ঈদুল আযহার সময় অনেক মুসলিম পরিবারে একটি সাধারণ প্রশ্ন ওঠে — কুরবানি ও আকিকা একসাথে দেওয়া যাবে কি? যাদের ঘরে নতুন সন্তান জন্ম নিয়েছে, তারা কি কুরবানির পাশাপাশি আকিকাও দিতে পারবেন? একটি গরুর ভাগে কি কুরবানি এবং আকিকা একসাথে দেওয়া যাবে কি?
এই বিষয়ে ইসলামি ফিকহে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। অনেকেই জানতে চান, আকিকা ও কুরবানি একসাথে দেওয়া যাবে কি না। এই আর্টিকেলে আমরা চার মাযহাবের মত, দলিল, ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সঠিক বিধান সহজ ভাষায় তুলে ধরব।
✅ হানাফি মাযহাব অনুযায়ী — যা বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি অনুসরণ করা হয় — একটি গরু বা মহিষের সাত ভাগের মধ্যে এক বা একাধিক ভাগ কুরবানির জন্য এবং আলাদা ভাগ আকিকার নিয়তে দেওয়া যাবে। অর্থাৎ, গরুর ভাগে কুরবানি ও আকিকা একসাথে দেওয়া যাবে। তবে একটি ছাগল বা ভেড়া দিয়ে একই সাথে কুরবানি ও আকিকা — উভয় উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে না। হানাফি ফিকহে দুটি ইবাদত আলাদা নিয়তে আলাদা ভাগে ভাগ করে আদায় করা যায়।
কুরবানি কী এবং কার উপর ওয়াজিব?
কুরবানি (আরবি: أضحية — উদহিয়্যাহ) হলো ঈদুল আযহার সময় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নির্দিষ্ট পশু জবাই করার ইবাদত। এটি হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নত এবং মুসলিম উম্মতের জন্য প্রতি বছর পালনীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল।
কুরবানি কার উপর ওয়াজিব?
- প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মুসলিম।
- নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক (সোনা ৮৫ গ্রাম বা রূপা ৫৯৫ গ্রাম বা সমতুল্য অর্থ)।
- মুকিম (সফরে না থাকলে)।
- ঈদুল আযহার ১০ থেকে ১২ জিলহজ পর্যন্ত তিন দিনের মধ্যে আদায় করতে হবে।
(হানাফি মাযহাব অনুযায়ী কুরবানি ওয়াজিব। শাফেয়ি ও হাম্বলি মাযহাবে এটি সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ।)
আকিকা কী এবং কখন দিতে হয়?
আকিকা (আরবি: عقيقة) হলো নবজাতক শিশুর জন্মের উপলক্ষে আল্লাহর শুকরিয়াস্বরূপ পশু জবাই করার সুন্নত আমল। এটি সন্তানের সুস্থতা ও নিরাপত্তার জন্য দোয়া ও ইবাদতের অংশ।
আকিকার নিয়ম:
- ছেলে সন্তানের জন্য: দুটি ছাগল/ভেড়া।
- মেয়ে সন্তানের জন্য: একটি ছাগল/ভেড়া।
- সর্বোত্তম সময়: জন্মের সপ্তম দিন।
- এরপর ১৪তম বা ২১তম দিনেও দেওয়া যায়।
- প্রথম তিন সপ্তাহ পার হলেও যেকোনো সময় দেওয়া যাবে।
আকিকা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। সামর্থ্যবান পিতার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “প্রতিটি শিশু তার আকিকার বিনিময়ে বন্ধকী। সপ্তম দিনে তার পক্ষ থেকে পশু জবাই করা হোক।” (তিরমিযি: ১৫২২, আবু দাউদ: ২৮৩৮)
কুরবানি ও আকিকা একসাথে দেওয়া যাবে কি? (মাযহাবভিত্তিক বিস্তারিত বিধান)
হানাফি মাযহাবের মত (বাংলাদেশে সর্বাধিক অনুসরণীয়):
হানাফি মতামত: গরু বা মহিষের ৭টি ভাগের মধ্যে কিছু ভাগ কুরবানির নিয়তে এবং কিছু ভাগ আকিকার নিয়তে দেওয়া জায়েজ। তবে একটি ছাগল বা ভেড়া দিয়ে একসাথে কুরবানি ও আকিকা উভয় নিয়তে আদায় করা জায়েজ নয়।
হানাফি ফিকহের বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার (ফাতাওয়া শামী) এবং বাদায়েউস সানায়েতে বলা হয়েছে:
- একটি গরু/মহিষে ৭ জন শরিক হতে পারেন।
- প্রতিটি শরিকের নিয়ত আলাদা হতে পারে: কেউ কুরবানি, কেউ আকিকা, কেউ ওয়াজিব গোশত।
- তবে শর্ত হলো — প্রতিটি ভাগের নিয়ত ‘কুরবা’ অর্থাৎ আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে হতে হবে।
- গোশত খাওয়ার একমাত্র উদ্দেশ্যে শরিক হওয়া জায়েজ নয়।
শাফেয়ি মাযহাবের মত:
অধিকাংশ শাফেয়ি আলেমের মতে, একটি পশু দিয়ে একসাথে কুরবানি ও আকিকা উভয় নিয়ত পূর্ণ হয় না। তবে কোনো কোনো শাফেয়ি আলেম একটি ভাগ দিয়ে একটি উদ্দেশ্য পূরণ হওয়ার মত দিয়েছেন।
মালেকি মাযহাবের মত:
মালেকি ফিকহে সাধারণত দুটি ইবাদত আলাদা আলাদাভাবে আদায় করার পক্ষে মত দেওয়া হয়। তবে কেউ কেউ কিছু শর্তে অনুমতি দিয়েছেন।
হাম্বলি মাযহাবের মত:
ইবনে কুদামা (রহ.)-এর ‘আল-মুগনি’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, একটি উট বা গরুতে কুরবানি ও আকিকা একসাথে নিয়ত করা যেতে পারে এবং উভয় উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে। তবে এ বিষয়ে হাম্বলি মাযহাবেও মতভেদ আছে।
আকিকা ও কুরবানি একসাথে দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি
বাংলাদেশের মুসলিমরা প্রধানত হানাফি মাযহাব অনুসরণ করেন। তাই এখানে হানাফি মতানুযায়ী বাস্তব পদ্ধতিটি ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা করা হলো:
গরু বা মহিষের ক্ষেত্রে (৭ ভাগ):
১. একটি গরু বা মহিষে ৭ জন পর্যন্ত শরিক হওয়া যায়।
২. এর মধ্যে ১টি বা ২টি ভাগ আকিকার নিয়তে দেওয়া যাবে।
৩. বাকি ভাগগুলো কুরবানির নিয়তে দেওয়া যাবে।
৪. প্রতিটি ভাগ আলাদা আলাদা নিয়তে আদায় হবে।
৫. ছেলে সন্তানের জন্য দুই ভাগ আকিকার নিয়তে দিলেই যথেষ্ট।
৬. মেয়ে সন্তানের জন্য এক ভাগ আকিকার নিয়তে দেওয়া যাবে।
ছাগল বা ভেড়ার ক্ষেত্রে:
হানাফি মতে একটি ছাগল বা ভেড়া দিয়ে একই সাথে কুরবানি ও আকিকা উভয় নিয়ত পূরণ হবে না। এক্ষেত্রে আলাদা পশু জবাই করতে হবে:
- কুরবানির জন্য আলাদা ছাগল/ভেড়া।
- আকিকার জন্য আলাদা ছাগল/ভেড়া।
💡 বাস্তব পরামর্শ: যদি আর্থিক সংকট থাকে এবং আলাদা আলাদা পশু কেনা সম্ভব না হয়, তাহলে একটি গরুর ভাগে কুরবানি এবং আকিকা উভয় নিয়ত করাই সবচেয়ে সহজ ও ফকিহ-সম্মত পথ। ছেলে সন্তানের জন্য গরুর ২ ভাগ আকিকার নিয়তে, আর বাকি ভাগগুলো কুরবানির নিয়তে দেওয়া যাবে।
কুরবানি ও আকিকার মধ্যে মূল পার্থক্য
| বিষয় | কুরবানি | আকিকা |
| উদ্দেশ্য | আল্লাহর নৈকট্য ও সওয়াব | নবজাতকের জন্য শুকরিয়া |
| সময় | ১০–১২ জিলহজ | জন্মের ৭ম/১৪তম/২১তম দিন |
| বিধান | ওয়াজিব (হানাফি) | সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ |
| পশু (ছেলে) | ১টি ছাগল বা ১/৭ গরু | ২টি ছাগল বা ২/৭ গরু |
| পশু (মেয়ে) | ১টি ছাগল বা ১/৭ গরু | ১টি ছাগল বা ১/৭ গরু |
| মাথা মুড়ানো | প্রযোজ্য নয় | সপ্তম দিনে মাথা মুড়ানো সুন্নত |
| নাম রাখা | প্রযোজ্য নয় | সপ্তম দিনে নাম রাখা সুন্নত |
আকিকার সময় কি কুরবানির দিন হওয়া জরুরি?
না। আকিকা যেকোনো সময় দেওয়া যায়। ঈদুল আযহার দিনে আকিকা দেওয়া জরুরি নয়। তবে যদি কেউ ঈদের দিন বা ১২ জিলহজের মধ্যে কুরবানির সাথে আকিকা দিতে চান — তাহলে গরুর ভাগে একত্রে দেওয়া যায়। অনেক আলেম মত দেন যে, আকিকার জন্য ঈদুল আযহার তারিখের কোনো বিশেষ ফজিলত নেই। বরং সপ্তম দিনে দেওয়াই সবচেয়ে উত্তম। তবে কেউ যদি ঈদের সময়ের সুবিধাজনক মওকায় আকিকা করতে চান, সেটাও জায়েজ।
দেরিতে আকিকা দেওয়া যাবে কি?
হ্যাঁ, যদি কেউ সপ্তম দিনে বা ১৪ বা ২১তম দিনে আকিকা দিতে না পারেন, তাহলে পরবর্তীতে যেকোনো সময় আকিকা আদায় করা যাবে। এমনকি সন্তানের বয়স বড় হয়ে গেলেও আকিকা আদায় করা জায়েজ।
📌 গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: কোনো কারণে আকিকা দেওয়া না হলে, পরবর্তী যেকোনো সময়ে দেওয়া যাবে। পিতা মারা গেলে, বালেগ হওয়ার পরেও নিজে নিজের আকিকা দেওয়া যায় বলে কেউ কেউ মত দিয়েছেন, তবে এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন: কুরবানি ও আকিকা একসাথে দেওয়া যাবে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, একটি গরু বা মহিষের ভাগে কুরবানি ও আকিকা একসাথে দেওয়া যাবে। তবে একটি ছাগল দিয়ে একই নিয়তে উভয় ইবাদত আদায় করা জায়েজ নয়।
প্রশ্ন: কুরবানি এবং আকিকা একসাথে দেওয়া যাবে কি (একই পশুতে)?
উত্তর: গরুর ৭ ভাগের মধ্যে আলাদা আলাদা নিয়তে কুরবানি ও আকিকার ভাগ দেওয়া সম্পূর্ণ জায়েজ এবং উভয় ইবাদত আদায় হবে।
প্রশ্ন: আকিকা কি শুধু ঈদুল আযহার দিনে দিতে হয়?
উত্তর: না। আকিকার জন্য ঈদুল আযহার দিন নির্ধারিত নয়। সর্বোত্তম হলো জন্মের সপ্তম দিন। তবে যেকোনো সময় আকিকা দেওয়া যায়।
প্রশ্ন: ছেলে সন্তানের জন্য কুরবানির গরুতে কতটি ভাগ আকিকার নিয়তে দিতে হবে?
উত্তর: ছেলে সন্তানের জন্য ২টি ভাগ আকিকার নিয়তে দিতে হবে। মেয়ে সন্তানের জন্য ১টি ভাগ যথেষ্ট।
প্রশ্ন: একটি ছাগল দিয়ে কি আকিকা ও কুরবানি একসাথে দেওয়া যাবে কি?
উত্তর: হানাফি মাযহাব অনুযায়ী না। একটি ছাগল বা ভেড়া দিয়ে একই সাথে কুরবানি ও আকিকা উভয় নিয়ত পূর্ণ হবে না। আলাদা আলাদা পশু প্রয়োজন।
প্রশ্ন: আকিকার গোশত কে কে খেতে পারবেন?
উত্তর: আকিকার গোশত পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও গরিবদের মধ্যে বিতরণ করা যায়। আকিকার গোশত রান্না করে বা কাঁচা দেওয়া দুটোই জায়েজ।
প্রশ্ন: কুরবানির সময় পার হয়ে গেলে কি আকিকা করা যাবে?
উত্তর: হ্যাঁ। আকিকা কুরবানির সময়ের সাথে সম্পর্কিত নয়। কুরবানির সময় শেষ হলেও আকিকা যেকোনো সময় দেওয়া যাবে।
কুরবানি ও আকিকা একসাথে দেওয়ার ব্যাপারে আলেমদের ফতওয়া
বাংলাদেশের বিভিন্ন ইসলামিক প্রতিষ্ঠান ও আলেমগণ এই বিষয়ে স্পষ্ট মত দিয়েছেন:
- বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন: গরু বা মহিষের ভাগে কুরবানি ও আকিকা আলাদা নিয়তে দেওয়া জায়েজ।
- দারুল উলুম দেওবন্দ: একটি গরুর ভাগে কুরবানি ও আকিকা উভয় নিয়তে দেওয়া জায়েজ এবং উভয় আদায় হবে।
- ফাতাওয়া শামী (ইবনে আবেদিন রহ.): “গরু বা উটে কুরবানি ও আকিকার নিয়ত একসাথে করা জায়েজ।”
কুরবানি ও আকিকা একসাথে দেওয়ার মূল বিষয়গুলো
- গরু বা মহিষের ভাগে কুরবানি ও আকিকা একসাথে দেওয়া হানাফি মতে জায়েজ।
- ছাগল বা ভেড়া দিয়ে একই সাথে উভয় ইবাদত আদায় করা যাবে না।
- ছেলের আকিকার জন্য গরুর ২ ভাগ, মেয়ের জন্য ১ ভাগ।
- আকিকা ঈদের দিনেই দিতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
- দেরিতে আকিকা দেওয়া জায়েজ।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া শামী / রদ্দুল মুহতার — ইবনে আবেদিন (রহ.), ৫ম খণ্ড
- বাদায়েউস সানায়ে — আল্লামা কাসানি (রহ.), ৫ম খণ্ড
- আল-মুগনি — ইমাম ইবনে কুদামা (রহ.), ৯ম খণ্ড
- তুহফাতুল মাওদুদ — ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.)
- সুনানে তিরমিযি, হাদিস: ১৫২২ ও সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৮৩৮
- আল-মাউসুআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুওয়াইতিয়্যাহ, ৩০তম খণ্ড
- বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন — ফতোয়া বিভাগ
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”

