আশুরার রোজা ২০২৬ সালে কবে? মুহাররম মাসের ১০ তারিখ অর্থাৎ ইয়াওমে আশুরা পালিত হবে ২৬ জুন ২০২৬ (শুক্রবার)। সুন্নাহ মোতাবেক ৯ ও ১০ মুহাররম (২৫–২৬ জুন) একসাথে রোজা রাখা উত্তম। এই রোজায় বিগত এক বছরের গুনাহ মাফ হয় এটি নবী ﷺ-এর হাদিসে প্রমাণিত।
আশুরার রোজা ২০২৬: তারিখ একনজরে
| দিন | তারিখ | মুহাররম | গুরুত্ব |
|---|---|---|---|
| বৃহস্পতিবার | ২৫ জুন ২০২৬ | ৯ মুহাররম | তাসুআ (সুন্নাহ) |
| শুক্রবার | ২৬ জুন ২০২৬ | ১০ মুহাররম | আশুরা (মূল রোজা) |
| শনিবার | ২৭ জুন ২০২৬ | ১১ মুহাররম | (বিকল্প হিসেবে কেউ রাখতে পারেন) |
বিশেষ নোট: ২০২৬ সালে আশুরার মূল দিনটি শুক্রবার। তাই ৯ ও ১০ মুহাররম মিলিয়ে ২৫–২৬ জুন রোজা রাখা সবচেয়ে উত্তম।
আশুরার রোজা কেন রাখবেন? ফজিলত ও গুরুত্ব
আশুরার রোজার ফজিলত অত্যন্ত বেশি। রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে এই রোজাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন—রমজানের পরেই এর স্থান।
হাদিসে বর্ণিত ফজিলত
- এক বছরের গুনাহ মাফ: “আমি আশা রাখি আল্লাহর কাছে যে, আশুরার রোজা বিগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।” (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)
- নবী ﷺ নিজে রাখতেন: মদিনায় হিজরতের পর তিনি দেখলেন ইহুদিরা এই দিন রোজা রাখছে। জানলেন মুসা আ.-এর শোকরের দিন। তিনি বললেন, “আমরাই মুসার বেশি হকদার।” এরপর নিজেও রাখলেন এবং সাহাবিদেরও নির্দেশ দিলেন। (সহিহ বুখারি: ২০০৪)
- ৯ মুহাররমও রাখার ইচ্ছা: রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছিলেন, “আগামী বছর বেঁচে থাকলে ৯ তারিখেও রোজা রাখব।” (সহিহ মুসলিম: ১১৩৪)
আশুরার রোজার সঠিক নিয়ম ও পদ্ধতি
কত দিন রোজা রাখবেন?
উত্তম: ৯ + ১০ মুহাররম (দুই দিন) জায়েজ: শুধু ১০ মুহাররম (একদিন) বিকল্প মত: ১০ + ১১ মুহাররম (দুই দিন)
ইহুদিদের সাথে মিল না রাখতে রাসুলুল্লাহ ﷺ ৯ তারিখও যোগ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাই ৯ ও ১০—এই দুই দিন রোজা রাখা সুন্নাহর সবচেয়ে কাছের আমল।
রোজার নিয়ত
রাতে ঘুমানোর আগে বা সেহরির সময় মনে মনে নিয়ত করলেই যথেষ্ট। নফল রোজার নিয়ত দিনেও করা যায় (যদি ফজর থেকে এখন পর্যন্ত কিছু না খেয়ে থাকেন)।
সেহরি ও ইফতার
- সেহরি সুন্নাহ, তবে বাধ্যতামূলক নয়।
- ইফতার মাগরিবের আজানের পর করুন।
- যেকোনো হালাল খাবার দিয়ে ইফতার করা যাবে।
আশুরার রোজা কীভাবে পালন করবেন
ধাপ ১: ২৪ জুন রাতে (মঙ্গলবার) নিয়ত করুন—৯ ও ১০ মুহাররম রোজা রাখবেন।
ধাপ ২: ২৫ জুন (বৃহস্পতিবার) সেহরি খেয়ে রোজা শুরু করুন।
ধাপ ৩: ২৫ জুন মাগরিবে ইফতার করুন।
ধাপ ৪: ২৬ জুন (শুক্রবার) আবার সেহরি খেয়ে আশুরার মূল রোজা রাখুন।
ধাপ ৫: ২৬ জুন মাগরিবে ইফতার করুন এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন।
আশুরা কি শুধু রোজার দিন? ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
আশুরা ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ
- হযরত মুসা আ. ও তাঁর উম্মত ফেরাউনের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন
- আল্লাহ তাআলা ফেরাউনকে সমুদ্রে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন
- মুসা আ. শুকরিয়াস্বরূপ এই দিন রোজা রাখতেন
কারবালা সম্পর্কে সঠিক অবস্থান
৬১ হিজরিতে মুহাররমের ১০ তারিখে হযরত হুসাইন রা.-এর শাহাদাত হয়। এটি একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা। তবে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মতে, এই দিন মাতম করা, বুক চাপড়ানো বা শোকের বিশেষ আচার পালন করা শরিয়তসম্মত নয়।
সঠিক আমল: রোজা রাখা, নেক আমল করা, দোয়া করা।
আশুরার রোজা সম্পর্কে সাধারণ ভুলভ্রান্তি
ভুল ১: শুধু ১০ মুহাররম রোজা রাখা যথেষ্ট মনে করা
সঠিক: যথেষ্ট হলেও, ৯ তারিখসহ রোজা রাখা বেশি উত্তম।
ভুল ২: আশুরায় বিশেষ খাবার রান্না করা সুন্নাহ মনে করা
সঠিক: এর কোনো শরঈ ভিত্তি নেই। এটি প্রচলিত কিন্তু ইসলামে প্রমাণিত নয়।
ভুল ৩: এই দিন শোক পালন করা
সঠিক: রোজা রাখুন, শোক নয়।
ভুল ৪: রোজা না রেখেও দিন বিশেষভাবে কাটানো যথেষ্ট মনে করা
সঠিক: মূল আমল হলো রোজা। এটিই সুন্নাহসম্মত।
ভুল ৫: নিয়ত মুখে উচ্চস্বরে বলা বাধ্যতামূলক মনে করা
সঠিক: মনে মনে নিয়ত করাই যথেষ্ট।
সাধারন জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন: আশুরার রোজা ২০২৬ সালে কবে? উত্তর: ২০২৬ সালে আশুরার রোজা ২৬ জুন (শুক্রবার, ১০ মুহাররম)। সুন্নাহ অনুযায়ী ২৫ জুন (৯ মুহাররম)-ও রোজা রাখা উত্তম।
প্রশ্ন: আশুরার রোজায় কি এক বছরের গুনাহ মাফ হয়? উত্তর: হ্যাঁ। সহিহ মুসলিমের হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আশুরার রোজা বিগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।
প্রশ্ন: আশুরায় কি দুটো রোজা রাখতে হবে? উত্তর: একটি (১০ মুহাররম) রাখলেও সহিহ। তবে ৯ ও ১০—দুই দিন রাখা সুন্নাহর বেশি অনুসরণ।
প্রশ্ন: আশুরার রোজার নিয়ত কখন করতে হয়? উত্তর: রাতে বা সেহরির সময়। নফল রোজার নিয়ত দিনেও করা যায় যদি ভোর থেকে কিছু না খাওয়া হয়।
প্রশ্ন: মুহাররম মাসের সেরা আমল কী? উত্তর: আশুরার রোজা (৯ ও ১০ মুহাররম), বেশি বেশি নফল নামাজ, দোয়া ও ইস্তেগফার।
প্রশ্ন: আশুরায় বিশেষ খাবার রান্না করা কি সুন্নাহ? উত্তর: না। এর কোনো হাদিসভিত্তিক প্রমাণ নেই। মূল সুন্নাহ হলো রোজা রাখা।
প্রশ্ন: কারবালার ঘটনার সাথে আশুরার রোজার সম্পর্ক কী? উত্তর: আশুরার রোজা কারবালার আগে থেকেই ইসলামে বিদ্যমান। মূল কারণ মুসা আ.-এর মুক্তির শুকরিয়া। কারবালা পরবর্তী ঘটনা।
প্রশ্ন: আশুরায় কি মাতম করা জায়েজ? উত্তর: না। মাতম করা, বুক চাপড়ানো আহলে সুন্নাহর মতে শরিয়তসম্মত নয়।
প্রশ্ন: ২০২৬ সালে ৯ মুহাররম কবে? উত্তর: ২৫ জুন ২০২৬, বৃহস্পতিবার।
প্রশ্ন: আশুরার রোজা কি ফরজ? উত্তর: না, এটি সুন্নাহ ও মুস্তাহাব। তবে ফজিলত অনেক বেশি।
প্রশ্ন: মহিলারা কি আশুরার রোজা রাখতে পারবেন? উত্তর: হ্যাঁ, তবে হায়েজ বা নেফাস অবস্থায় রোজা রাখা যাবে না। পরবর্তীতে কাজা করার সুযোগ নেই কারণ এটি নফল; তবে অন্য সময় নফল রোজা রেখে ফজিলত পেতে পারবেন।
প্রশ্ন: আশুরার রোজার সেহরি কি জরুরি? উত্তর: না, সেহরি সুন্নাহ কিন্তু বাধ্যতামূলক নয়। সেহরি ছাড়াও রোজা সহিহ হবে।
প্রশ্ন: আশুরায় কোন দোয়া পড়বো? উত্তর: কোনো নির্দিষ্ট দোয়া হাদিসে বর্ণিত নেই। সাধারণ ইস্তেগফার, দরুদ ও যেকোনো দোয়া পড়া যাবে।
প্রশ্ন: আশুরার রোজা রাখলে কি কবিরা গুনাহও মাফ হয়? উত্তর: হাদিসে ‘গুনাহ মাফ’ বলা হয়েছে—আলেমদের মতে এটি সগিরা (ছোট) গুনাহের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কবিরা গুনাহের জন্য তওবা জরুরি।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে মুহাররম কি সরকারি ছুটি? উত্তর: হ্যাঁ, আশুরার দিন (১০ মুহাররম) বাংলাদেশে সরকারি ছুটি।
প্রশ্ন: আশুরার রোজা কি ডায়াবেটিস রোগীরা রাখতে পারবেন? উত্তর: শারীরিক সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ইসলামে অসুস্থদের জন্য রোজা মাফ আছে।
আশুরার রোজা ২০২৬: মুহাররমের ১০ তারিখ অর্থাৎ ২৬ জুন ২০২৬ (শুক্রবার) আশুরার রোজা। সুন্নাহ অনুযায়ী ২৫ জুন (৯ মুহাররম)-ও রোজা রাখা উত্তম। এই রোজার ফজিলত হলো বিগত এক বছরের গুনাহ মাফ হওয়া (সহিহ মুসলিম)। মূল আমল: রোজা রাখা, নেক কাজ, ইস্তেগফার। বিশেষ খাবার রান্না বা মাতম করার কোনো শরঈ ভিত্তি নেই।
💾 এই তথ্যটি পরিবার ও বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন যাতে সবাই সঠিক তারিখে রোজা রাখতে পারেন।
Reference / Source List
- সহিহ মুসলিম— hadithcollection.com
- সহিহ বুখারি — sunnah.com
- ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ — islamicfoundation.gov.bd
- বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন (ছুটির তালিকা) — bangladesh.gov.bd
- Sunnah.com (হাদিস আর্কাইভ) — sunnah.com/muslim
