আগামী ১১ জুন সংসদে পেশ হতে যাচ্ছে নতুন সরকারের ৯ লাখ কোটি টাকার মেগা বাজেট। এই বাজেটের মূল লক্ষ্য হলো মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি ‘ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি’-তে পরিণত করা। রাজস্ব আয় বাড়াতে আইএমএফ-এর শর্ত মেনে প্রচলিত সারচার্জ বাতিল করে নতুন ‘সম্পদ কর’ (Wealth Tax) আরোপ, সাধারণ মানুষের জন্য ফ্যামিলি ও হেলথ কার্ড চালু এবং কর ফাঁকি রোধে সব নাগরিককে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও কিউআর (QR) কোড লেনদেনের আওতায় আনার যুগান্তকারী উদ্যোগ থাকছে এই বাজেটে।
নতুন বাজেটের আকার ও সামষ্টিক অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা
অর্থনীতির নানামুখী সংকটের মধ্যেও সরকার গতানুগতিক পথ থেকে বেরিয়ে একটি সম্প্রসারণমূলক বাজেট প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। বিগত বছরের তুলনায় প্রায় ১৪% বাড়িয়ে এবারের বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকা।
- রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য: ৬.৫ লাখ কোটি টাকা।
- জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধি: ৬.৫ শতাংশ।
- মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে এনে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার টার্গেট।
- উন্নয়ন প্রকল্প (ADP): উন্নয়ন খাতে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।
- পরিচালনা ব্যয়: বাজেটের মোট আকারের প্রায় ৬৭ ভাগ ব্যয় হবে পরিচালন খাতে।
কর ও রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন
রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) শর্ত পূরণে কর ব্যবস্থায় আসছে অভিনব কিছু কৌশল।
১. সম্পদ কর (Wealth Tax) ও ভ্যাট সম্প্রসারণ
- সারচার্জ বাতিল ও সম্পদ কর: ধনীদের ওপর আগে যে সারচার্জ আরোপ করা হতো, তা বাতিল করে সরাসরি সম্পদের প্রকৃত মূল্যের ওপর ভিত্তি করে ‘সম্পদ কর’ চালু করা হতে পারে।
- বাড়ির মালিকদের নজরদারি: ঢাকা ও বড় শহরগুলোতে বাড়ির মালিকদের আয়কর রিটার্ন কঠোরভাবে যাচাই করা হবে।
- এসএমই (SME) খাতে ভ্যাট: ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) খাতকে এবার ভ্যাটের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
২. লেনদেনে স্বচ্ছতা আনতে ডিজিটাল উদ্যোগ
কর ফাঁকি ও জালিয়াতি পুরোপুরি বন্ধ করতে সরকার কয়েকটি ধাপে ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে:
- ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বাধ্যতামূলক: নির্দিষ্ট সীমার ওপর যেকোনো লেনদেনে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে।
- সবার জন্য ব্যাংক হিসাব: দেশের প্রতিটি নাগরিককে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনা হবে।
- QR কোড লেনদেন: “ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড” এবং “ওয়ান ডিজিটাল আউটলেট” নীতির মাধ্যমে দেশের সব মানুষকে কিউআর কোড দিয়ে লেনদেনে অভ্যস্ত করা হবে।
- অব্যাহতি বাতিল: কর অব্যাহতি এবং বিশেষ প্রণোদনার সুবিধা ধীরে ধীরে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হবে।
সাধারণ মানুষের জন্য বাজেটে কী থাকছে?
নতুন সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘আর্থিক-সামাজিক চুক্তি’-এর কথা উল্লেখ করেছিল। অর্থাৎ, জনগণ কর দেবে এবং এর বিনিময়ে সরকার নাগরিক সেবা নিশ্চিত করবে। দরিদ্র মানুষের কষ্ট লাঘবে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বেশ কিছু কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে:
- ফ্যামিলি কার্ড: স্বল্প আয়ের মানুষদের ভর্তুকি মূল্যে পণ্য দিতে ফ্যামিলি কার্ডের পরিসর বাড়ানো।
- কৃষক কার্ড: প্রান্তিক কৃষকদের সরাসরি আর্থিক ও কৃষি উপকরণ সহায়তা প্রদান।
- হেলথ কার্ড: সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে হেলথ কার্ডের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ ও বিনিয়োগ ঝুঁকি
বাজেটের আকার বড় হলেও এটি বাস্তবায়নে সরকারকে বড় অংকের ঋণ নিতে হবে। এই অতিরিক্ত অর্থের জোগান (প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা) একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
- ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট (Crowding Out Effect): সরকার যদি ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়, তবে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকে পর্যাপ্ত ঋণ দেওয়ার সুযোগ কমে যাবে।
- কর্মসংস্থানে প্রভাব: বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমলে নতুন বিনিয়োগ ব্যাহত হবে, যা দেশের কর্মসংস্থান তৈরিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
- সমাধান: অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশীয় ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে বিদেশ থেকে ফান্ডের প্রবাহ বাড়াতে হবে এবং পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে হবে।
প্রায়শ জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কবে পেশ হবে?
নতুন সরকারের প্রথম এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে পেশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যমাত্রা কত?
নতুন বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সম্পদ কর বা Wealth Tax কী এবং এটি কাদের দিতে হবে?
সারচার্জ পদ্ধতির বদলে নতুন বাজেটে সম্পদ কর চালুর আলোচনা চলছে। মূলত উচ্চবিত্ত এবং বিপুল স্থাবর সম্পত্তির মালিকদের প্রকৃত সম্পদের মূল্যের ওপর এই কর ধার্য করা হবে।
সরকার কীভাবে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হতে চায়?
দুর্নীতি কমানো, কর পরিধি বাড়ানো, সব নাগরিককে ডিজিটাল লেনদেন ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের আওতায় আনা এবং ইকোনমিক অ্যাক্সিলারেশন বা অর্থনীতিতে গতি বৃদ্ধির মাধ্যমে সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
তথ্যসূত্র (Sources): যমুনা টেলিভিশন (Jamuna TV) নিউজ রিপোর্ট এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতামত।
