আরাফার দিনের সেরা দোয়া কোনটি?
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন —
“সর্বোত্তম দোয়া হলো আরাফার দিনের দোয়া।”
(তিরমিজি: ৩৫৮৫)
আরাফার দিনে রাসুল (সা.) যে দোয়াটি সবচেয়ে বেশি পড়েছেন এবং পড়তে বলেছেন, সেটি হলো:
✅ আরাফার দিনের সেরা দোয়া (আরবি)
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
বাংলা উচ্চারণ:
লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারিকালাহু, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু, ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির।
বাংলা অর্থ:
আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তাঁরই, প্রশংসাও তাঁর। এবং তিনি সকল বিষয়ের ওপর পূর্ণ ক্ষমতাবান।
হাদিসের সূত্র: তিরমিজি: ৩৫৮৫ | আহমাদ: ৬৯৬১
আরাফার দিন কোনটি? (ইয়াওমে আরাফা কী?)
জিলহজ মাসের ৯ তারিখ হলো ইয়াওমে আরাফা বা আরাফার দিন। এটি ঈদুল আযহার ঠিক আগের দিন।
এই দিনে হাজিরা মক্কার নিকটবর্তী আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করেন, যা হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরজ রোকন। রাসুল (সা.) বলেছেন —
“আলহাজ্জু আরাফাহ” — অর্থাৎ “হজ হলো আরাফা।”
(তিরমিজি, আবু দাউদ)
২০২৫ সালে বাংলাদেশে আরাফার দিন: ৫ জুন ২০২৫ (স্থানীয় চাঁদ দেখার উপর নির্ভরশীল)
আরাফার দিনের ফজিলত ও মর্যাদা
আরাফার দিনটি সারা বছরের মধ্যে সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ দিনগুলোর একটি। হাদিসের আলোকে এর মর্যাদা অপরিসীম।
১. সর্বোত্তম দিন
হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন —
“সর্বোত্তম দিন হলো আরাফার দিন।”
(সহিহ ইবনে হিব্বান)
২. জাহান্নাম থেকে মুক্তির দিন
এই দিন আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। আল্লাহ এই দিন তাঁর ফেরেশতাদের সামনে হাজিদের নিয়ে গর্ব করেন এবং বলেন —
“আমার বান্দাদের দেখো, তারা হজের জন্য এলোমেলো চুল ও ধূলিময় অবস্থায় দূর দিগন্ত থেকে এসেছে। তারা আমার রহমত আশা করে।”
(সহিহ ইবনে হিব্বান)
৩. দোয়া কবুলের বিশেষ সুযোগ
রাসুল (সা.) বলেছেন — “সর্বোত্তম দোয়া হলো আরাফার দিনের দোয়া।” (তিরমিজি: ৩৫৮৫)
ইবনে আব্দুল বার (রহ.) বলেছেন, এ হাদিস প্রমাণ করে যে আরাফার দিনের দোয়া নিশ্চিতভাবে কবুল হয়।
৪. দুই বছরের গুনাহ মাফ (রোজার মাধ্যমে)
রাসুল (সা.) বলেছেন —
“আরাফার দিন রোজা রাখলে আমি আশাবাদী যে আল্লাহ তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।”
(সহিহ মুসলিম: ২৬১৭)
আরাফার দিনের সম্পূর্ণ দোয়া তালিকা
আরাফার দিনে কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত বিভিন্ন দোয়া পড়া উত্তম। নিচে সেগুলো দেওয়া হলো:
দোয়া ১: তাহলিল (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ)
আরবি:
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির।
অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তাঁর, প্রশংসা তাঁর, এবং তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।
সূত্র: তিরমিজি ৩৫৮৫, আহমাদ ৬৯৬১
দোয়া ২: ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা)
আরবি:
أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الْعَظِيمَ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ
উচ্চারণ: আস্তাগফিরুল্লাহাল আযিম আল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম ওয়া আতুবু ইলাইহি।
অর্থ: আমি মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, যিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই, যিনি চিরঞ্জীব, সর্বদা বিদ্যমান। আমি তাঁর কাছে তওবা করছি।
দোয়া ৩: দরুদ ও তাসবিহ
আরবি:
سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ، سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ
উচ্চারণ: সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আযিম।
অর্থ: আল্লাহ পবিত্র এবং তাঁর প্রশংসাসহ, মহান আল্লাহ পবিত্র।
দোয়া ৪: তাকবির (বিশেষভাবে জিলহজের দিনগুলোতে)
আরবি:
اللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ وَلِلَّهِ الْحَمْدُ
উচ্চারণ: আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ।
অর্থ: আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান। আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান এবং সকল প্রশংসা তাঁর।
দোয়া ৫: রাসুল (সা.)-এর বিদায় হজের দোয়া
আরবি:
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي وَارْحَمْنِي وَتُبْ عَلَيَّ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফিরলি ওয়ারহামনি ওয়া তুব আলাইয়্যা।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি দয়া করুন এবং আমার তওবা কবুল করুন।
আরাফার দিনে দোয়া করার উত্তম সময় কখন?
এটি অনেকের মনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সঠিক উত্তরটি হলো:
হাজিদের জন্য উত্তম সময়: জোহর ও আসরের নামাজ একত্রে পড়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। এটিই আরাফার মূল ওকুফের সময়।
হাজি নন যারা (সাধারণ মুসলমান): সারা দিনই দোয়া করা যায়। তবে নির্জনে, একাগ্রচিত্তে এবং ওজু অবস্থায় দোয়া করলে বেশি কার্যকর হয়।
দোয়ার সময়সূচি (হাজিদের জন্য):
- সকাল — ফজরের পর থেকে আরাফার ময়দানে রওনা
- দুপুর — জোহর ও আসরের নামাজ একত্রে জমা করে আদায়
- বিকেল-সন্ধ্যা — জোহরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত (সবচেয়ে উত্তম সময়)
আরাফার দিনের রোজা: নিয়ম ও ফজিলত
রোজার ফজিলত কী?
রাসুল (সা.) বলেছেন —
“আরাফার দিনের রোজা সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে, তাতে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বছরের গুনাহের কাফফারা হয়ে যাবে।”
(সহিহ মুসলিম: ২৬৩৬)
এ ছাড়া জিলহজের প্রথম নয় দিনের প্রতি দিনের রোজা এক বছরের রোজার সমতুল্য।
রোজার নিয়ত (আরবি ও বাংলা)
আরবি:
نَوَيْتُ أَنْ أَصُومَ صَوْمَ يَوْمِ عَرَفَةَ لِلَّهِ تَعَالَى
উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন আসুমা সাওমা ইয়াওমি আরাফাতা লিল্লাহি তাআলা।
অর্থ: আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আরাফার দিনের রোজার নিয়ত করলাম।
বাংলাদেশে রোজা কোনদিন রাখবেন?
গুরুত্বপূর্ণ: বাংলাদেশে স্থানীয় চাঁদ দেখার ভিত্তিতে যেদিন ৯ জিলহজ হবে, সেদিনই আরাফার রোজা রাখুন। সৌদি আরবের তারিখ অনুসরণ করলে ফজিলত পাওয়া নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে — তাই নিজের দেশের তারিখ অনুসরণ করাই নিরাপদ।
আরাফার দিনের আমল: কী কী করবেন?
হাজি হোন বা না হোন — আরাফার দিনে নিচের আমলগুলো করুন:
১. ফজর থেকে রাত পর্যন্ত বেশি বেশি দোয়া করুন
বিশেষত লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু… দোয়াটি বারবার পড়ুন।
২. রোজা রাখুন
হাজিরা রোজা রাখবেন না — তবে অন্য মুসলমানদের জন্য এই দিনের রোজা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
৩. তাকবিরে তাশরিক পড়ুন
আরাফার দিন থেকে ১৩ জিলহজ পর্যন্ত প্রতিটি ফরজ নামাজের পর তাকবির পড়া ওয়াজিব।
৪. ইস্তিগফার ও তওবা করুন
মন খুলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। এই দিনটি তওবার জন্য সর্বোত্তম।
৫. কোরআন তিলাওয়াত করুন
সূরা আল-মায়িদা (৩ নম্বর আয়াত) এই দিনে নাজিল হয়েছিল।
৬. দরুদ পড়ুন
রাসুল (সা.)-এর উপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করুন।
৭. ব্যক্তিগত দোয়ায় আল্লাহকে ডাকুন
নিজের ভাষায়, নিজের সমস্যার কথা আল্লাহকে জানান — এই দিনে তিনি সবচেয়ে বেশি শোনেন।
আরাফার দিন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? (ইসলামিক ইতিহাস)
আরাফাতের ময়দানে ইসলামের ইতিহাসে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে:
- এই দিনে সূরা আল-মায়িদার ৩ নম্বর আয়াত নাজিল হয়: “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পরিপূর্ণ করে দিলাম।”
- এটি মহানবী (সা.)-এর বিদায় হজের প্রধান দিন ছিল।
- বিশ্বের সর্ববৃহৎ মানব সমাবেশ প্রতিবছর এখানেই হয়।
দোয়া কবুল হওয়ার জন্য কী করবেন?
দোয়া করার সময় কিছু আদব মেনে চলা উচিত:
- ওজু অবস্থায় দোয়া করুন
- কিবলামুখী হয়ে বসুন
- হাত তুলুন এবং বিনয়ী হোন
- আল্লাহর প্রশংসা দিয়ে শুরু করুন
- রাসুল (সা.)-এর উপর দরুদ পড়ুন
- দৃঢ় বিশ্বাস রাখুন যে দোয়া কবুল হবে
হাদিসে আছে — “দোয়া কবুল হবে এই একীন নিয়ে আল্লাহর কাছে চাও। জেনে রাখো, আল্লাহ উদাসীন হৃদয় থেকে বের হওয়া দোয়া কবুল করেন না।” (তিরমিজি)
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
আরাফার দিনের দোয়া কি শুধু হাজিদের জন্য?
না। আরাফার দিনের ফজিলত সকল মুসলমানের জন্য প্রযোজ্য — হাজি হোক বা না হোক। হাজিরা ময়দানে অবস্থান করেন, আর বাকি সবাই নিজের ঘরে বসেই দোয়া, রোজা ও ইবাদত করে এই ফজিলত লাভ করতে পারেন।
আরাফার দোয়া কতক্ষণ পড়বো?
যত বেশি সম্ভব। বিশেষত জোহরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত বসে বসে দোয়া ও জিকির করা সবচেয়ে উত্তম। রাসুল (সা.) নিজে এই সময়ে একনাগাড়ে দোয়া করতেন।
আরাফার রোজা কি হাজিরাও রাখবেন?
না। হাজিদের জন্য আরাফার দিনের রোজা রাখা মাকরুহ — কারণ তাদের সারাদিন শক্তি দিয়ে দোয়া ও ইবাদত করতে হয়। রোজা শুধু হাজি নন এমন মুসলমানদের জন্য।
বাংলাদেশ থেকে সৌদির তারিখ অনুসরণ করে রোজা রাখা যাবে?
এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। অধিকাংশ বাংলাদেশি আলেম মনে করেন নিজের দেশের ৯ জিলহজ তারিখে রোজা রাখাই নিরাপদ ও সঠিক।
আরাফার দিন কোন সূরা পড়বো?
বিশেষ কোনো নির্দিষ্ট সূরার কথা হাদিসে বাধ্যতামূলক ভাবে বলা নেই। তবে বেশি বেশি সূরা ইখলাস, সূরা ফাতিহা পড়া এবং কোরআন তিলাওয়াত করা উত্তম।
আরাফার দিনের দোয়া কখন শুরু হয়?
ফজরের পর থেকেই দোয়া শুরু করা যায়। তবে সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ সময় হলো জোহর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত।
শেষকথা
আরাফার দিন প্রতিটি মুসলমানের জন্য এক অসাধারণ সুযোগ। এই দিনে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাতের দরজা সবচেয়ে বেশি খোলা থাকে। হাজি না হলেও আপনি ঘরে বসে রোজা রাখুন, বেশি বেশি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু পড়ুন, ইস্তিগফার করুন এবং আল্লাহর কাছে মনের সব চাওয়া জানান।
রাসুল (সা.) বলেছেন — “সর্বোত্তম দোয়া হলো আরাফার দিনের দোয়া।” এই সুযোগ হাতছাড়া করবেন না।
নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র
- সহিহ মুসলিম (হাদিস: ২৬১৭, ২৬৩৬)
- জামে তিরমিজি (হাদিস: ৩৫৮৫, ৩০৪৪, ৭৫৮)
- মুসনাদ আহমাদ (হাদিস: ৬৯৬১)
- সহিহ ইবনে হিব্বান
- ইমাম খাত্তাবি, শান আদ-দোয়া (পৃ. ২০৬)
- ইবনে আব্দুল বার, আত-তামহিদ
এই আর্টিকেলটি কুরআন ও সহিহ হাদিসের ভিত্তিতে লেখা হয়েছে। যেকোনো আমলের বিষয়ে নিকটস্থ বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নেওয়া উত্তম।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”
