ঈদুল আযহার সুন্নত ও আমল

ঈদুল আযহার সুন্নত ও আমল

ঈদুল আযহার প্রধান সুন্নতগুলোর মধ্যে রয়েছে— সকালে দ্রুত ঘুম থেকে ওঠা, ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করা, মিসওয়াক করা, গোসল করা, নিজের সবচেয়ে উত্তম পোশাক পরিধান করা, আতর ব্যবহার করা, ঈদের নামাজের আগে কিছু না খাওয়া, পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া, যাওয়ার সময় এক রাস্তা ও ফেরার সময় অন্য রাস্তা ব্যবহার করা এবং পথে উচ্চস্বরে ‘তাকবিরে তাশরিক’ পাঠ করা।

আসসালামু আলাইকুম। মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলো ঈদুল আযহা বা কোরবানির ঈদ। উৎসবের আনন্দ উদযাপনের পাশাপাশি এই দিনটিতে বেশ কিছু সুন্নাহ ও আমল রয়েছে, যা পালন করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।

🟢 ঈদুল আযহার দিনের প্রধান সুন্নতসমূহ

নবী করিম (সা.) ঈদের দিন বেশ কিছু কাজ বিশেষভাবে করতেন। নিচে তা পর্যায়ক্রমে দেওয়া হলো:

১. ভোরে ঘুম থেকে ওঠা ও ইবাদত
ঈদের দিন সকালে খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা সুন্নত। ঘুম থেকে উঠে পরিচ্ছন্ন হয়ে নিজ এলাকার মসজিদে ফজরের নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।

২. মিসওয়াক করা ও গোসল করা
ঈদের দিন সকালে মিসওয়াক করা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য গোসল করা সুন্নত। ইবনে মাজাহ-এর হাদিস অনুযায়ী, নবীজি (সা.) ঈদের দিন সকালে গোসল করতেন।

৩. উত্তম বা নতুন পোশাক পরা এবং আতর ব্যবহার
আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী সবচেয়ে ভালো, পরিষ্কার বা নতুন পোশাকটি পরিধান করুন। পুরুষদের জন্য আতর বা সুগন্ধি ব্যবহার করা সুন্নত।

৪. নামাজের আগে কিছু না খাওয়া (ঈদুল আযহার বিশেষ সুন্নত)
ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহার মধ্যে একটি বড় পার্থক্য হলো খাবার গ্রহণে। ঈদুল ফিতরে নামাজের আগে মিষ্টি জাতীয় কিছু খাওয়া সুন্নত হলেও, ঈদুল আযহায় নামাজের আগে কিছু না খাওয়া সুন্নত
(দলিল: জামে তিরমিজি)।
সুন্নত হলো, ঈদের নামাজ ও কোরবানি সম্পন্ন করার পর কোরবানির পশুর গোশত দিয়ে দিনের প্রথম খাবার গ্রহণ করা।

৫. পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া
সম্ভব হলে কোনো বাহন ব্যবহার না করে পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া সুন্নত। এতে প্রতিটি কদমে সওয়াব লেখা হয়।

৬. এক পথ দিয়ে যাওয়া এবং অন্য পথ দিয়ে ফেরা
ঈদের নামাজ আদায় করতে যাওয়ার সময় একটি রাস্তা ব্যবহার করা এবং ফেরার সময় অন্য একটি রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফেরা রাসুল (সা.) এর অন্যতম একটি সুন্নত।
(দলিল: সহিহ বুখারি)

৭. উচ্চস্বরে তাকবিরে তাশরিক পাঠ করা
বাড়ি থেকে ঈদগাহে যাওয়ার পথে এবং ঈদগাহে বসে উচ্চস্বরে তাকবির পাঠ করা সুন্নত।
তাকবিরটি হলো:
“আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।”

৮. খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা
ঈদের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ শেষে ইমাম সাহেব খুতবা প্রদান করেন। এই খুতবা শোনা মুসল্লিদের জন্য ওয়াজিব। খুতবা চলাকালীন কথা বলা বা উঠে চলে যাওয়া উচিত নয়।

৯. ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা
নামাজ শেষে একে অপরের সাথে হাসিমুখে কোলাকুলি করা এবং ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা সুন্নত। সাহাবায়ে কেরাম ঈদের দিন একে অপরকে বলতেন:
“তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম” (অর্থ: আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের নেক আমলগুলো কবুল করুন)।

🟢 কোরবানি করার সুন্নাহ ও নিয়মাবলী

যেহেতু এটি ঈদুল আযহা, তাই কোরবানির সাথেও কিছু সুন্নাহ জড়িত:

  • নিজের কোরবানির পশু নিজ হাতে জবাই করা মুস্তাহাব। নিজে না পারলে সামনে উপস্থিত থাকা ভালো।
  • পশুকে কিবলামুখী করে শোয়ানো এবং ধারালো ছুরি ব্যবহার করা, যাতে পশুর কষ্ট কম হয়।
  • জবাইয়ের সময় “বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার” বলা।
  • যাঁরা কোরবানি করবেন, জিলহজ মাসের চাঁদ ওঠার পর থেকে কোরবানি করা পর্যন্ত তাঁদের চুল, নখ ও গোঁফ না কাটা মুস্তাহাব।

❓ সাধারণ জিজ্ঞাসা

প্র: ঈদুল আযহার দিন নামাজের আগে কি কিছু খাওয়া যাবে?
উত্তর: না, ঈদুল আযহায় নামাজের আগে কিছু না খাওয়া সুন্নত। রাসুল (সা.) কোরবানির দিন ঈদগাহ থেকে ফিরে কোরবানির পশুর গোশত দিয়ে খাবার খেতেন। তবে কেউ যদি অসুস্থতার কারণে খেয়ে ফেলেন, তবে তার গুনাহ হবে না, তবে সুন্নত তরক হবে।

প্র: তাকবিরে তাশরিক কখন থেকে কখন পড়তে হয়?
উত্তর: জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ফজরের নামাজের পর থেকে শুরু করে ১৩ তারিখ আসরের নামাজ পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের সালাম ফেরানোর পর একবার তাকবিরে তাশরিক পড়া প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও মহিলার ওপর ওয়াজিব। পুরুষরা মাঝারি উচ্চস্বরে এবং মহিলারা নিচুস্বরে পড়বেন।

প্র: মহিলাদের ঈদের নামাজের সুন্নত কী?
উত্তর: মহিলাদের জন্যও ঈদের দিন গোসল করা, পরিষ্কার পোশাক পরা এবং তাকবির পাঠ করা সুন্নত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেসব ঈদগাহে বা মসজিদে মহিলাদের নামাজের জন্য সম্পূর্ণ পর্দার ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে তাঁরা অংশগ্রহণ করতে পারেন।

প্র: মসজিদে ঈদের নামাজ পড়লে কি সুন্নত আদায় হবে?
উত্তর: বিনা কারণে মসজিদে ঈদের নামাজ পড়ার চেয়ে উন্মুক্ত মাঠে (ঈদগাহে) ঈদের নামাজ পড়া সুন্নতে মুয়াক্কাদা। তবে বৃষ্টি, বৈরী আবহাওয়া বা অন্য কোনো যৌক্তিক কারণে মসজিদে পড়লে নামাজ হয়ে যাবে।

💡 পাঠকের জন্য পরামর্শ

ঈদুল আযহা কেবল পশু কোরবানির উৎসব নয়, বরং এটি মনের পশুত্ব ও অহংকারকে কোরবানি দেওয়ার দিন। সোশ্যাল মিডিয়ায় কোরবানির পশুর ছবি বা দাম নিয়ে শো-অফ করা থেকে বিরত থাকুন। কোরবানির গোশতের তিন ভাগের এক ভাগ গরিব-দুঃখীদের মাঝে এবং এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে সুষ্ঠুভাবে বণ্টন করুন, যা ইসলামি শরিয়তের একটি সুন্দর নির্দেশনা।

তথ্যসূত্র:
১. সহিহ বুখারি (কিতাবুল ইদাইন)
২. জামে তিরমিজি (ঈদের অধ্যায়)
৩. সুনানে ইবনে মাজাহ

Leave a Comment

Scroll to Top