পবিত্র কোরআনে কন্যা সন্তানকে আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা শুরা (আয়াত: ৪৯) তে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট বলেছেন, তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন — এটি তাঁর ইচ্ছা ও কুদরতের প্রকাশ। কন্যাকে অপছন্দ করা জাহেলি যুগের কাফিরদের স্বভাব, যা ইসলাম সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছে। ইসলামে কন্যা সন্তান জান্নাত লাভের মাধ্যম।
কোরআনে কন্যা সন্তান প্রসঙ্গ: প্রধান আয়াতগুলো
সূরা শুরা, আয়াত ৪৯ — কন্যা আল্লাহর দান
আরবি:
لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ ۚ يَهَبُ لِمَن يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَن يَشَاءُ الذُّكُورَ
বাংলা অনুবাদ:
“আসমান ও জমিনের রাজত্ব একমাত্র আল্লাহরই। তিনি যা চান সৃষ্টি করেন। যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন।” (সূরা আশ-শুরা, আয়াত: ৪৯)
এই আয়াতের শিক্ষা: কন্যা সন্তান জন্মানো সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছা। এতে অসন্তুষ্ট হওয়া মানে আল্লাহর সিদ্ধান্তে আপত্তি করা, যা মুমিনের জন্য সম্পূর্ণ অনুচিত।
সূরা আন-নাহল, আয়াত ৫৮–৫৯ — জাহেলি যুগের নিন্দা
আরবি:
وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُم بِالْأُنثَىٰ ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًّا وَهُوَ كَظِيمٌ
বাংলা অনুবাদ:
“যখন তাদের কাউকে কন্যাসন্তানের ‘সুসংবাদ’ দেওয়া হয়, তখন তার মুখ অন্ধকার হয়ে যায় এবং অসহ্য মনস্তাপে ক্লিষ্ট হতে থাকে। তাকে শোনানো সুসংবাদের দুঃখে সে লোকদের কাছ থেকে মুখ লুকিয়ে থাকে। সে ভাবে, অপমান সহ্য করে তাকে থাকতে দেবে নাকি তাকে মাটির নিচে পুঁতে ফেলবে। শুনে রাখো, তাদের ফয়সালা খুবই নিকৃষ্ট।” (সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৫৮–৫৯)
এই আয়াতের শিক্ষা: আল্লাহ কোরআনে কন্যা সন্তানের জন্মকে সুসংবাদ বলে অভিহিত করেছেন। যারা কন্যা জন্মে মুখ কালো করে, কোরআন তাদের নিন্দা করেছে।
লক্ষণীয়: আল্লাহ এই আয়াতে ‘সুসংবাদ’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন — অর্থাৎ কন্যা সন্তান পাওয়া আনন্দের কারণ, দুঃখের নয়।
সূরা আন-নাহল, আয়াত ৫৭ — কাফিরদের মিথ্যা বিশ্বাসের নিন্দা
বাংলা অনুবাদ:
“তারা আল্লাহর জন্য কন্যাসন্তান নির্দিষ্ট করে — তিনি পবিত্র মহিমান্বিত — এবং তাদের নিজেদের জন্য তা যা তারা কামনা করে।” (সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৫৭)
শিক্ষা: মক্কার মুশরিকরা ফেরেশতাদের আল্লাহর কন্যা বলত এবং একই সাথে নিজেদের কন্যা সন্তানকে কবর দিত — এই দ্বিমুখিতার নিন্দা করা হয়েছে।
সূরা তাকভীর, আয়াত ৮–৯ — কন্যাকে জীবন্ত কবর দেওয়ার নিন্দা
বাংলা অনুবাদ:
“যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল।” (সূরা আত-তাকভীর, আয়াত: ৮–৯)
শিক্ষা: কিয়ামতের দিন যারা কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দিয়েছে, তাদের জবাবদিহি করতে হবে। ইসলাম সেই বর্বর প্রথাকে চিরতরে নির্মূল করেছে।
কন্যা সন্তান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাদিস
কোরআনের পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসেও কন্যা সন্তানের ব্যাপারে অসাধারণ সব সুসংবাদ রয়েছে।
হাদিস ১ — কন্যা সন্তান জান্নাতে নিয়ে যাবে
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন:
“যার ঘরে কন্যাসন্তান জন্ম নিল, সে তাকে কষ্ট দেয়নি, মেয়ের ওপর অসন্তুষ্ট হয়নি এবং পুত্রসন্তানকে তার ওপর প্রাধান্য দেয়নি — তাহলে ওই কন্যার কারণে আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।” (মুসনাদ আহমদ, হাদিস নং: ১/২২৩)
হাদিস ২ — দুই কন্যা প্রতিপালন করলে নবীজির সাথে জান্নাতে
হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি দুটি কন্যাকে তারা সাবালিকা হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করবে, কেয়ামতের দিন আমি এবং সে এই দুটি আঙুলের মতো পাশাপাশি থাকব।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৬৩১; তিরমিজি, হাদিস নং: ১৯১৪)
হাদিস ৩ — তিন কন্যা সন্তান জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ
আউফ ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন:
“যে ব্যক্তির তিনটি কন্যাসন্তান রয়েছে, সে তাদের বিয়ে দেওয়া পর্যন্ত বা মৃত্যু পর্যন্ত ভরণপোষণ দেয়, তবে তারা তার জন্য আগুন থেকে মুক্তির কারণ হবে।”
এক নারী জিজ্ঞেস করলেন: “দুই মেয়ে হলে?” তিনি বললেন: “দুই হলেও।” (বায়হাকি, শুআবুল ইমান, হাদিস নং: ৮৩১৩)
হাদিস ৪ — কন্যা সন্তান প্রতিপালন জাহান্নাম থেকে আড়াল
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“যে ব্যক্তিকে কন্যাসন্তান লালনপালনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং সে ধৈর্যের সঙ্গে তা সম্পাদন করেছে, সেই কন্যাসন্তান তার জন্য জাহান্নাম থেকে আড়াল হবে।” (তিরমিজি, হাদিস নং: ১৯১৩)
হাদিস ৫ — তিন কন্যা বা বোন থাকলে জান্নাত নিশ্চিত
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
“যে ব্যক্তির তিনজন কন্যাসন্তান বা তিনজন বোন আছে এবং সে তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করেছে, তাদেরকে নিজের জন্য অসম্মানের কারণ মনে করেনি — সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (তিরমিজি, হাদিস নং: ১৯১২)
ইসলামে কন্যা সন্তানের মর্যাদা: ৬টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
১. কন্যা সন্তান আল্লাহর সরাসরি দান
কোরআন স্পষ্ট বলেছে, কন্যা বা পুত্র — দেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর। কাজেই যে বাবা-মা কন্যা সন্তানে অখুশি হন, তারা আসলে আল্লাহর সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট।
২. কন্যা সন্তান পরিবারে বরকত আনে
হাদিসে বলা হয়েছে, কন্যা সন্তানের মাধ্যমে আল্লাহ পরিবারে সুখ ও বরকত দেন।
৩. কন্যা জন্ম আসলে সুসংবাদ
আল্লাহ কোরআনে নিজেই কন্যার জন্মকে ‘সুসংবাদ’ বলেছেন। সুসংবাদ শুনে মানুষ আনন্দ প্রকাশ করে।
৪. কন্যা সন্তান জান্নাতের পথ
একটি-দুটি-তিনটি — যত কন্যা, তত বেশি জান্নাতের সুযোগ। সহিহ হাদিসে এর স্পষ্ট প্রমাণ আছে।
৫. কন্যাকে অপছন্দ করা কাফিরদের স্বভাব
ইসলামপূর্ব আরবে কন্যা জন্মে মুখ অন্ধকার হত — কোরআন সেটাকে কাফিরদের বৈশিষ্ট্য বলে চিহ্নিত করেছে।
৬. নবীজি নিজে কন্যাদের ভালোবাসতেন
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চার কন্যা ছিলেন। তিনি তাঁর কন্যা ফাতিমা (রা.)-কে অত্যন্ত সম্মান করতেন। হযরত ফাতিমা (রা.) ঘরে এলে নবীজি উঠে দাঁড়াতেন এবং তাঁর হাত ধরে নিজের আসনে বসাতেন।
বাংলাদেশি প্রেক্ষাপটে কন্যা সন্তান নিয়ে ভুল ধারণা
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশের অনেক পরিবারে এখনো কন্যা সন্তান জন্মে হতাশা দেখা যায়। এর কারণ মূলত:
- যৌতুকের ভয়
- মেয়েকে “পরের সম্পদ” মনে করা
- ছেলে সন্তানের প্রতি পক্ষপাত
- অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা
কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এই চিন্তাগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কন্যা সন্তান মেয়ে মা-বাবার জন্য:
- জান্নাতের পথ
- জাহান্নাম থেকে মুক্তির ঢাল
- দুনিয়া ও আখেরাতে রহমত
কন্যা সন্তান লালন-পালনে ইসলামের নির্দেশনা
ইসলাম শুধু কন্যাকে মর্যাদা দিতে বলেনি, বরং কীভাবে তাকে বড় করতে হবে তার পূর্ণ গাইডলাইনও দিয়েছে:
১. ছেলে ও মেয়ের মধ্যে বৈষম্য না করা রাসুল (সা.) বলেছেন: যে ব্যক্তি মেয়ের ওপর অসন্তুষ্ট না হয়ে এবং পুত্রকে প্রাধান্য না দিয়ে তার লালন-পালন করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
২. দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া মেয়েকে নামাজ, কোরআন ও ইসলামের মৌলিক শিক্ষা দেওয়া বাবা-মায়ের দায়িত্ব।
৩. বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়ের মত নেওয়া ইসলামে মেয়ের সম্মতি ছাড়া বিয়ে বৈধ নয়।
৪. ন্যায়সঙ্গত মিরাস দেওয়া কন্যা সন্তানের সম্পত্তির অধিকার ইসলামে নির্দিষ্ট। সেটি পরিশোধ করা ফরজ।
প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন: কন্যা সন্তান কি আল্লাহর রহমত?
উত্তর: হ্যাঁ, কন্যা সন্তান আল্লাহর বিশেষ রহমত। কোরআনে আল্লাহ কন্যার জন্মকে নিজের দান হিসেবে উল্লেখ করেছেন (সূরা শুরা: ৪৯)। হাদিসে কন্যা সন্তানকে জান্নাতের মাধ্যম বলা হয়েছে।
প্রশ্ন: কন্যা সন্তান জন্মালে কি বাবা-মায়ের জান্নাত নিশ্চিত?
উত্তর: কন্যা সন্তানকে যদি সঠিকভাবে, ধৈর্যের সাথে, বৈষম্য ছাড়া লালন-পালন করা হয়, তাহলে হাদিস অনুযায়ী তা জান্নাতের কারণ হবে। রাসুল (সা.) দুই কন্যা লালন-পালনকারীকে কিয়ামতের দিন নিজের পাশে রাখার ওয়াদা দিয়েছেন (সহিহ মুসলিম: ২৬৩১)।
প্রশ্ন: কোরআনে কন্যা সন্তান সম্পর্কে কোন আয়াতে কী বলা হয়েছে?
উত্তর: প্রধান আয়াতগুলো হলো:
- সূরা শুরা, আয়াত ৪৯ — কন্যা আল্লাহর দান
- সূরা নাহল, আয়াত ৫৮–৫৯ — কন্যার জন্মকে কোরআন ‘সুসংবাদ’ বলেছে
- সূরা তাকভীর, আয়াত ৮–৯ — জীবন্ত কবরের নিন্দা
প্রশ্ন: ইসলামে ছেলে ও মেয়ে সন্তানের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: ইসলামে উভয় সন্তানকে সমান মর্যাদায় দেখা হয়। উভয়েই আল্লাহর দান। কন্যার মাধ্যমে আলাদা পুরস্কারের ঘোষণা দিয়ে ইসলাম বরং সমাজের পক্ষপাত কমাতে চেয়েছে।
প্রশ্ন: কন্যা সন্তান নিয়ে ইসলামিক স্ট্যাটাস কী হতে পারে?
উত্তর: কিছু সুন্দর বাক্য:
- “কন্যা সন্তান আল্লাহর রহমত, জান্নাতের পথের পাথেয়।”
- “যে ঘরে কন্যা আছে, সে ঘরে ফেরেশতার রহমত আছে।”
- “কন্যাকে ভালোবাসা মানে নবীজির সাথে জান্নাতে থাকার স্বপ্ন।”
প্রশ্ন: প্রথম সন্তান মেয়ে হলে কি সৌভাগ্য?
উত্তর: হাদিসের আলোকে অনেক আলেম বলেছেন, প্রথম সন্তান মেয়ে হলে পরিবারে বরকত আসে। ইসলাম কোনো সন্তানকে অশুভ মনে করতে নিষেধ করেছে। বরং কন্যার আগমনে আনন্দ করা সুন্নত।
কন্যা সন্তান নিয়ে কোরআনের উক্তি
| সূরা ও আয়াত | মূল বার্তা |
|---|---|
| শুরা: ৪৯ | কন্যা আল্লাহর দান, তাঁর ইচ্ছার প্রকাশ |
| নাহল: ৫৮–৫৯ | কন্যার জন্ম সুসংবাদ, অসন্তুষ্ট হওয়া নিন্দনীয় |
| নাহল: ৫৭ | কন্যাকে হেয় করা মুশরিকদের স্বভাব |
| তাকভীর: ৮–৯ | কন্যাকে হত্যা করা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ |
উপসংহার
পবিত্র কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এটি সুস্পষ্ট যে, কন্যা সন্তান কোনো বোঝা নয় — বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ উপহার, রহমত এবং জান্নাত লাভের মাধ্যম।
যে পরিবারে কন্যা আছে, সে পরিবারে আল্লাহর রহমত ও বরকত বেশি। যে বাবা-মা কন্যাকে সঠিকভাবে মানুষ করবেন, কিয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের পাশে থাকবেন।
কাজেই আজই মনের ভুল ধারণা ঝেড়ে ফেলুন। কন্যা সন্তানকে আল্লাহর নিয়ামত মনে করুন এবং তাদের যথাযথ মর্যাদা দিন।
বিশ্বাসযোগ্য সূত্র
- পবিত্র কোরআন (সূরা শুরা, সূরা নাহল, সূরা তাকভীর)
- সহিহ মুসলিম (হাদিস নং: ২৬৩১)
- তিরমিজি (হাদিস নং: ১৯১২, ১৯১৩, ১৯১৪, ১৯১৬)
- মুসনাদ আহমদ (হাদিস নং: ১/২২৩, ১১৪০৪)
- বায়হাকি, শুআবুল ইমান (হাদিস নং: ৮৩১৩)
- প্রথম আলো (ইসলামিক কলাম, অক্টোবর ২০২৪)
- ঢাকা পোস্ট (ধর্ম বিভাগ, অক্টোবর ২০২২)
এই আর্টিকেলের সকল কোরআনিক আয়াত ও হাদিস সহিহ ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ থেকে যাচাই করা হয়েছে।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”


