ইসলাম পালনের ক্ষেত্রে বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো মাযহাব (Madhab) কি? এটি কি কেবল কোনো নির্দিষ্ট ইমামের অন্ধ অনুকরণ, নাকি কোরআন ও সুন্নাহ মানারই একটি সুশৃঙ্খল পদ্ধতি? অনেকেই মাযহাব মানাকে দলের বিভক্তি মনে করেন।
আজকের আর্টিকেলে আমরা ড. শাদী আল-মাসরীর (Dr. Shadee Elmasry) আলোচনার প্রেক্ষিতে মাযহাব, বিদআত, আকিদা এবং সুফিবাদ নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর সঠিক ও যৌক্তিক সমাধান জানবো।
মাযহাব আসলে কী?
অনেকে ভুলবশত মনে করেন, মাযহাব মানে হলো কোনো একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির ব্যক্তিগত মতামতকে ধর্মের ওপর প্রাধান্য দেওয়া। কিন্তু বিষয়টি মোটেও তেমন নয়।
মাযহাব হলো কোরআন ও সুন্নাহ বোঝার একটি পদ্ধতি বা মেথডলজি। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) এমন অনেক কথা বলেছেন যা বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এই ব্যাখ্যার ভিন্নতার কারণেই মাযহাবের উৎপত্তি।
একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ
রাসূল (সা.)-এর জীবদ্দশাতেই সাহাবীদের মধ্যে মতভেদ ছিল। খন্দকের যুদ্ধের পর নবীজি (সা.) ঘোষণা দিলেন:
“বনু কুরাইজা গোত্রে না পৌঁছানো পর্যন্ত কেউ আসরের নামাজ পড়বে না।”
এর ফলে সাহাবীরা দুই দলে ভাগ হয়ে গেলেন:
-
প্রথম দল: তারা নবীজির কথা আক্ষরিক অর্থে নিলেন এবং সূর্যাস্ত হয়ে যাওয়ার পরেও বনু কুরাইজায় পৌঁছে নামাজ পড়লেন।
-
দ্বিতীয় দল: তারা বুঝলেন নবীজি মূলত ‘তাড়াতাড়ি যাওয়া’ বুঝিয়েছেন, নামাজ কাজা করতে বলেননি। তাই তারা পথেই নামাজ পড়ে নিলেন।
মজার বিষয় হলো, নবীজি (সা.) কাউকেই ভুল বলেননি। এই ঘটনা প্রমাণ করে, একই নির্দেশনার একাধিক ব্যাখ্যা বা ইজতিহাদ হতে পারে এবং উভয়ই সঠিক হতে পারে। এটিই মাযহাবের মূল ভিত্তি।
মাযহাব কেন প্রয়োজন?
মাযহাব আমাদের জীবনকে কঠিন করতে আসেনি, বরং সহজ (Ease) করতে এসেছে। ইসলামে ফিকহ বা মাযহাবের প্রয়োজনীয়তা মূলত দুটি কারণে:
১. কোরআন-সুন্নাহর সঠিক ব্যাখ্যা: সাধারণ মানুষের পক্ষে আরবি ব্যাকরণ ও গভীর জ্ঞান ছাড়া কোরআন-হাদিস থেকে সরাসরি বিধান বের করা সম্ভব নয়। মুজতাহিদ ইমামরা (যেমন ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক) সেই কঠিন কাজটি আমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন।
২. নমনীয়তা বা ফ্লেক্সিবিলিটি: মানুষের জীবনযাত্রা ও পরিস্থিতি ভিন্ন হয়। মাযহাবের ভিন্নতা আমাদের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে দ্বীন পালনে সুবিধা দেয়।
ড. শাদী আল-মাসরীর মতে, “মাযহাব হলো ক্রিস্টালের মতো, যেখানে ইসলামের আলো প্রবেশ করে বিভিন্ন সুন্দর রঙে ছড়িয়ে পড়ে। এটি উম্মাহর জন্য রহমত, বিভক্তি নয়।”
বিদআত নিয়ে বিভ্রান্তি
বর্তমানে ‘বিদআত’ (Innovation) শব্দটি নিয়ে সমাজে চরম বিভ্রান্তি রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, ইসলামের যুগে ছিল না এমন যা কিছু এখন করা হয়, সবই বিদআত এবং হারাম।
কিন্তু ইসলামী ফিকহ শাস্ত্রের পণ্ডিতরা, যেমন ইমাম ইজ্জ বিন আব্দুস সালাম ও ইমাম আল-কারাফি বিদআতকে ৫টি ভাগে ভাগ করেছেন:
-
ওয়াজিব বিদআত: যেমন কোরআন সংকলন করা বা হাদিস শাস্ত্রের বিন্যাস। নবীজির যুগে এটি ছিল না, কিন্তু দ্বীন রক্ষার জন্য এটি এখন আবশ্যক।
-
মুস্তাহাব বিদআত: ভালো কাজের নতুন পদ্ধতি, যেমন মাদরাসা তৈরি করা।
-
হারাম বিদআত: যা কোরআন-সুন্নাহর মূলনীতির বিরোধী।
সুতরাং, ঢালাওভাবে সব নতুন কিছুকে বাতিল করা ঠিক নয়। দেখতে হবে সেটি শরীয়তের মূল উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক কিনা।
আকিদা ও সুফিবাদ
ইসলামী আকিদার ক্ষেত্রে আশারি, মাতুরিদি ও আসারী (হাম্বলী) মতবাদগুলো একে অপরের শত্রু নয়। এদের সবার উদ্দেশ্য এক—কোরআন ও সুন্নাহর হেফাজত করা।
-
আসারী/হাম্বলী: এরা কেবল টেক্সট বা নস মেনে চলেন, কোনো দার্শনিক ব্যাখ্যায় যান না।
-
আশারি ও মাতুরিদি: এরা নাস্তিক ও দার্শনিকদের যুক্তির জবাব দিতে ‘কালাম শাস্ত্র’ বা যুক্তিতর্ক ব্যবহার করেন।
সুফিবাদ (Sufism) কি গ্রহণীয়?
ড. শাদী আল-মাসরীর মতে, সুফিবাদ বা ‘তাসাউফ’ হলো আত্মশুদ্ধি (Tazkiyatun Nafs)। যতক্ষণ পর্যন্ত একজন ব্যক্তি শরীয়ত ও সঠিক আকিদা মেনে চলেন এবং আত্মশুদ্ধির চর্চা করেন, ততক্ষণ এটি প্রশংসনীয়। যদি কেউ শরীয়ত ছেড়ে দেয়, তবেই তা বর্জনীয়।
বর্তমান সময়ে আমাদের করণীয়
নিজেদের মধ্যে ছোটখাটো ফিকহি মাসআলা বা মাযহাব নিয়ে ঝগড়া করা এখন শয়তানের ধোঁকা (Tahrish) ছাড়া আর কিছু নয়। বর্তমানে আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো:
-
নাস্তিকতা ও সেক্যুলারিজম।
-
পরিবারের ভাঙন ও নৈতিক অবক্ষয়।
-
ইসলামবিদ্বেষী আন্তর্জাতিক চক্রান্ত।
এখন আমাদের উচিত ‘ফরজে আইন’ হিসেবে নিজের ঈমান মজবুত করা এবং উম্মাহর ঐক্যের ওপর জোর দেওয়া।
এক নজরে সারসংক্ষেপ
| বিষয় | ব্যাখ্যা |
| মাযহাব | কোরআন-সুন্নাহ পালনের পরীক্ষিত ও বিশুদ্ধ পদ্ধতি। |
| উদ্দেশ্য | মানুষের জন্য দ্বীন পালন সহজ করা। |
| বিদআত | সব নতুনই খারাপ নয়, যদি তা শরীয়তের মূলে আঘাত না করে। |
| ঐক্য | মতভেদ থাকবেই, কিন্তু তা যেন ফাটল সৃষ্টি না করে। |
উপসংহার
মাযহাব, সুফিবাদ বা আকিদাগত মতভেদ ইসলামের সৌন্দর্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমৃদ্ধির প্রমাণ। ড. শাদী আল-মাসরীর আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, আমাদের মূল ফোকাস হওয়া উচিত আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর সন্তুষ্টি এবং উম্মাহর ঐক্য। ছোটখাটো মতভেদ নিয়ে পড়ে না থেকে আমাদের উচিত ঈমানি শক্তিতে বলীয়ান হওয়া।
