কুরবানির গোস্ত সমান তিন ভাগে ভাগ করা মুস্তাহাব (উত্তম) — এক ভাগ নিজে ও পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর জন্য, এবং এক ভাগ গরিব-মিসকিনদের জন্য। এটি শর্ত নয়, তবে রাসূল (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরামের আমল অনুযায়ী এটিই সর্বোত্তম পদ্ধতি।
কুরবানির গোস্ত বন্টন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ঈদুল আজহায় পশু কুরবানি দেওয়াই শেষ কথা নয়। কুরবানির মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর নৈকট্য অর্জন এবং সমাজের সকল স্তরের মানুষের মধ্যে খাদ্য ও আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। তাই পশু জবাইয়ের পরেই শুরু হয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব — গোস্ত সঠিকভাবে বন্টন করা।
অনেকে মনে করেন, সব গোস্ত নিজেরা রেখে দিলেও কুরবানি হয়ে যায়। এই ধারণা আংশিক সত্য হলেও, ইসলামের শিক্ষা ও রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী এটি চরম কৃপণতার নিদর্শন। বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে অনেকেই গোস্ত বন্টনের সঠিক নিয়ম জানেন না — এই আর্টিকেলে সেটাই বিস্তারিতভাবে জানাবো।
কুরবানির গোস্ত বন্টনের নিয়ম — কোরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে সুরা হজ্জের ২৮ নম্বর আয়াতে বলেন:
“অতঃপর তোমরা উহা হতে আহার করো এবং দুঃস্থ, অভাবগ্রস্তকে আহার করাও।” — (সুরা হজ্জ: ২৮)
একই সুরার ৩৬ নম্বর আয়াতে আরও বলা হয়েছে:
“তোমরা তা থেকে খাও এবং মিসকিন ও ফকিরকে খাওয়াও।” — (সুরা হজ্জ: ৩৬)
এই দুটি আয়াত থেকে স্পষ্ট যে কুরবানির গোস্ত শুধু নিজে খাওয়ার জন্য নয়, বরং গরিব-মিসকিনদেরও অধিকার আছে।
হাদিসে কুরবানির গোস্ত বন্টনের নির্দেশনা
রাসূল (সা.) কীভাবে গোস্ত বন্টন করতেন?
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) রাসূল (সা.)-এর কুরবানির গোস্ত বন্টনের পদ্ধতি সম্পর্কে বর্ণনা করেন:
- এক ভাগ — নিজের পরিবারের জন্য রাখতেন
- এক ভাগ — গরিব প্রতিবেশীদের দিতেন
- এক ভাগ — সায়েল-ফকিরদের (যারা চেয়ে নেয়) দান করতেন
(সূত্র: আল ওযায়েফ, আবু মুসা আল-আসবাহানি; মুগনি ইবনে কুদামা ১৩/৩৭৯-৩৮০)
রাসূল (সা.) আরও বলেছেন:
“তোমরা নিজেরা খাও, অন্যকে আহার করাও এবং সংরক্ষণ করো।” — (সহিহ বুখারি: ৫৫৬৯)
ইবনে মাসউদ (রা.)-এর আমল
বিশিষ্ট সাহাবি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) কুরবানির গোস্ত তিনভাগ করতেন:
- এক ভাগ নিজেরা খেতেন
- এক ভাগ যাকে চাইতেন তাকে খাওয়াতেন
- এক ভাগ ফকির-মিসকিনকে দিতেন
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)-এর বর্ণনা
“কুরবানির পশুর এক-তৃতীয়াংশ পরিবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ আত্মীয়-প্রতিবেশীর জন্য, এক-তৃতীয়াংশ মিসকিনদের জন্য।”
কুরবানির গোস্ত তিন ভাগ করার সঠিক পদ্ধতি
ধাপ ১: গোস্ত সমানভাবে পরিমাপ করুন
কুরবানির পশু সম্পূর্ণ কাটার পর সব গোস্ত একত্রিত করে সমান তিনটি ভাগে ভাগ করুন। সঠিক পরিমাপের জন্য দাড়িপাল্লা বা পাল্লা ব্যবহার করা যেতে পারে।
ধাপ ২: তিন ভাগের বরাদ্দ ঠিক করুন
| ভাগ | পরিমাণ | কার জন্য |
|---|---|---|
| প্রথম ভাগ | মোট গোস্তের ১/৩ অংশ | নিজে ও পরিবারের জন্য |
| দ্বিতীয় ভাগ | মোট গোস্তের ১/৩ অংশ | আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর জন্য |
| তৃতীয় ভাগ | মোট গোস্তের ১/৩ অংশ | গরিব-মিসকিন ও অসহায়দের জন্য |
ধাপ ৩: দ্রুত বিতরণ করুন
গোস্ত যত দ্রুত সম্ভব বিতরণ করুন। যাদের কুরবানি দেওয়ার সামর্থ্য নেই, তাদের কাছে আগে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করুন।
কুরবানির গোস্ত বন্টনের গুরুত্বপূর্ণ মাসায়েল
১. তিন ভাগ কি বাধ্যতামূলক?
না, তিন ভাগ করা বাধ্যতামূলক (ওয়াজিব) নয়। ইমাম শাফেয়ি, ইমাম আহমাদ (রহ.) সহ বহু বিদ্বান তিনভাগ করাকে মুস্তাহাব (উত্তম ও পুণ্যজনক) বলেছেন। (সুবুলুস সালাম শরহ বুলূগুল মারাম ৪/১৮৮)
তবে মনে রাখতে হবে — সব গোস্ত একা রেখে দেওয়া ইসলামের সুন্নাহ-বিরোধী এবং নববী শিক্ষার পরিপন্থি।
২. সম্পূর্ণ গোস্ত কি নিজে খাওয়া জায়েজ?
হ্যাঁ, জায়েজ। তবে ফকিহগণ এটিকে চরম কৃপণতার নিদর্শন বলেছেন। (বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪, আলমগিরি ৫/৩০০)
৩. সম্পূর্ণ গোস্ত দান করা যাবে?
হ্যাঁ, পুরো গোস্ত সদকা হিসেবে গরিবদের মধ্যে বিতরণ করা জায়েজ এবং এটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
৪. গোস্ত বিক্রি করা যাবে?
না। কুরবানির গোস্ত, হাড়, চামড়া — কিছুই বিক্রি করা জায়েজ নেই। কুরবানির চামড়া বিক্রি করলে সেই টাকা গরিবদের দান করতে হবে, নিজের কাছে রাখা যাবে না।
৫. গোস্ত কতদিন সংরক্ষণ করা যাবে?
সাধারণ সময়ে যতদিন নষ্ট না হয় ততদিন সংরক্ষণ করা জায়েজ। তবে দুর্ভিক্ষ বা অভাবের বছরে তিন দিনের বেশি সংরক্ষণ করা উচিত নয়।
(দলিল: সালামা ইবনে আকওয়া (রা.)-এর হাদিস; তিরমিজি: ১৫১০, ইবনে মাজাহ: ৩১৬০)
৬. অমুসলিমকে কুরবানির গোস্ত দেওয়া যাবে?
হ্যাঁ, কোনো অমুসলিম প্রতিবেশী বা অভাবী অমুসলিমকে কুরবানির গোস্ত দেওয়া জায়েজ।
৭. মান্নতের কুরবানির গোস্ত কীভাবে বন্টন করবেন?
মান্নতের কুরবানির গোস্ত কুরবানিদাতা ও তার পরিবার নিজেরা খেতে পারবেন না — পুরোটা গরিবদের মধ্যে বিতরণ করতে হবে।
বাংলাদেশে প্রচলিত “সমাজের ভাগ” — জায়েজ না নাজায়েজ?
বাংলাদেশের অনেক গ্রাম ও শহরে একটি প্রথা প্রচলিত আছে — সব কুরবানিদাতার থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ গোস্ত সংগ্রহ করে তা একটি কেন্দ্রীয় স্থান থেকে বন্টন করা হয়।
এ বিষয়ে আলেমদের মতামত:
- যদি কুরবানিদাতারা স্বেচ্ছায় ও খুশি মনে গোস্ত দেন এবং তা শুধু গরিব-অসহায়দের মধ্যে বিতরণ হয় — তাহলে জায়েজ।
- যদি জোরপূর্বক বা সামাজিক চাপে গোস্ত নেওয়া হয় — তাহলে নাজায়েজ।
- যে কুরবানিদাতা নিজেই গোস্ত জমা দিয়ে পরে ওই পুলড গোস্ত থেকে অংশ ফিরে পান — এটি কুপ্রথা এবং কৃপণতার নিদর্শন।
- মান্নতের কুরবানির গোস্ত এই পুলে দেওয়া একদম জায়েজ নেই, কারণ সে গোস্তে শুধু গরিবদের হক।
গরিব ও অসহায়দের অধিকার — কেন অগ্রাধিকার দেবেন?
কুরবানির মূল দর্শন হলো ত্যাগ ও সমতা। সমাজের যাদের কুরবানি দেওয়ার সামর্থ্য নেই, তারাও যেন ঈদের দিন ভালো খাবার খেতে পারেন — এটি নিশ্চিত করাই কুরবানিদাতার নৈতিক দায়িত্ব।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে — দিনমজুর, রিকশাচালক, গৃহকর্মী, ছিন্নমূল মানুষ — এদের কাছে সরাসরি গোস্ত পৌঁছে দেওয়া সবচেয়ে ভালো। মসজিদ কমিটি বা স্থানীয় সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমেও বিতরণ করা যায়।
কুরবানির চামড়া ও অন্যান্য অংশের হুকুম
| অংশ | বিধান |
|---|---|
| গোস্ত | খাওয়া যায়, দান করা যায়, তবে বিক্রি করা যাবে না |
| চামড়া | নিজে ব্যবহার করা যায়; বিক্রি করলে টাকা গরিবদের দিতে হবে |
| হাড় | নিজে ব্যবহার করা বা দান করা যায় |
| ভুঁড়ি | পরিষ্কার করে খাওয়া যায় |
| কসাইয়ের পারিশ্রমিক | কুরবানির গোস্ত দিয়ে পারিশ্রমিক দেওয়া যাবে না; আলাদা টাকা দিতে হবে |
শিশুর নামে কুরবানি হলে গোস্ত কে খাবে?
অভিভাবকের পক্ষ থেকে যদি কোনো শিশুর সম্পত্তির ওপর কুরবানি দেওয়া হয়, তাহলে সেই কুরবানির গোস্ত শুধুমাত্র সেই শিশুর জন্য। শিশুর পরিবার বা অভিভাবকরা সেই গোস্ত নিজেরা খেতে পারবেন না।
গরু বা মহিষে ভাগে কুরবানি — গোস্ত কীভাবে ভাগ হবে?
গরু বা মহিষে সর্বোচ্চ ৭ জন শরিক হয়ে কুরবানি দিতে পারেন। এক্ষেত্রে গোস্ত বন্টনের নিয়ম:
- প্রতিটি শরিকের অংশ সমান হতে হবে
- কাউকে কম বা বেশি দেওয়া যাবে না (যদি না সবাই সম্মত হন)
- গোস্তের পরিবর্তে মাথা, পা বা অন্য অঙ্গ দিয়ে কোনো শরিকের ভাগ পূরণ করা যাবে না
- প্রতিটি শরিক তার নিজের ১/৭ অংশ থেকে আবার তিন ভাগে ভাগ করে বিতরণ করবেন
সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
কুরবানি হয়ে যাবে, কারণ তিন ভাগ করা ওয়াজিব নয়, মুস্তাহাব। তবে গরিবদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা নৈতিকভাবে ঠিক নয় এবং রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহর পরিপন্থি।
হ্যাঁ, যতদিন খাওয়ার উপযোগী থাকে ততদিন ফ্রিজে রাখা জায়েজ। তবে প্রয়োজনীয় পরিমাণের বেশি জমা না রেখে গরিবদের মধ্যে বিতরণ করা উত্তম।
হ্যাঁ, রান্না করেও বিতরণ করা যাবে। অনেক পরিবার ঈদের দিন গরিব-প্রতিবেশীদের রান্না করা খাবার দেন — এটি অত্যন্ত পুণ্যজনক কাজ।
হ্যাঁ, দেওয়া যাবে। অমুসলিম প্রতিবেশীকে উপহার হিসেবে কুরবানির গোস্ত দেওয়া জায়েজ। এটি সুসম্পর্ক ও পারস্পরিক সহাবস্থানের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
না, কসাইকে কুরবানির গোস্ত দিয়ে মজুরি দেওয়া জায়েজ নেই। আলাদা অর্থে পারিশ্রমিক দিতে হবে। তবে উপহার হিসেবে পরে কিছু গোস্ত দেওয়া জায়েজ।
নফল কুরবানিতেও একই নিয়ম প্রযোজ্য — তিনভাগে ভাগ করা মুস্তাহাব।
আকিকার গোস্ত বিতরণের নিয়মও কুরবানির মতোই। কিছু নিজেদের জন্য রাখা, কিছু আত্মীয়-স্বজনকে দেওয়া এবং কিছু সদকা করা উত্তম। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৩০৪)
যদি কোনো সংস্থার মাধ্যমে কুরবানি দেন, তাহলে সেই সংস্থাকে স্পষ্টভাবে বলুন গরিবদের মধ্যে গোস্ত বিতরণ করতে। আপনার নিজের জন্য কোনো অংশ চাইলে সেটা আগেই ঠিক করুন।
কুরবানির গোস্ত বন্টনে যা করবেন এবং যা করবেন না
করবেন ✅
- গোস্ত সমানভাবে ভাগ করুন, পাল্লা ব্যবহার করুন
- গরিব-মিসকিন, প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের প্রাপ্য অংশ নিশ্চিত করুন
- ঈদের দিনেই বিতরণের চেষ্টা করুন
- যারা কুরবানি দিতে পারেননি তাদের আগে দিন
- চামড়া বিক্রির টাকা গরিবদের দিন
করবেন না ❌
- কুরবানির গোস্ত বিক্রি করবেন না
- কসাইয়ের মজুরি গোস্ত দিয়ে দেবেন না
- গোস্ত দিয়ে কোনো পারিশ্রমিক বা লেনদেন করবেন না
- মান্নতের কুরবানির গোস্ত নিজে খাবেন না
- সমাজের নামে জোরপূর্বক গোস্ত নেওয়া বা দেওয়া থেকে বিরত থাকুন
শেষকথা
কুরবানির গোস্ত বন্টনের নিয়ম ইসলামে স্পষ্টভাবে নির্দেশিত। রাসূল (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকে আমরা জানি — তিন ভাগে ভাগ করে নিজে, আত্মীয়-প্রতিবেশী এবং গরিব-মিসকিনকে দেওয়াই সর্বোত্তম পদ্ধতি।
কুরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল পশু জবাই নয় — এটি আল্লাহর প্রতি ত্যাগের প্রকাশ এবং সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ। তাই আসুন, কুরবানির গোস্ত সঠিকভাবে বন্টন করে এই ইবাদতকে পরিপূর্ণ করি।
বিশ্বাসযোগ্য সূত্রসমূহ (References)
- পবিত্র কোরআন — সুরা হজ্জ: ২৮, ৩৬
- সহিহ বুখারি: হাদিস ৫৫৬৯
- সুনানে তিরমিজি: ১৫১০
- সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩১৬০
- মুগনি ইবনে কুদামা: ১৩/৩৭৯-৩৮০
- বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২২৪
- আলমগিরি: ৫/৩০০
- সুবুলুস সালাম শরহ বুলূগুল মারাম: ৪/১৮৮
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৩০৪
- মাসিক আল-কাউসার (alkawsar.com)
- আজকের পত্রিকা — ইসলামিক বিভাগ (জুন ২০২৫)
এই আর্টিকেলটি নির্ভরযোগ্য ইসলামিক সূত্র ও হাদিস গ্রন্থ অনুযায়ী প্রস্তুত করা হয়েছে। যেকোনো ব্যক্তিগত মাসয়ালার জন্য স্থানীয় বিশ্বস্ত আলেম বা মুফতির পরামর্শ নিন।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”


