির বাজার ভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ
আগে জমি বা ফ্ল্যাটের মতো স্থাবর সম্পদের মূল্য নির্ধারণ করা হতো ‘দলিল মূল্য’ (Deed Value) অনুযায়ী। কিন্তু নতুন পরিকল্পনায়:
- দলিলের মূল্যের পরিবর্তে সম্পদের বাজার মূল্য (Market Value) বা মৌজা মূল্য (Mouza Value) ব্যবহার করা হবে।
- এর ফলে সম্পদের প্রকৃত মূল্যের ওপর ভিত্তি করে কর আদায় করা সম্ভব হবে, যা কর ফাঁকি রোধে সাহায্য করবে।
এই পরিবর্তনের ফলে কাদের ওপর প্রভাব পড়বে?
এই নতুন কর নীতিটি মূলত উচ্চবিত্ত এবং বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির মালিকদের লক্ষ্য করে তৈরি করা হচ্ছে।
- যাদের একাধিক স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে: জমি, ফ্ল্যাট বা বাণিজ্যিক প্লটের প্রকৃত বাজার মূল্য হিসাব করা হলে তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।
- বর্তমান সারচার্জ প্রদানকারী করদাতা: যারা বর্তমানে সারচার্জ দিচ্ছেন, তাদের নতুন নিয়মে সম্পদ করের আওতায় আসতে হবে।
বিঃদ্রঃ সাধারণ বা মধ্যবিত্ত করদাতা, যাদের সম্পদের পরিমাণ নির্দিষ্ট করযোগ্য সীমার নিচে, তাদের ওপর এই সম্পদ করের কোনো প্রভাব পড়বে না। —
কেন এই কাঠামোগত পরিবর্তন?
সরকারের এই উদ্যোগের পেছনে বেশ কয়েকটি যৌক্তিক কারণ রয়েছে:
- রাজস্ব বৃদ্ধি: বাজার মূল্যে সম্পদের হিসাব করা হলে সরকারের রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
- বৈষম্য হ্রাস: প্রকৃত সম্পদের ওপর কর আরোপের মাধ্যমে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে আনা।
- কালো টাকা রোধ: দলিল মূল্য কম দেখিয়ে সম্পত্তি কেনাবেচার যে প্রবণতা রয়েছে, বাজার বা মৌজা মূল্য কার্যকর হলে তা অনেকটাই কমে যাবে।
- আধুনিক কর ব্যবস্থা: বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের মতো সরাসরি সম্পদ কর ব্যবস্থা চালু করে কর কাঠামোকে আরও যুগোপযোগী করা।
সাধারন জিজ্ঞাসা
বাংলাদেশে কি বর্তমানে সম্পদ কর আছে?
না, বর্তমানে বাংলাদেশে সরাসরি কোনো ‘সম্পদ কর’ নেই। তবে নির্দিষ্ট সীমার বেশি সম্পদ থাকলে আয়করের সাথে অতিরিক্ত ‘সারচার্জ’ প্রদান করতে হয়। ২০২৬-২৭ বাজেট থেকে সরাসরি সম্পদ কর চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
জমি ও স্থাবর সম্পদের মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করা হবে?
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, জমি ও স্থাবর সম্পদের মূল্য আর দলিল মূল্যের ওপর নির্ভর করবে না। এর পরিবর্তে সম্পত্তির বর্তমান বাজার মূল্য বা সরকার নির্ধারিত মৌজা মূল্যের ভিত্তিতে সম্পদের দাম নির্ধারণ করা হবে।
নতুন সম্পদ কর কবে থেকে কার্যকর হবে?
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন এই সম্পদ কর ব্যবস্থা আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সাধারণ করদাতাদের কি সম্পদ কর দিতে হবে?
না, সরকার নির্ধারিত নির্দিষ্ট সীমার নিচে যাদের সম্পদ রয়েছে, তাদের এই কর দিতে হবে না। এটি মূলত উচ্চবিত্ত বা அதிக সম্পদশালীদের জন্য প্রযোজ্য হবে।
সোর্স: জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) নীতি পরিকল্পনা এবং সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংবাদ বিশ্লেষণ (কালের কণ্ঠ)।
