আয়াতুল কুরসি বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলত
আরবি টেক্সট, বাংলা উচ্চারণ, সঠিক অর্থ, সহীহ হাদিসে ফজিলত, কখন পড়বেন ও মুখস্থের সহজ নিয়ম
আয়াতুল কুরসি হলো পবিত্র কুরআনের সূরা আল-বাকারাহর ২৫৫ নম্বর আয়াত। এটি কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ আয়াত হিসেবে স্বীকৃত। এই আয়াতে আল্লাহর একত্ব, তাঁর চিরজীবিত থাকার গুণ, সর্বজ্ঞতা ও সার্বভৌমত্বের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা এবং ঘুমানোর আগে এটি পড়লে শয়তান থেকে সুরক্ষা ও আল্লাহর রহমত পাওয়া যায়।
📋 এই আর্টিকেলে যা পাবেন
সূরা
আল-বাকারাহ
আয়াত নম্বর
২৫৫
অবতরণ স্থান
মদীনা মুনাওয়ারা
মর্যাদা
কুরআনের শ্রেষ্ঠ আয়াত
আয়াতুল কুরসি — আরবি, উচ্চারণ ও বাংলা অর্থ
নিচে সম্পূর্ণ আয়াতটি আরবি টেক্সট, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থসহ দেওয়া হলো:
আয়াতুল কুরসি কী এবং এটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
“আয়াতুল কুরসি” শব্দের অর্থ হলো “কুরসির আয়াত”। এখানে “কুরসি” বলতে আল্লাহর মহান আসন বা ক্ষমতার বিশালতাকে বোঝানো হয়েছে। আয়াতটি সূরা আল-বাকারাহর ২৫৫ নম্বর আয়াত এবং মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছিল।
এই একটি মাত্র আয়াতে আল্লাহর দশটি মহান গুণ বর্ণিত হয়েছে, যা কুরআনের আর কোনো একক আয়াতে একত্রে পাওয়া যায় না। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এটিকে কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ আয়াত বলে ঘোষণা করেছেন।
আয়াতটিতে আল্লাহর যে গুণগুলো বর্ণিত হয়েছে
- তিনি একমাত্র উপাস্য — লা ইলাহা ইল্লা হুয়া
- তিনি চিরঞ্জীব — আল-হাইয়্যু
- তিনি সর্বসত্তার ধারক ও পালনকর্তা — আল-কাইয়্যুম
- তাঁকে তন্দ্রা বা ঘুম স্পর্শ করে না
- আকাশ ও পৃথিবীর সবকিছু তাঁর মালিকানায়
- তাঁর অনুমতি ছাড়া কেউ সুপারিশ করতে পারে না
- তিনি সবার অতীত ও ভবিষ্যৎ জানেন
- তাঁর ইচ্ছা ছাড়া কেউ তাঁর জ্ঞানের কিছুই আয়ত্ত করতে পারে না
- তাঁর কুরসি সমগ্র আকাশ ও পৃথিবীকে পরিব্যাপ্ত
- তিনিই সর্বোচ্চ ও মহামহিম
আয়াতুল কুরসির ফজিলত — সহীহ হাদিসের আলোকে
আয়াতুল কুরসির ফজিলত নিয়ে একাধিক সহীহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। নিচে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাদিসগুলো দেওয়া হলো:
১. রাতে ঘুমানোর আগে পড়লে শয়তান থেকে সুরক্ষা
২. ফরজ নামাজের পরে পড়লে জান্নাত নিশ্চিত
৩. কুরআনের শ্রেষ্ঠ আয়াত
৪. সকাল-সন্ধ্যার আমল হিসেবে সুরক্ষা
আয়াতুল কুরসি কখন পড়তে হয়?
আয়াতুল কুরসি যেকোনো সময় পড়া যায়। তবে হাদিসে বিশেষ কিছু সময়ের কথা উল্লেখ আছে যখন পড়লে আলাদা ফজিলত পাওয়া যায়:
| সময় | ফজিলত | হাদিস সূত্র |
|---|---|---|
| 🌙 ঘুমানোর আগে | সারারাত শয়তান থেকে আল্লাহর প্রহরী নিযুক্ত থাকে | বুখারী: ২৩১১ |
| 🕌 ফরজ নামাজের পর | জান্নাতে প্রবেশের পথ সুগম হয় | নাসাঈ: ৯৯২৮ |
| 🌅 সকালে (ফজরের পর) | সন্ধ্যা পর্যন্ত শয়তান থেকে নিরাপদ | ইবনে হিব্বান: ৭৯১ |
| 🌆 সন্ধ্যায় (আসরের পর) | সকাল পর্যন্ত শয়তান থেকে নিরাপদ | ইবনে হিব্বান: ৭৯১ |
| 🏠 ঘরে প্রবেশের সময় | ঘর ও পরিবারে রহমত ও বরকত নাজিল হয় | ইসলামিক পণ্ডিতগণ |
নির্দিষ্ট কতবার পড়তে হবে এমন কোনো কঠোর বাধ্যবাধকতা নেই। তবে রাতে ঘুমানোর আগে একবার পড়াটাই যথেষ্ট বলে হাদিসে এসেছে। ফরজ নামাজের পরেও প্রতিবার একবার করে পড়া সুন্নত।
আয়াতুল কুরসি সহজে মুখস্থ করার নিয়ম
অনেকেই আয়াতুল কুরসি মুখস্থ করতে চান কিন্তু পারেন না। নিচে ধাপে ধাপে একটি কার্যকর পদ্ধতি দেওয়া হলো:
- ছোট ছোট অংশে ভাগ করুন: আয়াতটিকে ৪-৫টি অংশে ভাগ করে প্রতিদিন একটি অংশ মুখস্থ করুন। প্রথম অংশ: “আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম।”
- অর্থ বুঝে পড়ুন: প্রতিটি বাক্যের অর্থ জানলে মুখস্থ করা অনেক সহজ হয় এবং মন থেকে মুছে যায় না।
- অডিও শুনে অনুশীলন করুন: মিশারি আল-আফাসি বা আব্দুর রহমান আস-সুদাইসের তিলাওয়াত শুনে পুনরাবৃত্তি করুন।
- প্রতিদিন নামাজের পর পড়ুন: ফরজ নামাজের পর পড়ার অভ্যাস করলে স্বাভাবিকভাবেই মুখস্থ হয়ে যাবে।
- লিখে অনুশীলন করুন: বাংলা উচ্চারণ লিখে লিখে পড়লে স্মৃতিতে ভালোভাবে গেঁথে যায়।
- শিশুদের শেখান: কাউকে শেখালে নিজেও শক্তভাবে মুখস্থ হয়ে যায়।
আয়াতুল কুরসির সংক্ষিপ্ত তাফসীর
প্রথম বাক্য: তাওহীদের ঘোষণা
“আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুওয়া” — এই বাক্যটি ইসলামের মূল আকিদাকে প্রতিষ্ঠিত করে। আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের যোগ্য আর কেউ নেই। “আল-হাইয়্যু” মানে যিনি চিরঞ্জীব — তাঁর কোনো মৃত্যু নেই। “আল-কাইয়্যুম” মানে যিনি নিজে নিজে প্রতিষ্ঠিত এবং সমগ্র সৃষ্টিজগৎকে ধরে রাখেন।
ঘুম ও তন্দ্রা স্পর্শ করে না
আল্লাহ কখনো ঘুমান না, তন্দ্রাচ্ছন্ন হন না। এটি তাঁর অসীম শক্তি ও জাগ্রত তত্ত্বাবধানের প্রমাণ। তিনি সর্বদা সজাগ — মানুষ যখন ঘুমায় তখনও, রাতের অন্ধকারেও তিনি সব কিছু দেখছেন।
কুরসির বিশালতা
“ওয়াসিআ কুরসিইয়্যুহুস্ সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বা” — তাঁর কুরসি সমগ্র আকাশ ও পৃথিবীকে পরিব্যাপ্ত করে আছে। ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) বলেছেন, এটি আল্লাহর ক্ষমতার বিশালতার বর্ণনা। আল্লাহর কুরসি এত বিশাল যে সমগ্র সৃষ্টিজগৎ তার মধ্যে মাত্র একটি আংটির মতো।
“আল-আলিয়্যুল আযীম”
আয়াতের শেষে আল্লাহর দুটি গুণ উল্লেখ করা হয়েছে — তিনি “সর্বোচ্চ” (আল-আলিয়্যু) এবং “মহামহিম” (আল-আযীম)। এই দুটি গুণ মিলে সমস্ত আয়াতের মূলভাবকে সংহত করে।
🙋 প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (People Also Ask)
📚 তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স
- সহীহ বুখারী, ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারী (হাদিস: ২৩১১)
- সহীহ মুসলিম, ইমাম মুসলিম ইবনে আল-হাজ্জাজ (হাদিস: ৮১০)
- সুনানে নাসাঈ (আস-সুনানুল কুবরা), হাদিস: ৯৯২৮
- সহীহুল জামি’, শায়খ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী (হাদিস: ৬৪৬৪)
- সহীহ ইবনে হিব্বান (হাদিস: ৭৯১)
- তাফসীর ইবনে কাসীর — সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৫৫
- প্রথম আলো ইসলামিক সেকশন (২০২৬)


