বাংলাদেশের পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে গত ১২ জুন ২০২৬ তারিখে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের মামলায় ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে দুবাই পুলিশ তাকে আটক করে। ১৪ জুন ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান যে, তাকে খুব দ্রুতই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।
কেন ও কীভাবে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হলেন বেনজীর আহমেদ?
২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগেই দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে দেশ ছাড়েন সাবেক এই প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তা। এরপর তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। তাকে গ্রেপ্তারের পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল ধারাবাহিক:
- রেড নোটিশ জারি: ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল ইন্টারপোল বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করে (কন্ট্রোল নম্বর: এ-৫৭৪/৪-২০২৫)।
- দুবাই পুলিশের অভিযান: ইন্টারপোলের এই নোটিশের ওপর ভিত্তি করেই গত ১২ জুন দুবাইতে প্রবেশ করার পর সেখানকার স্থানীয় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
- বাংলাদেশকে অবহিতকরণ: ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘এনসিবি আবুধাবি’ ইমেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশকে বেনজীরের গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে।
সাবেক আইজিপির বিরুদ্ধে মূল অভিযোগগুলো কী কী?
দুদকের দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি গুরুতর অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। প্রধান অভিযোগগুলো হলো:
- বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জন: বেনজীর ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে প্রায় ৭৬ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পেয়েছে দুদক। এর মধ্যে ঢাকায় একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, শত শত বিঘা জমি, কোম্পানির শেয়ার ও বিপুল সঞ্চয়পত্র রয়েছে।
- পাসপোর্ট জালিয়াতি: সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও তথ্য গোপন করে একাধিক বেসরকারি পাসপোর্ট তৈরির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
- অর্থ পাচার: অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা।
- মানবাধিকার লঙ্ঘন: উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাবের যে সাত কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, তার মধ্যে বেনজীর আহমেদের নামও ছিল।
বর্তমানে তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের বিভিন্ন ধারায় বিচারকাজ চলছে।
দুবাই থেকে বেনজীরকে কীভাবে দেশে ফেরানো হবে?
বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়াটি একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দেশে ফেরানোর ধাপগুলো হলো:
- ধাপ ১ (সময়সীমা): ইউএই ফেডারেল ল-এর ৩৯ (২০০৬) ধারা অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের দিন থেকে ঠিক ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ (Extradition) অনুরোধ পাঠাতে হবে।
- ধাপ ২ (নথিপত্র প্রস্তুত): ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ঢাকা, দুদক এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে বেনজীরের মামলার সকল নথিপত্র ও প্রমাণাদি ইংরেজি ও আরবি ভাষায় প্রস্তুত করছে।
- ধাপ ৩ (কূটনৈতিক চ্যানেল): স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনুমোদন দেওয়ার পর, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে ফেরত চাওয়ার প্রস্তাব পাঠানো হবে।
- ধাপ ৪ (হস্তান্তর): দুবাই কর্তৃপক্ষ নথিপত্র যাচাই শেষে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশ পুলিশের হাতে হস্তান্তর করবে।
এই গ্রেপ্তারের তাৎপর্য কী?
জাতীয় সংসদে দেওয়া বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই ঘটনাকে “আইনের শাসনের মাইলফলক” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, কেউ যে আইনের ঊর্ধ্বে নয়—এই গ্রেপ্তারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে সেই বার্তাই পৌঁছেছে। এটি দেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে একটি বড় পদক্ষেপ।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
১. বেনজীর আহমেদ কবে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হন?
উত্তর: সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ১২ জুন, ২০২৬ তারিখে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হন।
২. বেনজীর আহমেদকে কেন গ্রেপ্তার করা হয়েছে?
উত্তর: দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ অর্জন, তথ্য গোপন এবং অর্থ পাচারের মামলায় ইন্টারপোলের সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
৩. বেনজীর আহমেদ কতদিন আইজিপি ছিলেন?
উত্তর: তিনি ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
৪. বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনতে কতদিন সময় লাগতে পারে?
উত্তর: আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠাতে হবে। দুই দেশের মধ্যে আইনি প্রক্রিয়া ও নথিপত্র যাচাই শেষে খুব দ্রুতই তাকে দেশে আনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
৫. ইন্টারপোল কবে তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করেছিল?
উত্তর: বাংলাদেশ সরকারের আবেদনের প্রেক্ষিতে ইন্টারপোল গত ১১ এপ্রিল, ২০২৫ তারিখে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করে।
সোর্স: বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তর, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় সংসদীয় বিবৃতি।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”
