শেষ জামানায় দাজ্জালের আগমন, ইহুদিদের পরিকল্পনা এবং মুসলমানদের ভূমিকা

শেষ জামানায় দাজ্জালের আগমন, ইহুদিদের পরিকল্পনা এবং মুসলমানদের ভূমিকা

আপনি কি শেষ জামানা বা কিয়ামতের আলামতগুলো নিয়ে ভাবছেন? বর্তমান বিশ্বের দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীতি, প্রযুক্তির উত্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের সাথে দাজ্জালের আগমনের কী সম্পর্ক রয়েছে? আজকে আমরা কোরআন, সুন্নাহ এবং সমসাময়িক স্কলারদের ব্যাখ্যার আলোকে এই বিষয়গুলো অত্যন্ত সহজভাবে বিশ্লেষণ করব।

দাজ্জালকে পৃথিবীতে আনতে ইহুদিদের সাথে মুসলিমদের সম্পর্কের বিষয়টি কীভাবে দেখা হয়?

ইসলামিক স্কলার শায়খ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাজ্জাকের বিশ্লেষণ এবং শেষ জামানার ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী, ইহুদিরা জেরুজালেমে ‘থার্ড টেম্পল’ বা হাইকালে সোলাইমানী নির্মাণ করলে দাজ্জালের (অ্যান্টিক্রাইস্ট) আগমন ঘটবে। আর দাজ্জাল আবির্ভূত হওয়ার পরেই হযরত ঈসা (আঃ) পুনরায় পৃথিবীতে অবতরণ করবেন এবং দাজ্জালকে হত্যা করবেন। অর্থাৎ, পৃথিবীতে ঈসা (আঃ)-এর ফিরে আসা এবং মুসলমানদের চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য দাজ্জালের আগমন একটি অবশ্যম্ভাবী ঐশী প্রক্রিয়া। তাই জেরুজালেমে ইহুদিদের একত্রিত হওয়ার বিষয়টি পরোক্ষভাবে ঈসা (আঃ)-কে পুনরায় পৃথিবীতে পাওয়ার একটি পূর্বশর্ত হিসেবে কাজ করে।

থার্ড টেম্পল নির্মাণ এবং দাজ্জালের আগমন

ইসলামিক ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী, কিয়ামতের অন্যতম বড় আলামত হলো দাজ্জালের আগমন। ইহুদি ধর্মে যাকে ‘মাসিহা’ বা ত্রাণকর্তা হিসেবে অপেক্ষা করা হচ্ছে, ইসলামে তাকেই ‘মাসিহ আদ-দাজ্জাল’ বা প্রতারক বলা হয়েছে।

  • থার্ড টেম্পল বা তৃতীয় মন্দির: ইহুদিদের বিশ্বাস অনুযায়ী তারা জেরুজালেমে মসজিদে আকসা প্রাঙ্গণে ‘থার্ড টেম্পল’ নির্মাণ করবে। এই মন্দির নির্মাণের পরেই তাদের প্রতীক্ষিত নেতার (দাজ্জাল) আগমন ঘটবে।
  • ঈসা (আঃ)-এর অবতরণ: দাজ্জালের এই চরম ফেতনার সময়ই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা হযরত ঈসা (আঃ)-কে আসমান থেকে পৃথিবীতে পাঠাবেন ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে।

দাজ্জালের ভয়াবহ ফেতনা ও আধুনিক প্রেক্ষাপট

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) দাজ্জালের ফেতনাকে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর ফেতনা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। দাজ্জালের ক্ষমতা হবে অভাবনীয়:

  • অর্থনীতি ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ: আসমানের বৃষ্টি এবং জমিনের ফসল দাজ্জালের নির্দেশে উৎপাদিত হবে। যে দাজ্জালের প্রতি ঈমান আনবে, সে প্রাচুর্য পাবে। আর যে অস্বীকার করবে, সে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হবে।
  • প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ বা অলৌকিকতা: দাজ্জাল মেঘমালার গতিতে পৃথিবীতে বিচরণ করবে। আধুনিক যুগের ইন্টারনেট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ দাজ্জালের ফেতনার একটি প্রস্তুতিমূলক ধাপ হতে পারে।
  • বিভ্রান্তি সৃষ্টি: দাজ্জালের জান্নাত হবে মূলত জাহান্নাম এবং তার জাহান্নাম হবে মূলত জান্নাত।

মালহামা (মহাযুদ্ধ) এবং আন্তর্জাতিক জোট

কিয়ামতের আগে সিরিয়া ও তার আশপাশের অঞ্চলে ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হবে, যাকে হাদিসের ভাষায় ‘আল-মালহামা আল-কুবরা’ বলা হয়।

১. রোমানদের (খ্রিস্টান) সাথে চুক্তি: মুসলমানরা রোমান বা খ্রিস্টানদের একটি দলের সাথে শান্তি চুক্তি করবে এবং তারা মিলে তৃতীয় একটি শক্তির (সম্ভবত ইহুদি বা অন্য কোনো পরাশক্তি) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিজয়ী হবে।

২. চুক্তি ভঙ্গ ও সংঘাত: বিজয়ের পর ক্রুশ বা ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বিতর্কের জেরে খ্রিস্টান এবং মুসলমানদের মধ্যে চুক্তি ভেঙে যাবে এবং তারা একে অপরের বিরুদ্ধে ভয়াবহ যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে। এই যুদ্ধে সিরিয়ার ‘আমাক’ বা ‘দাবেক’ নামক স্থানে বিশাল বাহিনী মুখোমুখি হবে।

৩. মুসলমানদের তিন ভাগ: এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে— একদল পালিয়ে যাবে, একদল শহীদ হবে এবং অপর দল চূড়ান্ত বিজয় লাভ করবে।

হযরত ঈসা (আঃ)-এর অবতরণ এবং দাজ্জাল বধ

যুদ্ধের পর যখন মুসলমানরা বিজয়ের আনন্দ বা গনিমতের মাল বণ্টন করবে, তখনই খবর আসবে দাজ্জাল আত্মপ্রকাশ করেছে।

  • ঈসা (আঃ)-এর আগমন: এই চরম সংকটময় মুহূর্তে দামেস্কের সাদা মিনারে (বা আসর/ফজরের নামাজের সময়) হযরত ঈসা (আঃ) দুজন ফেরেশতার ডানায় ভর করে আসমান থেকে অবতরণ করবেন।
  • দাজ্জাল নিধন: ফিলিস্তিনের ‘লুদ’ নামক স্থানে (বর্তমান ইসরাইলের লুদ এয়ারপোর্ট এলাকা) ঈসা (আঃ)-কে দেখামাত্র দাজ্জাল সীসার মতো গলতে শুরু করবে এবং ঈসা (আঃ) তাকে নিজ হাতে হত্যা করবেন।

ইয়াজুজ-মাজুজ এর আত্মপ্রকাশ ও ধ্বংস

দাজ্জাল নিধনের পরপরই আল্লাহ ঈসা (আঃ)-কে জানাবেন যে এমন এক বিশাল বাহিনীর (ইয়াজুজ-মাজুজ) আগমন ঘটতে যাচ্ছে, যাদের সাথে যুদ্ধ করার ক্ষমতা পৃথিবীর কারো নেই।

  • তুর পাহাড়ে আশ্রয়: ঈসা (আঃ) এবং মুমিনরা তুর পাহাড়ে আশ্রয় নেবেন। সেখানে চরম খাদ্য সংকট দেখা দেবে।
  • ঐশী সাহায্য: ঈসা (আঃ)-এর দোয়ায় আল্লাহ ইয়াজুজ-মাজুজের ঘাড়ে এক ধরণের পোকা বা মহামারী সৃষ্টি করে তাদের রাতারাতি ধ্বংস করে দেবেন। পরবর্তীতে বিশেষ পাখির মাধ্যমে তাদের মৃতদেহ সরিয়ে পৃথিবী আবার মানুষের বসবাসের উপযোগী করা হবে।
  • স্বর্ণযুগ: এরপর পৃথিবীতে কয়েক বছর ব্যাপী ঈসা (আঃ)-এর নেতৃত্বে ইনসাফ ও শান্তির এক অভূতপূর্ব শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।

🛡️ দাজ্জালের ফেতনা থেকে ঈমান রক্ষার উপায়

দাজ্জালের প্রলোভন এবং শেষ জামানার সংকট থেকে বাঁচতে ইসলামে কয়েকটি নির্দিষ্ট উপায় বাতলে দেওয়া হয়েছে:

  • আখিরাতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস: জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতি অগাধ বিশ্বাস রাখা, যাতে জাগতিক লোভ-লালসা (যেমন: দাজ্জালের দেওয়া সম্পদ) ঈমান নষ্ট করতে না পারে।
  • সূরা কাহাফ তেলাওয়াত: প্রতি জুমায় সূরা কাহাফ পড়া এবং এর প্রথম ও শেষ ১০ আয়াত মুখস্ত রাখা।
  • অবৈধ সম্পদ থেকে দূরে থাকা: হারাম উপার্জন থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা। কারণ যার এক টাকারও অবৈধ লোভ থাকবে, সে দাজ্জালের ফাঁদে পা দেবে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

১. দাজ্জাল পৃথিবীতে কতদিন থাকবে?

হাদিস অনুযায়ী, দাজ্জাল পৃথিবীতে ৪০ দিন অবস্থান করবে। তবে এর প্রথম দিনটি হবে এক বছরের সমান, দ্বিতীয় দিনটি এক মাসের সমান, তৃতীয় দিনটি এক সপ্তাহের সমান এবং বাকি দিনগুলো সাধারণ দিনের মতোই হবে। (মোট প্রায় ১৪ মাসের সমান সময়)।

২. ইয়াজুজ-মাজুজ কারা?

ইয়াজুজ-মাজুজ হলো হযরত নূহ (আঃ)-এর বংশধরদের একটি অবাধ্য ও হিংস্র জাতি, যাদেরকে প্রাচীনকালে যুলকারনাইন (আঃ) একটি বিশাল প্রাচীর নির্মাণ করে বন্দী করে রেখেছিলেন। কিয়ামতের আগে তারা প্রাচীর ভেঙে বেরিয়ে আসবে এবং পৃথিবীতে চরম ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে। কোরআনের সূরা কাহাফে এদের কথা উল্লেখ আছে।

৩. বর্তমান সময়ে দাজ্জালের ফেতনা কি শুরু হয়েছে?

অনেক ইসলামিক স্কলার মনে করেন, দাজ্জাল এখনো শারীরিকভাবে আত্মপ্রকাশ না করলেও তার সিস্টেম বা ব্যবস্থা পৃথিবীতে চালু হয়ে গেছে। আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার, পর্দাহীনতা, বিশ্বব্যাপী সুদী অর্থনীতি এবং মানুষের ঈমানি দুর্বলতা দাজ্জালি ব্যবস্থারই পূর্বলক্ষণ।

৪. মুসলমান এবং খ্রিস্টানদের মহাযুদ্ধে (মালহামা) কারা অংশ নেবে?

হাদিসের বর্ণনানুযায়ী, তৎকালীন আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ তাকওয়াবান এবং মুমিনরা মদিনা থেকে বের হয়ে এসে সিরিয়ার দামেস্কে এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব দেবেন।

ডিসক্লেইমার: এই আর্টিকেলটি শায়খ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাজ্জাকের ইউটিউব লেকচার এবং নির্ভরযোগ্য ইসলামিক হাদিস ও কোরআনের ব্যাখ্যার (Eschatology) আলোকে তথ্যমূলক উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। শেষ জামানার প্রকৃত সময়কাল একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন।

Leave a Comment

Scroll to Top