জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের আমল ও ফজিলত

জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের আমল ও ফজিলত

জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের আমল কী?

জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন (প্রথম দশক) ইসলামে ইবাদতের জন্য বছরের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সময়। এই দশ দিনের প্রধান আমলগুলোর মধ্যে রয়েছে: ফরজ ও নফল ইবাদত বাড়ানো, সব ধরনের গুনাহ থেকে বিরত থাকা, বেশি বেশি জিকির ও তাকবীর (আল্লাহু আকবার, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) পাঠ করা, সামর্থ্যবানদের জন্য হজ ও কোরবানি করা, কোরবানির নিয়তকারীদের জন্য চুল-নখ কাটা থেকে বিরত থাকা, ৯ থেকে ১৩ জিলহজ পর্যন্ত তাকবীরে তাশরীফ পাঠ করা, ৯ জিলহজ আরাফার রোজা রাখা এবং ঈদের দিনের সুন্নাহগুলো যথাযথভাবে পালন করা।

জিলহজ মাসের প্রথম দশকের গুরুত্ব ও ফজিলত

রমজান মাসের পর মুসলমানদের জন্য ইবাদতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ মৌসুম হলো জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন। অথচ আমাদের সমাজে এই দিনগুলোর ইবাদত সম্পর্কে সচেতনতার অভাব রয়েছে। আমরা সাধারণত পশুর হাট বা গরু-ছাগলের আনাগোনা দেখে জিলহজ মাসের আগমন টের পাই, কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম (রা.) এই দিনগুলোতে ইবাদতে মগ্ন থাকতেন।

হাদিস শরিফে নবী করিম (সা.) বলেছেন, জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের নেক আমল আল্লাহর কাছে এত বেশি প্রিয় যে, অন্য কোনো সময়ের আমল এর সমকক্ষ হতে পারে না। এমনকি অন্য সময়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেও এই দশকের নেক আমলের সমান সওয়াব অর্জন করা কঠিন, যদি না কেউ জিহাদে গিয়ে নিজের জান-মাল সবকিছু কোরবান করে দেন।

জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের করণীয় ১০টি আমল

কোরআন ও হাদিসের আলোকে এই দশকে একজন মুমিনের জন্য সুনির্দিষ্ট ১০টি আমল রয়েছে:

১. বেশি বেশি নেক আমল করা

এই দশকের যেকোনো ভালো কাজ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। তাই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা, তাহাজ্জুদসহ নফল নামাজ পড়া, বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত এবং দান-সদকা করার মাধ্যমে সময় পার করা উচিত।

২. সব ধরনের গুনাহ থেকে বিরত থাকা

গুনাহের কাজ সারা বছরই হারাম, তবে সম্মানিত মাসগুলোতে (যার মধ্যে জিলহজ অন্যতম) গুনাহ করা আরও বেশি ভয়াবহ। যে সময়ে নেক আমল আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়, সে সময়ে বদ আমল করা চরম ধৃষ্টতা। তাই মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়া বা বাস্তব জীবনে সব ধরনের হারাম কাজ ও কথা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে।

৩. বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করা

সূরা হজের ২৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা এই নির্দিষ্ট দিনগুলোতে বেশি বেশি জিকির করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই উঠতে, বসতে, চলতে-ফিরতে মুখে ও অন্তরে আল্লাহর জিকির জারি রাখতে হবে।

৪. হজ পালন করা

যাদের শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে, তাদের জন্য এই দশকে হজ পালন করা অন্যতম প্রধান ইবাদত। জিলহজের ৮ তারিখ থেকে হজের মূল কার্যক্রম শুরু হয়।

৫. কোরবানি করা

যাদের কোরবানি করার সামর্থ্য আছে, তাদের অবশ্যই কোরবানি করতে হবে। নবী করিম (সা.) সতর্ক করেছেন, সামর্থ্য থাকার পরও যে ব্যক্তি কোরবানি করে না, সে যেন মুসলমানদের ঈদগাহের কাছেও না আসে।

৬. চুল, নখ ও অবাঞ্ছিত পশম না কাটা

যারা কোরবানি করার নিয়ত করেছেন, জিলহজ মাসের চাঁদ ওঠার পর থেকে কোরবানির পশু জবাই করা পর্যন্ত তাদের মাথার চুল, হাত-পায়ের নখ এবং শরীরের অবাঞ্ছিত পশম কাটা থেকে বিরত থাকা সুন্নাহ। এগুলো চাঁদ ওঠার আগেই কেটে পরিষ্কার করে নেওয়া উচিত।

৭. তাকবীর, তাহমীদ ও তাহলীল পাঠ করা

এই দশকের অন্যতম প্রধান আমল হলো বেশি বেশি তাকবীর পাঠ করা। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) এই দশকে বাজারে গিয়ে উচ্চস্বরে তাকবীর পাঠ করতেন, যেন অন্যদেরও স্মরণ হয়। আমাদেরও উচিত হাটে-বাজারে, ঘরে-বাইরে মৃদুস্বরে বা যেখানে যেমন প্রয়োজন এই তাকবীরটি পাঠ করা:

“আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।”

৮. আইয়ামে তাশরীকে তাকবীরে মুকাইয়াদ পাঠ করা

জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ফজর থেকে শুরু করে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর একবার করে তাকবীর পাঠ করা নারী-পুরুষ সবার ওপর ওয়াজিব বা আবশ্যক।

৯. আরাফার দিন (৯ জিলহজ) রোজা রাখা

যারা হজে যাননি, তাদের জন্য ৯ জিলহজ রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। নবীজি (সা.) বলেছেন, এই একদিনের রোজার বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা বান্দার আগের এক বছর এবং পরের এক বছরের (মোট দুই বছরের) সগিরা গুনাহ মাফ করে দেন।

১০. ঈদের দিনের সুন্নাহ পালন করা

১০ জিলহজ ঈদুল আজহার দিন ঈদের নামাজ আদায় করা এবং ঈদের দিনের যাবতীয় সুন্নাহ (যেমন: গোসল করা, ভালো পোশাক পরা, ঈদগাহে যাওয়া ইত্যাদি) যথাযথভাবে পালন করা।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয় ও সামাজিক দায়িত্ব

আমাদের দেশে কোরবানির পশুর হাট ঘিরে বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো দিক। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক পশুর হাটে মাইকে উচ্চস্বরে গান-বাজনা বাজানো হয়। কোরবানি একটি পবিত্র ইবাদত, আর এই ইবাদতকে কেন্দ্র করে হারাম মিউজিক বা গান-বাজনা চালানো অত্যন্ত গর্হিত কাজ।

  • দাওয়াত দেওয়া: পশুর হাটের ইজারাদার বা দায়িত্বশীলদের কাছে গিয়ে নম্রভাবে, যুক্তির সাথে দাওয়াত দিতে হবে যেন তারা গান-বাজনার বদলে তাকবীরের ধ্বনি প্রচার করেন।
  • সচেতনতা বৃদ্ধি: হাটে-বাজারে, চায়ের দোকানে বা গণপরিবহনে আমরা নিজেরা যদি মৃদুস্বরে তাকবীর পাঠ করি, তবে আশেপাশের মানুষেরও আমলটির কথা স্মরণ হবে। হারিয়ে যাওয়া এই সুন্নাহকে পুনরুজ্জীবিত করার মর্যাদা আল্লাহর কাছে অনেক বেশি।

সাধারণ সময়ের আমল বনাম জিলহজের প্রথম দশকের আমল

আমলের ধরনসাধারণ সময়েজিলহজের প্রথম দশকে
নফল ইবাদতসওয়াব পাওয়া যায়আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়
গুনাহ থেকে বেঁচে থাকাসর্বদাই ফরজএই সময়ে গুনাহ করা বিশেষভাবে জঘন্য
তাকবীর পাঠসাধারণ জিকিরবিশেষভাবে নির্দেশিত এবং সুন্নত
আরাফার রোজাসাধারণ নফল রোজা নয়এক রোজায় দুই বছরের গুনাহ মাফ হয়

সাধারন জিজ্ঞাসা

১. যারা কোরবানি করবেন না, তারা কি জিলহজ মাসে চুল-নখ কাটতে পারবেন?

যারা কোরবানি করার নিয়ত করেছেন, তাদের জন্য চাঁদ ওঠার পর থেকে পশু জবাই পর্যন্ত চুল-নখ কাটা থেকে বিরত থাকা নির্দেশিত। তবে যারা কোরবানি করবেন না, অনেক ওলামায়ে কেরামের মতে তারাও যদি এই আমলটি করেন (চুল-নখ না কাটেন) এবং কোরবানির দিন কাটেন, তবে তারাও সওয়াবের অধিকারী হবেন।

২. আরাফার রোজা বাংলাদেশে কবে রাখতে হবে?

আরাফার রোজা মূলত জিলহজ মাসের ৯ তারিখে রাখতে হয়। নিজ নিজ দেশের চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৯ জিলহজ তারিখে এই রোজা রাখা উত্তম।

৩. তাকবীরে তাশরীফ কখন থেকে কখন পড়তে হয় এবং কাদের ওপর ওয়াজিব?

জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ফজরের নামাজের পর থেকে ১৩ তারিখ আসরের নামাজ পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর তাকবীরে তাশরীফ পড়া ওয়াজিব। এটি নামাজ আদায়কারী নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। পুরুষরা মাঝারি শব্দে এবং নারীরা অনুচ্চ শব্দে (যাতে নিজে শুনতে পান) এটি পাঠ করবেন।

৪. পশুর হাটে গান-বাজনার বদলে তাকবীর প্রচার কেন জরুরি?

কোরবানি একটি ধর্মীয় ইবাদত। এই ইবাদত পালনের উদ্দেশ্যে মানুষ হাটে যান। সেখানে হারাম গান-বাজনা বাদ্যযন্ত্র বাজালে মানুষ গুনাহগার হন। এর বদলে তাকবীর প্রচার করলে পরিবেশ পবিত্র থাকে এবং জিলহজের সুন্নাহ আদায় হয়।

আপনার এবং আপনার পরিবারের জন্য জিলহজ মাসের এই পবিত্র দিনগুলো ইবাদত ও রহমতে পরিপূর্ণ হোক। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক আমল করার তৌফিক দান করুন।

Leave a Comment

Scroll to Top