মির্জা গালিব এর শায়েরি কী
এবং কেন এত জনপ্রিয়?
প্রেম, বিরহ, জীবনের অর্থ, ঈশ্বরের সন্ধান এবং মানবিক যন্ত্রণা — গালিবের প্রতিটি শের যেন জীবনের কোনো না কোনো গভীর সত্যের কথা বলে।
মির্জা গালিব এর শায়েরি হলো উর্দু ও ফার্সি সাহিত্যের সবচেয়ে গভীর, দার্শনিক এবং আবেগময় কাব্যসম্ভার। বাংলাদেশ ও ভারতে লক্ষ লক্ষ মানুষ গালিবের শায়েরি খোঁজেন, কারণ এই শব্দগুলো তাদের নিজের কষ্ট, প্রেম এবং জীবনজিজ্ঞাসার কথা বলে। নিচে গালিবের সেরা ১২০টিরও বেশি শায়েরি দেওয়া হলো।
১. প্রেম ও ইচ্ছার শায়েরি (Love & Desire)
প্রেমের আনন্দ, অপেক্ষা এবং আকাঙ্ক্ষা নিয়ে গালিবের বিখ্যাত ২০টি শায়েরি:
“হাজারোঁ খোয়াইশেঁ অ্যায়সি কি হর খোয়াইশ পে দম নিকলে,
বহুত নিকলে মেরে আরমান লেকিন ফির ভি কম নিকলে।”
ভাবার্থ: হাজারো ইচ্ছা—এমন যে প্রতিটি ইচ্ছার জন্যই যেন প্রাণ বেরিয়ে যায়। অনেক স্বপ্ন পূরণ হয়েছে বটে, তবু মনে হয় যেন কিছুই হয়নি।
“ইশক নে গালিব নিকম্মা কর দিয়া,
ওয়ারনা হম ভি আদমি থে কাম কে।”
ভাবার্থ: প্রেম গালিবকে একেবারে অপদার্থ বানিয়ে দিয়েছে—নইলে আমিও তো একজন কাজের মানুষই ছিলাম!
“দিল-ই-নাদাঁ তুঝে হুয়া ক্যা হ্যায়,
আখির ইস দর্দ কি দাওয়া ক্যা হ্যায়?”
ভাবার্থ: ওরে আমার বোকা মন, তোর কী হয়েছে? এই ব্যথার শেষ পর্যন্ত কোনো ওষুধ কি আছে?
“হাম কো উন সে ওয়াফা কি হ্যায় উম্মীদ,
জো নেহি জান্তে ওয়াফা ক্যা হ্যায়।”
ভাবার্থ: আমরা তার কাছেই বিশ্বস্ততা আশা করি, যে কিনা জানেই না বিশ্বস্ততা জিনিসটা আসলে কী!
“উন কে দেখে সে জো আ জাতি হ্যায় মুঁহ পর রৌনক,
ওয়ো সমঝতে হ্যায় কি বিমার কা হাল আচ্ছা হ্যায়।”
ভাবার্থ: তাঁকে দেখলে আমার মুখে যে আভা জ্বলে ওঠে—তিনি ভাবেন, বোধহয় অসুস্থ মানুষটা ভালো হয়ে যাচ্ছে।
“ইশক পার জোর নেহি, হ্যায় ইয়ে ওয়ো আতিশ গালিব,
কি লাগায়ে না লাগে অউর বুঝায়ে না বনে।”
ভাবার্থ: প্রেমের ওপর কারও জোর খাটে না গালিব; এটি এমন এক আগুন—যা ইচ্ছা করে লাগানোও যায় না, আবার চাইলেই নেভানোও যায় না।
“তেরে ওয়াদে পার জিয়ে হাম, তো ইয়ে জান ঝুট জানা,
কি খুশি সে মার না জাতে, আগর এতবার হোতা।”
ভাবার্থ: তোমার প্রতিশ্রুতিতে বেঁচে আছি—এটা মিথ্যা জেনো। কারণ তোমার কথার ওপর যদি সত্যিই বিশ্বাস থাকত, তবে তো আমি খুশিতেই মরে যেতাম!
“আহ কো চাহিয়ে ইক উমর আসর হোনে তক,
কৌন জিতা হ্যায় তেরি জুলফ কে সার হোনে তক।”
ভাবার্থ: দীর্ঘশ্বাসের ফল পেতে তো এক জীবন লেগে যায়; তোমার জট পাকানো চুল (মন) খুলতে খুলতে কে আর ততদিন বেঁচে থাকবে?
“ম্যায়নে মজনু পে লড়কপন মেঁ আসাদ,
সঙ্গ উঠায়া থা কি সর ইয়াদ আয়া।”
ভাবার্থ: ছোটবেলায় পাগল মজনুকে ঢিল মারার জন্য আমি যখন পাথর তুললাম, তখন হঠাৎ নিজের মাথার কথা মনে পড়ে গেল (যে প্রেমে পড়লে আমারও তো এই দশা হবে)।
“নিন্দ উসকি হ্যায়, দিমাগ উসকা হ্যায়, রাতেঁ উসকি হ্যায়,
তেরি জুলফেঁ জিসকে শানে পার পরেশান হো গয়ি।”
ভাবার্থ: ঘুম তার, মস্তিষ্ক তার, রাতগুলোও কেবল তারই—যার কাঁধের ওপর তোমার ওই এলোকেশী চুল ছড়িয়ে পড়েছে।
“কাসিদ কে আতে আতে খত এক অউর লিখ রাখুঁ,
ম্যায় জানতা হুঁ জো ওয়ো লিখবেন জওয়াব মেঁ।”
ভাবার্থ: পিয়ন চিঠির জবাব নিয়ে আসার আগেই আমি আরেকটি চিঠি লিখে রাখছি; কারণ আমি জানি সে জবাবে আমাকে কী লিখবে।
“জিস রোজ কিসি আউর পে বেদাদ করোগে,
ইয়ে ইয়াদ রহে, হামকো বহুত ইয়াদ করোগে।”
ভাবার্থ: যেদিন তুমি অন্য কারও ওপর রাগ বা জুলুম করবে, মনে রেখো—সেদিন তুমি আমাকে খুব মিস করবে।
“ইয়ে না থি হামারি কিসমত কি বিসাল-এ-য়ার হোতা,
আগর অউর জিতে রেহতে ইয়েহি ইন্তেজার হোতা।”
ভাবার্থ: প্রিয়জনের সাথে মিলন আমার ভাগ্যে ছিল না। যদি আরও কিছুদিন বেঁচেও থাকতাম, এই অপেক্ষাই করতে হতো।
“ওহ আয়ে ঘর মেঁ হামারে, খুদা কি কুদরত হ্যায়,
কভি হাম উনকো, কভি আপনে ঘর কো দেখতে হ্যায়।”
ভাবার্থ: সে আমার গরিব ঘরে এসেছে—এ তো ঈশ্বরেরই মহিমা! আমি অবাক হয়ে কখনো তাকে смотরি, আর কখনো আমার ঘরকে দেখি।
“জান তুম পার নিসার করতা হুঁ,
ম্যায় নেহি জানতা দুয়া ক্যা হ্যায়।”
ভাবার্থ: আমি তোমার ওপর আমার জীবন উৎসর্গ করি; এর বাইরে আমি আর কোনো প্রার্থনা বা দোয়া জানি না।
“মহব্বত মেঁ নেহি হ্যায় ফার্ক জিনে অর মারনে কা,
উসি কো দেখ কার জিতে হ্যায়, জিস কাফির পে দম নিকলে।”
ভাবার্থ: প্রেমে জীবন আর মৃত্যুর কোনো পার্থক্য নেই। যার জন্য প্রাণ বেরিয়ে যায়, তাকে দেখেই আবার আমরা বেঁচে থাকি।
“কোই উম্মীদ বার নেহি আতি,
কোই সুরত নজর নেহি আতি।”
ভাবার্থ: কোনো আশাই এখন আর পূরণ হওয়ার মতো মনে হচ্ছে না, কোনো পথ বা উপায়ও আর চোখে পড়ছে না।
“ইশক সে তবিয়ত নে জিসত কা মজা পায়া,
দর্দ কি দাওয়া পায়ি, দর্দ-এ-লা-দাওয়া পায়া।”
ভাবার্থ: প্রেমের কারণেই এই জীবনে বাঁচার আসল স্বাদ পেয়েছি; এর মাঝেই পেয়েছি ব্যথার ওষুধ, আবার পেয়েছি এমন ব্যথা—যার কোনো ওষুধ নেই।
“হুসন গামজে কি কশাকশ সে ছুটা মেরে বাদ,
বার হ্যায় ওয়াসল কি হাসরত মেঁ দুয়া মেরে বাদ।”
ভাবার্থ: আমার মৃত্যুর পর তার রূপের অহংকার আর কাউকে জ্বালানোর সুযোগ পাবে না; মিলনের আকাঙ্ক্ষা আমার সাথেই শেষ হয়ে যাবে।
“দিয়া হ্যায় দিল আগর উসকো, বাশার হ্যায় ক্যা কহিয়ে,
হুয়া রাকীফ তো হো, নামাবর হ্যায় ক্যা কহিয়ে।”
ভাবার্থ: যদি তাকে মন দিয়েই থাকি, তবে সে তো একজন মানুষ—কী আর বলব। সে যদি এখন শত্রুও হয়ে যায়, তবুও সে আমার মেসেঞ্জার—কিছু বলার নেই।
২. বিরহ ও বেদনার শায়েরি (Separation & Pain)
বিচ্ছেদ, নিঃসঙ্গতা এবং একাকীত্বের অনুভূতিগুলো গালিব যেভাবে প্রকাশ করেছেন:
“রঞ্জ সে খুগার হুয়া ইনসান তো মিট জাতা হ্যায় রঞ্জ,
মুশকিলেঁ মুঝপর পড়িঁ ইত্তি কে আসান হো গয়ি।”
ভাবার্থ: কষ্টে অভ্যস্ত হয়ে গেলে কষ্ট আর কষ্ট থাকে না। এত বেশি সমস্যা আমার উপর পড়েছে যে, এখন সব সহজ হয়ে গেছে।
“ঘর জব বানা লিয়া তেরে দর পর কহে বাগয়ির,
জানেগা আব ভি তু না মেরা ঘর কহে বাগয়ি?”
ভাবার্থ: তোমার দরজার সামনেই যখন বাড়ি বানিয়ে নিয়েছি, এবারও কি তুমি বলবে যে আমার ঠিকানা তুমি জানো না?
“রনে সে অউর ইশক মেঁ বেবাক হো গয়ে,
ধোয়ে গয়ে হাম ইত্তে কি বাস পাক হো গয়ে।”
ভাবার্থ: প্রেমের বেদনায় কাঁদতে কাঁদতে আমরা আরও বেপরোয়া হয়ে গেছি। চোখের জলে নিজেকে এতটাই ধুয়েছি যে এখন একদম পবিত্র হয়ে গেছি।
“আগে আতি থি হাল-এ-দিল পে হাঁসি,
আব কিসি বাত পার নেহি আতি।”
ভাবার্থ: আগে নিজের মনের এই করুণ দশা দেখে হাসি পেত; কিন্তু এখন আর কোনো কিছুতেই হাসি আসে না।
“দিল হি তো হ্যায় না সঙ্গ-ও-খিশত, দর্দ সে ভার না আয়ে কিঁউ,
রোয়েঙ্গে হাম হাজার বার, কোই হামেঁ সাতায়ে কিঁউ?”
ভাবার্থ: এটা আমার হৃদয়—কোনো পাথর বা ইট তো নয়, ব্যথায় কেন ভরে উঠবে না? আমরা হাজার বার কাঁদব, কেউ আমাদের কাঁদাতে আসবে কেন?
“গাম আগারচে জান-গুসিল হ্যায়, পে কাঁহা বাচেন কে দিল হ্যায়,
গাম-এ-ইশক গার না হোতা, গাম-এ-রোজগার হোতা।”
ভাবার্থ: যদিও দুঃখ জীবন কেড়ে নেয়, তবুও বাঁচার উপায় কী, কারণ আমার একটা হৃদয় আছে। প্রেমের দুঃখ না থাকলে, সংসারের দুঃখ তো থাকতোই!
“ইয়া রাব ওয়ো না সমঝে হ্যায় না সমঝেঙ্গে মেরি বাত,
দে অউর দিল উনকো, জো না দে মুঝকো জবান অউর।”
ভাবার্থ: হে প্রভু! সে আমার কথা বোঝেনি, আর কখনো বুঝবেও না। হয় তাকে নতুন একটা হৃদয় দাও, নয়তো আমাকে নতুন একটা ভাষা দাও।
“জি ঢুন্ডতা হ্যায় ফির ওয়াহি ফুরসত কে রাত দিন,
ব্যায়ঠে রহেঁ তসউবুর-এ-জানান কিয়ে হুয়ে।”
ভাবার্থ: মন আবার সেই পুরোনো অবসর আর রাত-দিনগুলোকে খুঁজছে; যখন শুধু প্রিয়তমার কথা ভেবেই সারাদিন পার করে দিতাম।
“কিস সে মেহকুর হুঁ ম্যায় ক্যা বাতাউঁ,
খুশিয়োঁ কে ইয়ে মারে ম্যায় ক্যা বাতাউঁ।”
ভাবার্থ: আমি যে কার থেকে দূরে সরে আছি, তা আর কী বলব! আমার আনন্দগুলো যে কীভাবে মারা গেছে, তা আর কীভাবে বোঝাবো!
“রাহিয়ে আব অ্যায়সি জঘ চল কর যাঁহা কোই না হো,
হাম-সুখান কোই না হো অউর হাম-জবান কোই না হো।”
ভাবার্থ: চলো এবার এমন কোথাও গিয়ে থাকা যাক, যেখানে কেউ থাকবে না; কেউ আমার সাথে কথা বলবে না, কেউ আমার ভাষা বুঝবে না।
“মুদ্দত হুই হ্যায় ইয়ার কো মেহমান কিয়ে হুয়ে,
জোশ-এ-কাদাহ সে বাজম চেরাগান কিয়ে হুয়ে।”
ভাবার্থ: অনেক দিন হয়ে গেল প্রিয়জনকে নিজের অতিথি বানাইনি; অনেক দিন হলো মদের আড্ডায় হাসিখুশির আলো জ্বালাইনি।
“কভি নেকি ভি উসকে জি মেঁ গর আ যায়ে হ্যায় মুঝসে,
জফায়েঁ করকে আপনি ইয়াদ শরমা যায়ে হ্যায় মুঝসে।”
ভাবার্থ: কখনো যদি তার মনে আমার প্রতি একটু দয়াও আসে, তবে সে আমার সাথে আগে করা তার নিজের জুলুমগুলোর কথা মনে করে নিজেই লজ্জিত হয়।
“ফির মুঝে দিদা-এ-তার ইয়াদ আয়া,
দিল জিগার তশনা-এ-ফারিয়াদ আয়া।”
ভাবার্থ: আবার আমার সেই ভেজা চোখের কথা মনে পড়ে গেল; আবার আমার হৃদয় ডুকরে কেঁদে ওঠার জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠল।
“গাম-এ-হস্তি কা আসাদ কিস সে হো জুজ মার্গ ইলাজ,
শাম্মা হার রংগ মেঁ জলতি হ্যায় সাহার হোতে তক।”
ভাবার্থ: হে আসাদ (গালিব), মৃত্যু ছাড়া জীবনের এই দুঃখের আর কী চিকিৎসা আছে? মোমবাতিকে তো সকাল হওয়া পর্যন্ত জ্বলতেই হয়।
“দর্দ মান্নাত কাশ-এ-দাওয়া না হুয়া,
ম্যায় না আচ্ছা হুয়া, বুরা না হুয়া।”
ভাবার্থ: আমার ব্যথা কোনো ওষুধের কাছে অনুগ্রহ চাইল না। আমি সুস্থ তো হলামই না, কিন্তু তাতে কোনো খারাপও হলো না!
“আতা হ্যায় দাগ-এ-হাসরাত-এ-দিল কা শুমার ইয়াদ,
মুঝসে মেরে গুনাহ কা হিসাব অ্যায় খুদা না মাংগ।”
ভাবার্থ: আমার হৃদয়ের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষাগুলোর কথা মনে পড়লে দাগের মতো জ্বলে; হে ঈশ্বর, আমার কাছে আমার পাপের হিসাব আর চেয়ো না।
“কি মেরে কতল কে বাদ উসনে জফা সে তওবা,
হায় উস জওদ-পশেমান কা পশেমান হোনা।”
ভাবার্থ: আমাকে খুন করার পর সে অত্যাচার করা থেকে তওবা করল; হায়! এত তাড়াতাড়ি তার এই অনুশোচনা, বড্ড দেরিতে হলো।
“জিকর উস ওয়াশ-রুহ কা অউর ফির বয়ান আপনা,
বন গ্যায়া রাকীব আখির থা জো রাজদান আপনা।”
ভাবার্থ: সেই রূপসীর কথা আমি এমন সুন্দর করে বর্ণনা করলাম যে, যে আমার রহস্য জানতো, সেই বন্ধুই শেষমেশ আমার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে গেল!
“জলা হ্যায় জিসম যাঁহা দিল ভি জল গ্যায়া হোগা,
কুরেদতে হো জো আব রাখন জুস্তজু ক্যা হ্যায়।”
ভাবার্থ: যেখানে শরীরই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, সেখানে হৃদয়টাও নিশ্চয়ই পুড়েছে। এখন ছাই ঘেঁটে ঘেঁটে তুমি আর কী খুঁজছো?
“বোঝ উঠানে কো শব-এ-হিজর কি তাকাত নেহি হ্যায়,
দর্দ সে চুর হুঁ অউর আঁখ মেঁ নিঁদ নেহি হ্যায়।”
ভাবার্থ: বিচ্ছেদের রাতের এই ভারী বোঝা বইবার আর শক্তি আমার নেই; ব্যথায় শরীর ভেঙে যাচ্ছে, অথচ চোখে এক ফোঁটাও ঘুম নেই।
৩. দার্শনিক শায়েরি (Philosophical Shayari)
অস্তিত্ব, ঈশ্বর ও সৃষ্টি নিয়ে গালিবের গভীর চিন্তাধারার ২০টি শায়েরি:
“না থা কুছ তো খুদা থা, কুছ না হোতা তো খুদা হোতা,
ডুবোয়া মুঝ কো হোনে নে, না হোতা ম্যায় তো ক্যা হোতা।”
ভাবার্থ: যখন কিছুই ছিল না তখন ঈশ্বর ছিলেন; যদি কিছু না থাকতো, তবুও তিনি থাকতেন। আমার অস্তিত্বই আমাকে ডুবিয়েছে; যদি আমি না থাকতাম, তবে কীই বা হতো?
“কয়েদে হায়াৎ ও বন্দে গম আসল মেঁ দোনো এক হ্যায়,
মৌত সে পহলে আদমি গম সে নাজাৎ পায়ে ক্যুঁ?”
ভাবার্থ: জীবনের কারাগার আর দুঃখের বন্ধন—আসলে দুটোই এক। মৃত্যুর আগে মানুষ দুঃখ থেকে মুক্তি পাবেই বা কেন?
“কাবা কিস মুঁহ সে যাওগে গালিব,
শারম তুম কো মাগার নেহি আতি?”
ভাবার্থ: কোন মুখে কাবায় (পবিত্র স্থানে) যাবে গালিব? তোমার কি একটুও লজ্জা নেই?
“হাম কো মালুম হ্যায় জান্নাত কি হাকিকত লেকিন,
দিল কে খুশ রাখনে কো গালিব ইয়ে খায়াল আচ্ছা হ্যায়।”
ভাবার্থ: জান্নাতের আসল রহস্য আমি খুব ভালো করেই জানি—তবে মনকে সান্ত্বনা দিতে এই ধারণাটা নেহায়েত মন্দ নয়, গালিব!
“হ্যায় কাঁহা তামান্না কা দুসরা কদম ইয়া রাব,
হামনে দস্ত-এ-ইমকান কো এক সুরাগ পায়া হ্যায়।”
ভাবার্থ: হে ঈশ্বর, মানুষের আকাঙ্ক্ষার দ্বিতীয় পা ফেলার জায়গা কোথায়? আমরা তো এই পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে কেবল এক পায়ের ছাপ বলেই মনে করি।
“হস্তি কে মাত ফারেব মেঁ আ জাইয়ো আসাদ,
আলাম তামাম হালকা-এ-দাম-এ-খায়াল হ্যায়।”
ভাবার্থ: হে আসাদ, অস্তিত্বের এই ধোঁকায় পা দিও না। এই পুরো জগতটাই আসলে মানুষের কল্পনার জালে বোনা একটা বিভ্রম মাত্র।
“বাজিচা-এ-আতফাল হ্যায় দুনিয়া মেরে আগে,
হোতা হ্যায় শব ও রোজ তামাশা মেরে আগে।”
ভাবার্থ: আমার সামনে এই পৃথিবীটা যেন বাচ্চাদের খেলার মাঠ। প্রতিটি রাত আর দিনে আমার চোখের সামনে কেবল এই জীবনের তামাশাই ঘটে যাচ্ছে।
“সব কাঁহা কুছ লালা-ও-গুল মেঁ নুমায়া হো গয়ি,
খাক মেঁ ক্যা সুরাতেঁ হোগি কি পিনহা হো গয়ি।”
ভাবার্থ: সবাই তো আর টিউলিপ বা গোলাপ হয়ে ফিরে আসেনি! কে জানে, মাটির নিচে আরও কত সুন্দর সুন্দর মুখ লুকিয়ে আছে!
“হ্যায় আদমি বাজায়ে খুদ ইক মেহশর-এ-খায়াল,
হাম আনজুমান সমঝতে হ্যায় খিলওয়াত হি কিঁউ না হো।”
ভাবার্থ: মানুষ নিজেই তার নিজের চিন্তার মধ্যে এক বিশাল জনসমুদ্র। আমি নির্জনে থাকলেও মনে হয় আমি কোনো ভরা মজলিশে আছি।
“ইমান মুঝে রোকে হ্যায়, যো খেঁচে হ্যায় মুঝে কুফর,
কাবা মেরে পিছে হ্যায়, কালিসা মেরে আগে।”
ভাবার্থ: বিশ্বাস আমাকে আটকে রাখছে, আর অবিশ্বাস আমাকে সামনের দিকে টানছে। আমার পেছনে পড়ে আছে কাবা, আর সামনে দাঁড়িয়ে আছে গির্জা।
“কাতরা কাতরা বহর-এ-বেকারাঁ হ্যায় মেহরি সে,
এক এক জরা আফতাব-এ-রোশন হ্যায়।”
ভাবার্থ: প্রেমের প্রভাবে প্রতিটি পানির ফোঁটাই এক অসীম সমুদ্র; প্রতিটি ধূলিকণাই যেন এক আলোকিত সূর্য।
“কঁহা ম্যায়খানে কা দরওয়াজা গালিব অর কাঁহা ওয়ায়েজ,
পার ইতনা জান্তে হ্যায় কাল ওয়ো জাতা থা কে হাম নিকলে।”
ভাবার্থ: কোথায় মদের দোকানের দরজা, আর কোথায় ধর্ম প্রচারক! তবে এতটুকু জানি, গতকাল যখন আমরা বের হচ্ছিলাম, তখন সে ভেতরে ঢুকছিল।
“আইনা দেখ আপনা সা মুঁহ লেকে রেহ গয়ে,
সাহাব কো দিল না দেনে পে কিতনা গুরুর থা।”
ভাবার্থ: আয়নায় নিজের মুখ দেখে সে বোকা বনে গেল; সাহেব তো কখনো কাউকে মন না দেওয়ার অহংকারে মত্ত ছিলেন!
“বুলবুল কে কারোবার পে হ্যায় খন্দা হায়ে গুল,
কহতে হ্যায় জিসকো ইশক, খালল হ্যায় দিমাগ কা।”
ভাবার্থ: বুলবুলির পাগলামি দেখে গোলাপ ফুল হাসে; মানুষ যাকে প্রেম বলে, সেটা আসলে মস্তিষ্কের এক ধরনের বিকার মাত্র।
“দেখনা তাকরীর কি লজ্জত কে জো উসনে কাহা,
ম্যায়নে ইয়ে জানা কি গোয়া ইয়ে ভি মেরে দিল মেঁ হ্যায়।”
ভাবার্থ: তার কথার এমন এক জাদুকরী স্বাদ ছিল যে, সে যা-ই বলছিল, আমার মনে হচ্ছিল—আরে! ঠিক এই কথাটাই তো আমার হৃদয়েও ছিল!
“হর এক বাত পে কহতে হো তুম কি তু ক্যা হ্যায়,
তুমহি কহু কে ইয়ে আন্দাজ-এ-গুফতুগু ক্যা হ্যায়।”
ভাবার্থ: আমার প্রতিটি কথাতেই তুমি তাচ্ছিল্য করে বলো, ‘তুই আবার কে?’ তুমিই বলো, কথা বলার এই কেমন স্টাইল!
“বক রাহা হুঁ জুনুন মেঁ ক্যা ক্যা কুছ,
কুছ না সমঝে খুদা কারে কোই।”
ভাবার্থ: পাগলের মতো প্রলাপ বকে কত কী যে বলছি! ঈশ্বর করুন, আমার এই কথাগুলো যেন কেউ না বোঝে।
“হাজার শাম-এ-ফারোজাঁ হোঁ তো ক্যা হ্যায়,
বিনা এক রৌশনি কে সব আন্ধেরা হ্যায়।”
ভাবার্থ: হাজারটা জ্বলন্ত বাতি থাকলেও বা কী আসে যায়; মনের সেই একটি বিশেষ আলো না থাকলে সবই তো অন্ধকার।
“না শুনো গর বুরা কাহে কোই,
না কাহো গর বুরা কারে কোই।”
ভাবার্থ: কেউ যদি খারাপ কথা বলে, তবে তা শুনো না; কেউ যদি খারাপ কাজ করে, তবে তাকে খারাপ বোলো না। (ক্ষমার দর্শন)
“মেহেরবাঁ হো কে বুলা লো মুঝে চাহো যিস ওয়াক্ত,
মেঁ গায়া ওয়াক্ত নেহি হুঁ কে ফির আ ভি না সকুঁ।”
ভাবার্থ: অনুকম্পা হলে ডেকে নিও আমায়, যখনই তোমার ইচ্ছে হয়—আমি তো আর ফেলে আসা অতীত নই, যে ফিরে আসতে পারব না!
৪. জীবনদর্শন ও উপলব্ধির শায়েরি (Life Philosophy)
বন্ধুত্ব, সমাজ ও বাস্তব জীবন নিয়ে গালিবের অমূল্য ২০টি শায়েরি:
“সব কো মকবুল হ্যায় দাবা ও হর এক বাত মেরি,
পর হ্যায় কুছ বাত যো বদনাম করতি হ্যায় মুঝে।”
ভাবার্থ: সব সম্পর্ক ছিন্ন করো না বন্ধু—যদি আর কিছুই না থাকে, তবে শত্রুতাটুকুই থাক।
“দোস্ত গামখোয়ারি মেঁ মেরি সায়ি ফরমায়েঙ্গে ক্যা,
জখম কে ভরনে তলক নাখুন না বাড় জায়েঙ্গে ক্যা?”
ভাবার্থ: বন্ধুরা আমার দুঃখ লাঘবের আর কী চেষ্টা করবে? আমার এই ক্ষত শুকাতে শুকাতে কি নখগুলো বড় হয়ে যাবে না (যাতে আবার চুলকে ক্ষত করতে পারি)?
“জিন্দেগি আপনি জাব ইস শকল সে গুজরি গালিব,
হাম ভি ক্যা ইয়াদ করেঙ্গে কে খুদা রাখতে থে।”
ভাবার্থ: আমার জীবন যখন এমন করুণভাবেই কাটল গালিব, তখন আমরা আর কী মনে রাখব যে আমাদেরও একজন ঈশ্বর ছিলেন!
“হাম ওয়াহা হ্যায় যাঁহা সে হামকো ভি,
কুছ হামারি খবর নেহি আতি।”
ভাবার্থ: আমি এখন জীবনের এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছি, যেখান থেকে আমার নিজের কোনো খবরই আর আমার কাছে এসে পৌঁছায় না।
“করজ কি পিতে থে মে অউর সমঝতে থে কে হাঁ,
রং লায়েগি হামারি ফাকা-মস্তি এক দিন।”
ভাবার্থ: ধার করে মদ খেতাম আর ভাবতাম, হ্যাঁ—আমাদের এই অভাবের আনন্দ একদিন ঠিকই বড় কোনো রং ছড়াবে।
“মরনে কি দুয়ায়েন ক্যু মাঙ্গু,
জিনে কি তামান্না কিসকো হ্যায়।”
ভাবার্থ: মৃত্যুর জন্য আমি প্রার্থনা করতে যাব কেন? বেঁচে থাকার ইচ্ছাই বা আর কার আছে!
“ম্যায় অউর বজম-এ-মে সে য়ুঁ তিশনা-কাম আউঁ,
গার ম্যায়নে কি থি তওবা, সাকি কো ক্যা হুয়া থা।”
ভাবার্থ: আমি মদের আসর থেকে তৃষ্ণার্ত হয়ে ফিরে এলাম! আমি না হয় পান না করার প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, কিন্তু মদ পরিবেশনকারীর (সাকি) কী হয়েছিল?
“ফির ইস আন্দাজ সে বাহার আয়ি,
কি হুয়ে মেহর-ও-মাহ তামাশাই।”
ভাবার্থ: এবার এমন দারুণ ভঙ্গিতে বসন্ত এসেছে যে, আকাশ থেকে সূর্য আর চাঁদও দাঁড়িয়ে এই তামাশা দেখছে।
“ধুল গয়ে দাগ-এ-শিকায়ত আস্ক-এ-খুনি সে মেরে,
খত গয়া লেকিন রোকুম রওসন হো গয়ে।”
ভাবার্থ: আমার রক্তের অশ্রুতে সব অভিযোগের দাগ ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে গেছে।
“কিসকো দেঁ জান, কে কুছ জান মেঁ কুয়াত হি নেহি,
জিসকো দেঁ দিল, ওয়ো দিলি মেঁ নেহি।”
ভাবার্থ: কাকে আমি নিজের জীবন দেব, জীবনে তো আর কোনো শক্তিই অবশিষ্ট নেই! আর যাকে আমি মন দেব, সে তো দিল্লিতেই নেই।
“কাম উস সে আ পাড়া হ্যায় কে জিসকা মাকান হ্যায়,
ইয়ে দিল কি জিসকা নাম মাকান-এ-খরাব হ্যায়।”
ভাবার্থ: আজ তার সাথেই আমার দরকার পড়েছে, যে কিনা আমার এই ধ্বংসপ্রাপ্ত মনের (হৃদয়) মালিক।
“হুই মুদ্দত কে গালিব মার গয়া পার ইয়াদ আতা হ্যায়,
ওয়ো হার এক বাত পার কহনা কে য়ুঁ হোতা তো ক্যা হোতা।”
ভাবার্থ: গালিব মারা গেছে অনেক দিন হলো; কিন্তু তার সেই কথাটা খুব মনে পড়ে—প্রতিটি বিষয়ে তার বলা ‘এমনটা হলে কী হতো!’
“কুছ তো পড়িয়ে কে লোগ কহতে হ্যায়,
আজ গালিব গজল-সারা না হুয়া।”
ভাবার্থ: কিছু তো পাঠ করুন, কারণ মানুষ বলাবলি করছে যে আজ গালিব কোনো গজল গাইল না কেন?
“হাসিল-এ-উলফত নেহি জুজ দর্দ-এ-বে-দারমান আসাদ,
আপনে হি ঘায়েল কে পার মেঁ উড় গ্যায়া অ্যায়সে তীর।”
ভাবার্থ: ভালোবাসায় লাইলাজ (নিরাময়হীন) ব্যথা ছাড়া আর কিছুই পাওয়ার নেই আসাদ!
“হাওয়া-এ-সায়ের-এ-গুল আইনা-এ-বে-মেহরি-এ-ক্বাতিল,
কে মাকতুল কে খুন সে হো গ্যায়া হ্যায় লালা-জার আপনা।”
ভাবার্থ: এই পৃথিবীর বাগানের বাতাস কেবল হত্যাকারীর নির্দয়তার আয়না; নিহতদের রক্তেই আজ এই ফুলবাগান সেজে উঠেছে।
“মায়খাদা খুল গ্যায়া হ্যায়, সাবু লাতে হ্যায় লোক,
হ্যায় ইয়াদ-এ-ইয়ার-এ-মেহরবান, দিওয়ানে কিঁউ নেহি।”
ভাবার্থ: মদের দোকান খুলে গেছে, মানুষ পাত্র নিয়ে আসছে; দয়ালু বন্ধুর কথা মনে পড়ছে, তো আমি পাগল হবো না কেন?
“দর্দ জাব হদ সে গুজর জাতা হ্যায় তো দাওয়া হো জাতা হ্যায়,
গাম জাব বে-হদ হো জাতা হ্যায় তো খুশি হো জাতা হ্যায়।”
ভাবার্থ: ব্যথা যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন সেটাই ওষুধ হয়ে দাঁড়ায়। দুঃখ যখন অসীম হয়ে যায়, তখন তা আনন্দ বলে মনে হয়।
“আতা হ্যায় ইয়াদ মুঝকো গুজরা হুয়া জামানা,
ওয়ো বাগ কি বাহারেঁ ওয়ো সবকা চেহচাহানা।”
ভাবার্থ: আমার সেই ফেলে আসা পুরনো দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ে; সেই বাগানের বসন্ত, আর পাখিদের সেই কলকাকলি।
“যিন্দেগি য়ুঁ ভি গুজর হি জাতি,
কিঁউ তেরা রাহগুজার ইয়াদ আয়া।”
ভাবার্থ: জীবন তো এভাবেই কোনো না কোনোভাবে কেটে যেত; অযথাই তোমার ফেলে যাওয়া পথের কথা মনে পড়ে গেল!
“রোহ্ মেঁ হ্যায় রাক্স-এ-শাওর-এ-জুনুন-এ-নাজুক,
ইয়ে জিন্দেগি হ্যায় কে খয়াম কি রুবাই হ্যায়।”
ভাবার্থ: আমার চেতনার গভীরে এক অদ্ভুত পাগলামি নাচছে; এটা কি আমার জীবন, নাকি ওমর খৈয়ামের কোনো কবিতা!
৫. প্রেমের বিখ্যাত গজল শায়েরি (Mirza Ghalib Ghazal)
গালিবের বিভিন্ন গজল থেকে নেওয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় ২০টি লাইন বা শের:
“আব রাত ভি হ্যায় কুছ এয়সা কি গম খাতে নহিঁ বনতে,
বাহুত সোচা কি জালিম পর গালিব কুছ নহিঁ বনতে।”
ভাবার্থ: এখন অনেক রাত। চারদিকে অন্ধকার; কোথাও কেউ নেই। চলো গালিব! তার বাড়ির দেওয়ালে চুমু দিয়ে আসো।
“তেরে কোচে হার বাহানে মুঝে আব নিকালনা হ্যায়,
ইয়ে বাহানা ঢুন্ডনা হ্যায় কে বাহানা ক্যা বানায়ু।”
ভাবার্থ: তোমার গলিতে যাওয়ার জন্য আমার এখন একটা বাহানা দরকার; আমি শুধু এই বাহানাই খুঁজছি যে কী বাহানা বানানো যায়!
“আশিকি সবর তলব অউর তামান্না বেতাব,
দিল কা ক্যা রংগ কারুঁ খুন-এ-জিগর হোতে তক।”
ভাবার্থ: প্রেম দাবি করে ধৈর্য, আর আকাঙ্ক্ষা হলো অস্থির। কলিজা রক্ত হওয়া পর্যন্ত আমি এই মন নিয়ে কী করব?
“ইশক নে তোড়া হ্যায় দিল કો, ক্যা বাতায়েঁ তুমকো গালিব,
জিসমেঁ হাম জিন্দা থে, আব ওয়ো মাকান টুট গ্যায়া।”
ভাবার্থ: প্রেম আমার হৃদয়কে এমনভাবে ভেঙেছে যে তোমাকে আর কী বলব গালিব, যে ঘরে আমি বেঁচে ছিলাম, সেটাই ভেঙে গেছে।
“হর চাঁদ হো মুশাহাদা-এ-হক কি গুফতগু,
বনতি নেহি হ্যায় বদা-ও-সাগর কাহে বগায়র।”
ভাবার্থ: যতই পরম সত্য বা ঈশ্বরের দর্শন নিয়ে আলোচনা হোক না কেন, মদ আর পেয়ালার উদাহরণ ছাড়া সে কথা যেন জমেই না!
“চালনা হ্যায় তো চল মেরি জানান মেরি জানান,
রাহ মেঁ কাহিঁ কোই রুকতা নেহি হ্যায়।”
ভাবার্থ: চলতে হলে চলো আমার প্রিয়তমা; কারণ জীবনের এই পথে কেউই তো কোথাও থেমে থাকে না।
“উন কি জেফা সে ক্যা গিলা, আপনি ওয়াফা সে ক্যা গিলা,
উনকি জেফা মেঁ মজা, আপনি ওয়াফা মেঁ মজা।”
ভাবার্থ: তার জুলুমের কী অভিযোগ করব, আর আমার বিশ্বস্ততারই বা কী অভিযোগ! তার অত্যাচারে এক মজা, আর আমার ভালোবাসায় আরেক মজা।
“বুলবুল কে কারোবার পে হ্যায় খন্দা হায়ে গুল,
কহতে হ্যায় জিসকো ইশক, খালল হ্যায় দিমাগ কা।”
ভাবার্থ: বুলবুলির প্রেম দেখে গোলাপ হাসে। লোকে যাকে প্রেম বলে, তা তো আসলে মাথার গোলমাল।
“ফির কুছ ইস দিল কো বে-করারী হ্যায়,
সিনা জুঁইয়া-এ-জখম-এ-কারি হ্যায়।”
ভাবার্থ: এই মনে আজ আবার কেমন যেন এক অস্থিরতা শুরু হয়েছে; বুকটা যেন আবার কোনো গভীর ক্ষতের সন্ধান করছে।
“পিনে দে শারাব মসজিদ মেঁ ব্যায়ঠ কর,
ইয়া ওয়ো জায়গাহ বাতা যাঁহা খুদা নেহি হ্যায়।”
ভাবার্থ: আমাকে মসজিদে বসেই মদ খেতে দাও গালিব; আর না হয় আমাকে এমন কোনো জায়গার কথা বলো যেখানে ঈশ্বর নেই!
“মুহব্বত মেঁ নেহি হ্যায় ফার্ক জিনে অর মারনে কা,
উসি কো দেখ কার জিতে হ্যায় জিস কাফির পে দম নিকলে।”
ভাবার্থ: প্রেমে জীবন আর মৃত্যুর কোনো ফারাক নেই। যার জন্য প্রাণ বেরিয়ে যায়, তাকে দেখেই আমরা বেঁচে থাকি।
“বে-খুদি বে-সবব নেহি গালিব,
কুছ তো হ্যায় জিসকি পর্দা-দারি হ্যায়।”
ভাবার্থ: আমার এই বেসামাল অবস্থা বা আত্মভোলা হওয়ার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে গালিব; কিছু একটা তো আছে যা আমি গোপন করার চেষ্টা করছি।
“জ্বলা হ্যায় জিসম যাঁহা দিল ভি জল গ্যায়া হোগা,
কুরেদতে হো জো আব রাখন জুস্তজু ক্যা হ্যায়।”
ভাবার্থ: শরীরটাই যেখানে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, হৃদয়টাও নিশ্চয়ই পুড়েছে। এখন ছাই ঘেঁটে আর কী খুঁজছো তুমি?
“তুমহারি ইয়াদ কে জাব জখম ভরনে লাগতে হ্যায়,
কিসি বাহানে তুমহে ইয়াদ কারনে লাগতে হ্যায়।”
ভাবার্থ: তোমার স্মৃতির ক্ষতগুলো যখন শুকাতে শুরু করে, তখন আমি কোনো না কোনো বাহানায় আবার তোমাকে মনে করতে শুরু করি।
“দিল সে তেরি নিগাহ জিগার তক উতার গয়ি,
দোনো কো ইক আদা মেঁ রাজামন্দ কর গয়ি।”
ভাবার্থ: তোমার ওই দৃষ্টি হৃদয় ভেদ করে একেবারে কলিজা পর্যন্ত নেমে গেল; এক পলকেই সে দুটোকেই নিজের বশে করে নিল।
“আশিকি সবর তলব অর তামান্না বেতাব,
দিল কা ক্যা রং করুঁ খুন-এ-জিগার হোতে তক।”
ভাবার্থ: প্রেম চায় ধৈর্য, আর ইচ্ছাগুলো বড্ড অস্থির। কলিজা রক্ত হয়ে যাওয়া পর্যন্ত আমি এই মন নিয়ে কী করব?
“কুছ তো হ্যায় জিসকি পর্দা-দারি হ্যায়,
বে-খুদি বে-সবব নেহি গালিব।”
ভাবার্থ: কিছু একটা তো আছে যা লুকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে; আমার এই পাগলপারা অবস্থা বিনা কারণে নয় গালিব।
“ইশক নে গালিব নিকম্মা কর দিয়া,
ওয়ারনা হম ভি আদমি থে কাম কে।”
ভাবার্থ: প্রেম গালিবকে একেবারে অপদার্থ বানিয়ে দিয়েছে—নইলে আমিও তো একজন কাজের মানুষই ছিলাম!
“দিল-ই-নাদাঁ তুঝে হুয়া ক্যা হ্যায়,
আখির ইস দর্দ কি দাওয়া ক্যা হ্যায়?”
ভাবার্থ: ওরে আমার অবুঝ মন, তোর কী হয়েছে? এই ব্যথার শেষ পর্যন্ত কোনো ওষুধ কি আছে?
“আহ কো চাহিয়ে ইক উমর আসর হোনে তক,
কৌন জিতা হ্যায় তেরি জুলফ কে সার হোনে তক।”
ভাবার্থ: একটি দীর্ঘশ্বাসের প্রভাব পড়তে তো সারা জীবন লেগে যায়; তোমার জট পাকানো চুল (মন) খুলতে খুলতে কে আর ততদিন বেঁচে থাকবে?
৬. মির্জা গালিবের বিখ্যাত উক্তি (Famous Quotes in Bangla)
কবিতার বাইরেও মির্জা গালিবের চিঠি এবং গদ্যে ছড়িয়ে আছে জীবনের গভীর দর্শন। এখানে তাঁর ২০টি বিখ্যাত উক্তি বাংলায় দেওয়া হলো:
“প্রেম গালিবকে অকর্মা বানিয়ে দিয়েছে—নইলে সেও একসময় কাজের মানুষই ছিল।”
“কষ্টে অভ্যস্ত হলে কষ্ট আর কষ্ট থাকে না। দুঃখের বোঝা বইতে বইতে মানুষ একসময় পাথর হয়ে যায়।”
“পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মিথ্যা বলা হয় ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে—আদালতে। আর সবচেয়ে বেশি সত্য বলা হয় মদ ছুঁয়ে—পানশালায়।”
“সব সম্পর্ক ছিন্ন করো না বন্ধু; যদি কিছুই না থাকে, তবে অন্তত আমাদের শত্রুতাটুকুই বেঁচে থাক।”
“আমি তো অতীত নই, যে ফিরে আসতে পারব না। তুমি ডাকলেই আমি আসব।”
“এই পৃথিবীটা আসলে বাচ্চাদের একটা খেলার মাঠ। এখানে সারাদিন কেবল তামাশাই ঘটে চলেছে।”
“আমি ঈশ্বরকে বিশ্বাস করি, তবে আমি মোল্লা বা পুরোহিতদের তৈরি করা ধর্মে বিশ্বাস করি না।”
“মানুষের জীবন এক কারাগার। মৃত্যুর আগে কেউই এই কারাগারের দুঃখ থেকে মুক্তি পায় না।”
“আমার প্রতিটি কবিতায় আমার রক্ত মিশে আছে। আমি কেবল কালি দিয়ে লিখি না।”
“যে ব্যথা ভাষায় প্রকাশ করা যায়, তা আসলে প্রকৃত ব্যথা নয়। আসল ব্যথা তো মানুষের নীরবতায় লুকিয়ে থাকে।”
“সত্যিকারের বন্ধু সেই, যে তোমার নীরবতা বুঝতে পারে।”
“আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো আমি যাকে সবচেয়ে বেশি চেয়েছি, তাকেই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছি।”
“যখন কিছু পাওয়ার আশা থাকে না, তখনই মানুষ সত্যিকারের মুক্তি লাভ করে।”
“পাপ ছাড়া কি মানুষের জীবন সম্পূর্ণ হয়? পাপ না থাকলে মানুষ তো দেবতা হয়ে যেত!”
“আমি তোমায় ভুলে গেছি, কিন্তু তোমার স্মৃতিগুলো আমাকে ভুলতে দেয়নি।”
“জীবনকে আমি কোনোদিন সিরিয়াসলি নিইনি, কারণ আমি জানি এখান থেকে কেউই বেঁচে ফিরতে পারবে না।”
“তুমি আমাকে ঘৃণা করতে পারো, কিন্তু আমাকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা তোমার নেই।”
“আমি ঈশ্বরের কাছে কখনো জান্নাত চাইনি, আমি শুধু চেয়েছি আমার মন যেন একটু শান্তিতে থাকে।”
“ভালোবাসায় মানুষ অন্ধ হয় না, বরং সে এমন কিছু দেখতে পায় যা অন্য কেউ দেখতে পায় না।”
“মৃত্যুই যদি সবকিছুর সমাধান হয়, তবে বেঁচে থেকে এই দুঃখ ভোগের মানে কী?”
মির্জা গালিবের দিওয়ান-ই-গালিব কী?
দিওয়ান-ই-গালিব হলো মির্জা গালিবের উর্দু গজলের সংকলন — যা উর্দু সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত। এতে মোট ২৩০টিরও বেশি গজল রয়েছে। এই সংকলন আকারে ছোট হলেও গভীরতায় অতুলনীয়।
গালিব নিজে তাঁর ফার্সি রচনাকে বেশি মূল্য দিতেন। কিন্তু তাঁর অমরত্ব এসেছে উর্দু গজলের মাধ্যমে। ২০১০ সালে মাওলানা আজাদ ন্যাশনাল উর্দু ইউনিভার্সিটি গালিবের ফার্সি রচনার ১১,৩৩৭টি কবিতার সংকলন “কুল্লিয়াৎ-ই-গালিব ফার্সি” নামে প্রকাশ করে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)
কীভাবে গালিবের শায়েরি পড়বেন?
গালিবের শায়েরি প্রথম পড়ায় কঠিন মনে হতে পারে। এভাবে এগোলে সহজ হবে:
প্রথমে বাংলা ভাবার্থ পড়ুন।
উর্দু মূল পড়ে ছন্দের সৌন্দর্য অনুভব করুন।
শেরটি নিজের জীবনের কোন পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য তা ভাবুন।
বারবার পড়ুন — প্রতিবার নতুন অর্থ মিলবে।
জগজিৎ সিং বা মেহদি হাসানের গাওয়া গজল শুনুন।
শেষকথা
মির্জা গালিব এর শায়েরি শুধু কবিতা নয় — এটি জীবনের একটি আয়না। প্রেম, বেদনা, দর্শন, হাস্যরস ও আধ্যাত্মিকতার এই অপূর্ব মিশেলে গালিব তৈরি করেছেন এমন এক কাব্যজগৎ, যা দুই শতাব্দী পরেও সমান প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের মানুষের কাছে গালিবের শায়েরি বিশেষ প্রিয়, কারণ এর প্রতিটি লাইন আমাদের নিজের কথা বলে — আমাদের ইচ্ছা, আমাদের কষ্ট, আমাদের জিজ্ঞাসা।
📚 তথ্যসূত্র
- Encyclopaedia Britannica — Mirza Ghalib Biography
- Wikipedia — Ghalib
- Rekhta.org — Mirza Ghalib Poetry Archive
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”


