আরাফার দিনের ফজিলত ও করণীয়

আরাফার দিনের ফজিলত ও করণীয়

আরাফার দিন হলো পবিত্র জিলহজ মাসের ৯ তারিখ, যেদিন হাজিরা আরাফাতের ময়দানে সমবেত হন। এই দিনের সবচেয়ে বড় ফজিলত হলো, যারা হজ করছেন না তারা যদি আরাফার দিন রোজা রাখেন, তবে আল্লাহ তায়ালা তাদের বিগত এক বছর এবং আগামী এক বছরের (মোট দুই বছরের) ছোট গুনাহগুলো মাফ করে দেন (সহিহ মুসলিম)। এই দিনের প্রধান করণীয়গুলোর মধ্যে রয়েছে— রোজা রাখা, বেশি বেশি তওবা-ইস্তিগফার করা, তাকবিরে তাশরিক পড়া এবং নিজের ও উম্মাহর জন্য মন খুলে দোয়া করা

ইসলামিক ক্যালেন্ডারে জিলহজ মাস অত্যন্ত পবিত্র একটি মাস। আর এই মাসের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ দিন হলো ‘ইয়াওমুল আরাফাহ’ বা আরাফার দিন। বাংলাদেশি মুসলিমদের মনে এই দিনটি নিয়ে অনেক প্রশ্ন থাকে, যেমন— রোজা কবে রাখব, কী দোয়া পড়ব ইত্যাদি।

আরাফার দিন কী এবং এর গুরুত্ব কেন এত বেশি?

হজের মূল রোকন বা ফরজ হলো আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা। জিলহজ মাসের ৯ তারিখ হাজিরা মিনা থেকে আরাফাতের ময়দানে এসে সমবেত হন এবং সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি ও দোয়া করেন। এই দিনটিকে ইসলামে বছরের শ্রেষ্ঠ দিনগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়। কারণ এই দিনেই আল্লাহ তায়ালা ইসলাম ধর্মকে পরিপূর্ণতা দান করে কোরআনের আয়াত নাজিল করেছিলেন।

আরাফার দিনের ফজিলত

হাদিসের আলোকে আরাফার দিনের অনেকগুলো ফজিলত প্রমাণিত। নিচে এর প্রধান ফজিলতগুলো তুলে ধরা হলো:

  • ১. দুই বছরের গুনাহ মাফ: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আরাফার দিনের রোজার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে, তিনি এর মাধ্যমে আগের এক বছর এবং পেছনের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।” (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)
  • ২. জাহান্নাম থেকে সর্বাধিক মুক্তি: নবীজি (সা.) বলেন, “আল্লাহ তায়ালা আরাফার দিনে যত বেশিসংখ্যক বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন, অন্য কোনো দিন এত মানুষকে মুক্তি দেন না।” (সহিহ মুসলিম: ১৩৪৮)
  • ৩. শয়তানের চরম হতাশা: এই দিনে আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের এত বেশি রহমত বর্ষণ করেন ও ক্ষমা করেন যে, শয়তান আরাফার দিনের মতো আর কোনো দিন এত বেশি অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয় না। (মুয়াত্তা মালেক)
  • ৪. শ্রেষ্ঠ দোয়া কবুলের দিন: এই দিনের দোয়া আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়। আল্লাহ তায়ালা প্রথম আসমানে নেমে এসে ফেরেশতাদের কাছে তাঁর বান্দাদের নিয়ে গর্ব করেন।

আরাফার দিনের করণীয় ও আমলসমূহ

আপনি যদি হজ না করে থাকেন এবং বাড়িতে অবস্থান করেন, তবে এই বরকতময় দিনটিকে কোনোভাবেই হেলায় হারানো উচিত নয়। নিচে আরাফার দিনের প্রধান আমলগুলো দেওয়া হলো:

১. আরাফার রোজা রাখা
যারা হজ করছেন না, তাদের জন্য ৯ জিলহজ রোজা রাখা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ বা অত্যন্ত তাগিদপূর্ণ সুন্নাত। এই একটি রোজার বিনিময়ে দুই বছরের গুনাহ মাফ হয়।

২. বেশি বেশি দোয়া করা
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “শ্রেষ্ঠ দোয়া হলো আরাফা দিবসের দোয়া।” তাই এই দিন নিজের জন্য, পিতা-মাতা, পরিবার ও সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য বেশি বেশি দোয়া করুন।

৩. আরাফার দিনের সেরা দোয়া পড়া
নবীজি (সা.) আরাফার দিনে একটি বিশেষ দোয়া বেশি বেশি পড়তেন। দোয়াটি হলো:

“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির।”
অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তাঁরই এবং প্রশংসাও তাঁর। আর তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। (তিরমিজি: ৩৫৮৫)

৪. তাকবিরে তাশরিক পাঠ করা
৯ জিলহজ ফজরের নামাজ থেকে শুরু করে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর একবার তাকবিরে তাশরিক পড়া প্রাপ্তবয়স্ক সবার জন্য ওয়াজিব।
তাকবিরটি হলো: “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।”

৫. তওবা ও ইস্তিগফার
যেহেতু এটি ক্ষমার দিন, তাই বিগত জীবনের সকল পাপের জন্য কায়মনোবাক্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বেশি বেশি পড়তে হবে।

বাংলাদেশিদের জন্য একটি জরুরি মাসআলা: আরাফার রোজা কবে রাখব?

বাংলাদেশের অনেক মানুষের মনে একটি কনফিউশন থাকে যে, সৌদি আরবের আরাফাতের দিন (সৌদির ৯ জিলহজ) রোজা রাখবেন নাকি বাংলাদেশের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৯ জিলহজ রোজা রাখবেন।

ফতোয়া ও সমাধান: ইসলামিক স্কলারদের (ফিকহবিদদের) সর্বসম্মত মত হলো, ইসলামিক ইবাদতগুলো চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল। রাসূল (সা.) বলেছেন, “তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে রোজা ভাঙো।” তাই বাংলাদেশের মানুষদের জন্য বাংলাদেশের আকাশে চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে যেদিন ৯ জিলহজ হবে, সেদিনই আরাফার রোজা রাখতে হবে। সৌদি আরবের সাথে মিলিয়ে নয়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

প্রশ্ন ১: হাজিরা কি আরাফার দিনে রোজা রাখবেন?
উত্তর: না, যারা হজে গিয়ে আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করছেন, তাদের জন্য রোজা রাখা মুস্তাহাব নয়। কারণ রাসূল (সা.) আরাফাতের ময়দানে অবস্থানকালে রোজা রাখেননি, যাতে হজের রোকনগুলো পালনে শারীরিক দুর্বলতা না আসে। এই রোজা মূলত তাদের জন্য যারা হজ করছেন না।

প্রশ্ন ২: আরাফার রোজা কি শুধু একটি রাখা যায়, নাকি আগের দিনও রাখতে হয়?
উত্তর: আরাফার রোজা মূলত একটিই (৯ জিলহজ)। তবে জিলহজ মাসের প্রথম ৯ দিন রোজা রাখার ব্যাপক ফজিলত হাদিসে বর্ণিত আছে। কেউ চাইলে ১ থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত রোজা রাখতে পারেন। তবে শুধুমাত্র ৯ তারিখ একটি রোজা রাখলেও সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে।

প্রশ্ন ৩: আরাফার দিনের রোজা রাখলে কি কবিরা গুনাহ মাফ হয়?
উত্তর: জুমহুর উলামায়ে কেরামের (অধিকাংশ স্কলারের) মতে, নফল রোজা বা আমলের মাধ্যমে মূলত সগিরা (ছোট) গুনাহ মাফ হয়। কবিরা (বড়) গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহর কাছে খাঁটি অন্তরে তওবা করা শর্ত। তবে আরাফার দিনের বরকতে আল্লাহ চাইলে কবিরা গুনাহও মাফ করে দিতে পারেন।

প্রশ্ন ৪: মহিলাদের ঋতুস্রাব (পিরিয়ড) চলাকালীন আরাফার দিনের আমল কী হবে?
উত্তর: পিরিয়ড চলাকালীন মহিলারা রোজা রাখতে ও নামাজ পড়তে পারবেন না। তবে তারা জিকির, তওবা, ইস্তিগফার, দরুদ শরিফ এবং কোরআনের আয়াতগুলো দোয়া হিসেবে পড়তে পারবেন। অন্তরে অনুশোচনা নিয়ে দোয়া করলে আল্লাহ তাদেরও আরাফার দিনের পূর্ণ সওয়াব দান করবেন।

শেষকথা

আরাফার দিন (৯ জিলহজ) আমাদের জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশাল উপহার। দুনিয়ার ব্যস্ততায় আমরা অনেক গুনাহ করে ফেলি। নিজের আমলনামাকে গুনাহমুক্ত করার জন্য আরাফার দিনের ফজিলত ও করণীয়গুলো পালন করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অত্যন্ত জরুরি। তাই আসুন, আমরা সবাই সঠিক দিনে (নিজ নিজ দেশের ৯ জিলহজ তারিখে) রোজা রাখি এবং আল্লাহর কাছে নিজের ও সমগ্র পৃথিবীর মানুষের জন্য কল্যাণ প্রার্থনা করি।

(তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, জামে তিরমিজি ও নির্ভরযোগ্য ফিকাহ গ্রন্থসমূহ। কনটেন্টটি সম্পূর্ণ নির্ভুল তথ্য দিয়ে সাজানো হয়েছে, তবে যেকোনো জটিল মাসআলায় আপনার নিকটস্থ মুফতি বা আলেমের পরামর্শ গ্রহণ করা উত্তম।)

Leave a Comment

Scroll to Top