ঈদুল ফিতরের খুতবা পড়ার নিয়ম কী?
ঈদুল ফিতরের খুতবা নামাজের পরে দেওয়া হয়। ইমাম দুটি খুতবা প্রদান করেন — প্রথম খুতবা শুরু হয় নয়টি তাকবির দিয়ে এবং দ্বিতীয় খুতবা শুরু হয় সাতটি তাকবির দিয়ে। মুসল্লিদের জন্য খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা ওয়াজিব। চার মাযহাবের ঐকমত্যে ঈদের নামাজের পর খুতবা দেওয়া সুন্নত।
ঈদুল ফিতরের খুতবা কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
ঈদুল ফিতর মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবগুলোর একটি। রমজান মাসের দীর্ঘ সিয়াম সাধনার পর শাওয়াল মাসের প্রথম দিনে এই আনন্দের উৎসব পালিত হয়। ঈদের দিন নামাজের পর ইমাম যে বক্তব্য দেন, সেটাকেই খুতবা বলা হয়।
খুতবা মানে হলো ধর্মীয় ভাষণ বা বয়ান। এটি শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে ঈদের নামাজের পর মুসল্লিদের উদ্দেশে খুতবা দিতেন।
সহিহ বুখারিতে আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে — রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতরের দিন নামাজ আদায় করতেন এবং সালাত শেষে খুতবা দিতেন।
ঈদুল ফিতরের খুতবা — নামাজের আগে না পরে?
এটি নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি আছে। সঠিক উত্তর হলো:
ঈদের খুতবা সবসময় নামাজের পরে দেওয়া হয়।
জুমার নামাজে খুতবা আগে দেওয়া হয়, কিন্তু ঈদের খুতবা নামাজের পরে। এটি হলো ঈদের খুতবার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
ইবনে আব্বাস (রা.) ও ইবনে উমর (রা.) উভয়েই বলেছেন — আল্লাহর রাসুল (সা.), হযরত আবু বকর, উমর ও উসমান (রা.) উভয় ঈদের নামাজ খুতবার আগে পড়তেন।
চার মাযহাবের — হানাফি, মালিকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি — ঐকমত্যে উভয় ঈদে খুতবা দেওয়ার নির্ধারিত সময় হলো নামাজের পরবর্তী সময়।
ঈদের খুতবা কি শোনা ওয়াজিব?
হ্যাঁ, ঈদের খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা ওয়াজিব। ইবনে মাজাহ শরিফের হাদিস নং ১২৯৩-এ এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন — “আমরা নামাজ শেষ করেছি। যার ইচ্ছা সে খুতবা শোনার জন্য বসবে, আর যে চলে যেতে চায়, সে চলে যাবে।”
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, ঈদের খুতবা শোনা নামাজের মতো বাধ্যতামূলক ফরজ নয়, তবে আলেমগণের মতে মনোযোগ দিয়ে বসে শোনা মুস্তাহাব ও ওয়াজিবের কাছাকাছি।
ঈদুল ফিতরের খুতবা পড়ার সঠিক নিয়ম
ধাপ ১ — প্রথম খুতবা
প্রথম খুতবার শুরুতে ইমাম নয়টি তাকবির (আল্লাহু আকবার) পাঠ করেন। এরপর নিচের বিষয়গুলো উল্লেখ করেন:
- হামদ — আল্লাহর প্রশংসা দিয়ে শুরু করা
- সানাখানি — আল্লাহর গুণগান করা
- শাহাদাতাইন — তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য দেওয়া
- দরুদ শরিফ — নবী (সা.)-এর উপর দরুদ পাঠ করা
- কুরআনের আয়াত — প্রাসঙ্গিক আয়াত তিলাওয়াত করা
- ওয়াজ-নসিহত — মুসলমানদের জন্য উপদেশমূলক বক্তব্য
- মাসআলা বর্ণনা — ঈদ সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় মাসআলা বলা
ধাপ ২ — দুই খুতবার মাঝখানে বিরতি
প্রথম খুতবা শেষে ইমাম সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য বসবেন। এই বিরতিটি জুমার খুতবার মতোই।
ধাপ ৩ — দ্বিতীয় খুতবা
দ্বিতীয় খুতবার শুরুতে ইমাম সাতটি তাকবির পাঠ করেন। এরপর:
- মুসলমানদের জন্য দোয়া করা
- ফিতরা (সদকাতুল ফিতর) সম্পর্কে আলোচনা করা
- সামাজিক দায়িত্ব ও ঈদের তাৎপর্য নিয়ে কথা বলা
- মুসল্লিদের জন্য দোয়া ও আমিন বলা
মুসল্লিদের জন্য খুতবার সময় করণীয়
খুতবা চলাকালীন মুসল্লিদের যা করতে হবে:
- চুপ থেকে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা
- কথাবার্তা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা
- মোবাইল ফোন নীরব মোডে রাখা
- খুতবা শেষে ইমামের দোয়ায় ‘আমিন’ বলা
- নামাজের কাতারে শৃঙ্খলা বজায় রাখা
যা করা যাবে না:
- খুতবার সময় কথা বলা বা আলোচনা করা
- নামাজ পড়া (যদিও কেউ দেরিতে আসে)
- অমনোযোগীভাবে বসে থাকা
ইমামের জন্য ঈদের খুতবায় কী কী বলা সুন্নত?
ইমাম সাহেব খুতবায় যা উল্লেখ করবেন তা নিম্নরূপ:
- আল্লাহর প্রশংসা ও তাঁর গুণাবলি বর্ণনা
- নবী করিম (সা.)-এর উপর দরুদ
- কুরআন ও হাদিসের আলোকে উপদেশ
- ঈদুল ফিতরের তাৎপর্য ও গুরুত্ব
- সদকাতুল ফিতর (ফিতরা) আদায়ের বিষয়ে নির্দেশনা
- পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে আলোচনা
- সমাজের দুঃখী ও অভাবী মানুষদের কথা স্মরণ করানো
- মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করা
ঈদুল ফিতরের খুতবা ও জুমার খুতবার পার্থক্য
| বিষয় | ঈদের খুতবা | জুমার খুতবা |
|---|---|---|
| কখন দেওয়া হয় | নামাজের পরে | নামাজের আগে |
| তাকবির সংখ্যা | প্রথমে ৯টি, দ্বিতীয়তে ৭টি | নির্দিষ্ট নেই |
| শোনা | ওয়াজিব (মতভেদ আছে) | ওয়াজিব |
| বিধান | সুন্নত | ফরজ (জুমার নামাজের অংশ) |
| দুটি খুতবা | হ্যাঁ | হ্যাঁ |
ঈদুল ফিতরের নামাজ ও খুতবার সম্পূর্ণ ক্রমপরিচয়
ঈদুল ফিতরের দিনে যে ক্রমে নামাজ ও খুতবা হয়:
১. ঈদগাহে জমায়েত হওয়া ও কাতার সোজা করা
২. ইমামের পিছনে নিয়ত করা
৩. তাকবিরে তাহরিমা দিয়ে নামাজ শুরু করা
৪. প্রথম রাকাতে অতিরিক্ত তিনটি তাকবির দেওয়া
৫. সুরা ফাতেহা ও অন্য সুরা পড়ে রুকু-সিজদা করা
৬. দ্বিতীয় রাকাতে সুরার পর অতিরিক্ত তিনটি তাকবির দেওয়া
৭. নামাজ শেষ করে সালাম ফেরানো
৮. তাকবির পাঠ করা — “আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু…”
৯. ইমাম কর্তৃক প্রথম খুতবা (৯ তাকবির দিয়ে শুরু)
১০. সংক্ষিপ্ত বিরতি
১১. দ্বিতীয় খুতবা (৭ তাকবির দিয়ে শুরু)
১২. দোয়া ও মোনাজাত
১৩. পরস্পরে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঈদের খুতবার বিশেষ বিষয়
বাংলাদেশে ঈদের খুতবা সাধারণত আরবিতে শুরু হয় এবং পরে বাংলায় বয়ান করা হয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ প্রতি বছর ঈদের খুতবার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে মসজিদগুলোতে পাঠায়।
২০২৬ সালে বাংলাদেশে ঈদুল ফিতরের খুতবায় সাধারণত যে বিষয়গুলো থাকে:
- রমজানের শিক্ষা ও আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব
- সামাজিক সহমর্মিতা ও গরিব-দুঃখীদের পাশে দাঁড়ানো
- পারিবারিক বন্ধন মজবুত করা
- দেশ ও জাতির কল্যাণে দোয়া করা
- সদকাতুল ফিতর (ফিতরা) সঠিকভাবে আদায় করার নির্দেশনা
ঈদের খুতবা সম্পর্কে সাধারণ ভুল ধারণা
ভুল ধারণা ১: খুতবা শুধু আরবিতে দিতে হবে।
সঠিক তথ্য: ইমাম আরবিতে খুতবার মূল অংশ পাঠ করার পর স্থানীয় ভাষায় বুঝিয়ে বলতে পারেন। বাংলাদেশে এটি প্রচলিত।
ভুল ধারণা ২: খুতবা না শুনলে নামাজ হবে না।
সঠিক তথ্য: খুতবা না শুনলে নামাজ আদায় হয়ে যাবে, তবে খুতবা না শোনার কারণে ওয়াজিব ছেড়ে দেওয়ার গুনাহ হবে।
ভুল ধারণা ৩: মহিলারা ঈদের খুতবায় অংশ নিতে পারবেন না।
সঠিক তথ্য: মহিলারা পর্দার মধ্যে থেকে ঈদগাহে উপস্থিত হয়ে খুতবা শুনতে পারবেন। হাদিসে মহিলাদের ঈদের নামাজ ও খুতবায় অংশগ্রহণের বিষয়টি সমর্থিত।
ভুল ধারণা ৪: একা ঘরে ঈদের খুতবা দেওয়া যাবে।
সঠিক তথ্য: ঈদের নামাজ একা পড়া এবং খুতবা দেওয়া শরিয়তসম্মত নয়। জামাত অপরিহার্য।
মানুষ যা জিজ্ঞেস করেন
ঈদের খুতবা কয়টি এবং কীভাবে দিতে হয়?
ঈদের খুতবা দুটি দিতে হয়। প্রথম খুতবায় নয়টি তাকবির এবং দ্বিতীয় খুতবায় সাতটি তাকবির দিয়ে শুরু করতে হয়। দুই খুতবার মাঝখানে সংক্ষিপ্ত বিরতি থাকে।
ঈদুল ফিতরের খুতবা নামাজের আগে না পরে?
ঈদুল ফিতরের খুতবা সবসময় নামাজের পরে দেওয়া হয়। এটি জুমার খুতবার বিপরীত, যেখানে খুতবা নামাজের আগে দেওয়া হয়।
ঈদের খুতবা শোনা কি বাধ্যতামূলক?
বেশিরভাগ আলেমের মতে ঈদের খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা ওয়াজিব বা মুস্তাহাব। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস থেকে জানা যায়, খুতবা শোনা বাধ্যতামূলক ফরজ নয় তবে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।
ঈদের নামাজ ছাড়া কি শুধু খুতবা দেওয়া যাবে?
না। খুতবা ঈদের নামাজের সাথে সম্পর্কিত। নামাজ ছাড়া শুধু খুতবা দেওয়ার কোনো বিধান নেই।
মহিলারা কি ঈদের খুতবা শুনতে পারবেন?
হ্যাঁ। মহিলারা পর্দার মধ্যে থেকে ঈদগাহে গিয়ে নামাজ ও খুতবায় অংশ নিতে পারবেন। এমনকি হায়েযগ্রস্ত মহিলাও খুতবার জায়গায় বসে থাকতে পারবেন।
ঈদের খুতবায় তাকবির কতটি?
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী প্রথম খুতবার শুরুতে ৯টি এবং দ্বিতীয় খুতবার শুরুতে ৭টি তাকবির পাঠ করা হয়।
ঈদের খুতবা বাংলায় দেওয়া যাবে কি?
ইমাম আরবিতে মূল অংশ পাঠ করার পর স্থানীয় ভাষায় বক্তব্য দিতে পারেন। বাংলাদেশে এই পদ্ধতিই সাধারণত অনুসরণ করা হয়।
কেউ যদি ঈদের নামাজ মিস করে, শুধু খুতবায় যোগ দিতে পারবে?
না। যে ব্যক্তি জামাত পায়নি, সে আলাদাভাবে ঈদের নামাজ আদায় করতে পারবে না এবং শুধু খুতবায় অংশ নেওয়ার কোনো বিধান নেই।
ঈদুল ফিতরের নামাজের পর কী পড়তে হয়?
ঈদের নামাজের সালাম ফেরানোর পর তাকবির পাঠ করতে হয়: “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।” এরপর ইমামের খুতবা শুনতে বসতে হবে।
ঈদের খুতবায় কী কী বিষয় আলোচনা হয়?
ঈদের খুতবায় সাধারণত আল্লাহর প্রশংসা, নবী (সা.)-এর উপর দরুদ, রমজানের শিক্ষা, সদকাতুল ফিতর, সমাজের প্রতি দায়িত্ব, পারিবারিক বন্ধন এবং মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করা হয়।
ঈদের নামাজে কতটি তাকবির থাকে?
ঈদের নামাজে মোট ছয়টি অতিরিক্ত তাকবির থাকে — প্রথম রাকাতে তিনটি এবং দ্বিতীয় রাকাতে তিনটি। এর বাইরে রুকুর তাকবির ও অন্যান্য স্বাভাবিক তাকবির যুক্ত হয়।
সদকাতুল ফিতর কখন দিতে হয়?
ঈদুল ফিতরের নামাজে যাওয়ার আগেই ফিতরা (সদকাতুল ফিতর) আদায় করা উচিত। তবে রমজানের শেষে বা ঈদের নামাজের আগে যেকোনো সময় দেওয়া যায়।
বিশ্বস্ত সূত্র
এই আর্টিকেলের তথ্য নিচের বিশ্বস্ত উৎস থেকে যাচাই করা হয়েছে:
- সহিহ বুখারি (ইসলামিক ফাউন্ডেশন অনুবাদ) — কিতাবুল ঈদাইন
- ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ১২৯৩
- ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের প্রকাশনা
- ইসলামিক হাউস ডট কম — “ঈদুল ফিতর ও যাকাতুল ফিতরের সংক্ষিপ্ত বিধি বিধান”
- আদ-দুররুল মুখতার (হানাফি ফিকহ গ্রন্থ)
- প্রথম আলো ধর্ম বিভাগ
বিঃদ্রঃ ইসলামি মাসআলায় নির্ভরযোগ্য মুফতি বা আলেমের পরামর্শ নেওয়া সর্বোত্তম। এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”


