বর্তমান বিশ্বে সামরিক শক্তির সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হয় দূরপাল্লার বিধ্বংসী সব ক্ষেপণাস্ত্রকে। সম্প্রতি মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৪,০০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মার্কিন-ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের মিসাইল হামলার পর বিশ্বজুড়ে নতুন করে একটি নাম আলোচনায় এসেছে— আইসিবিএম (ICBM) বা আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইল।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সমর বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরান হয়তো খুব শিগগিরই এই ভয়ংকর আইসিবিএম ক্লাবে যুক্ত হতে যাচ্ছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন— আইসিবিএম আসলে কী? এটি কতটা বিধ্বংসী হতে পারে এবং বিশ্বের কোন কোন দেশের কাছে এই অস্ত্র রয়েছে? চলুন, সহজ ভাষায় এবং বিস্তারিতভাবে এই বিষয়গুলো জেনে নেওয়া যাক।
আইসিবিএম (ICBM) কী এবং এটি কতটা শক্তিশালী?
আইসিবিএম (ICBM) বা ‘ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল’ হলো এমন এক ধরনের দূরপাল্লার বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, যা এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। এই অস্ত্রের সর্বনিম্ন পাল্লা বা রেঞ্জ হলো ৫,৫০০ কিলোমিটার। এটি নিক্ষেপের পর শুরুতে শব্দের চেয়ে ২০ গুণেরও বেশি গতিতে উপরে উঠে যায় এবং পারমাণবিক বোমা বহন করে মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের বড় শহর সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে সক্ষম। এর হামলা ঠেকানো বর্তমান প্রযুক্তিতে প্রায় অসম্ভব।
বিশ্বের কোন কোন দেশের কাছে আইসিবিএম বা আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইল আছে?
বর্তমানে বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি দেশের সমর ভাণ্ডারে এই ভয়ংকর অস্ত্র রয়েছে। কোন দেশের কাছে কী ধরনের আইসিবিএম রয়েছে, তার একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
- যুক্তরাষ্ট্র (USA): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে রয়েছে ‘মিনিটম্যান থ্রি (Minuteman III)’ আইসিবিএম। এর পাল্লা সর্বোচ্চ ১৩,০০০ কিলোমিটার।
- রাশিয়া (Russia): যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাল্লা দিয়ে রাশিয়া তাদের বিশাল আইসিবিএম ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে। তাদের ‘আরএস (RS)’ সিরিজের একাধিক মিসাইল রয়েছে, যেগুলোর সর্বোচ্চ পাল্লা ১১,০০০ কিলোমিটার।
- চীন (China): চীনের কাছে রয়েছে ১৩,০০০ কিলোমিটার রেঞ্জের ‘ডিএফ (DF)’ সিরিজের শক্তিশালী মিসাইল।
- উত্তর কোরিয়া (North Korea): পরিসংখ্যানে চমকে দেওয়ার মতো বিষয় হলো, উত্তর কোরিয়া সর্বোচ্চ ১৫,০০০ কিলোমিটার রেঞ্জের ‘তাইপোডং (Taepodong)’ সিরিজের আইসিবিএম বানিয়েছে, যা বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ পাল্লার মিসাইল।
- যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স: মার্কিন মিত্র দেশ যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের কাছে সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য আইসিবিএম রয়েছে।
- ভারত ও পাকিস্তান: এই দুই প্রতিবেশী দেশের কাছেও পরীক্ষামূলক বা উন্নয়নশীল কিছু দূরপাল্লার আইসিবিএম মিসাইল রয়েছে।
ইরানের বর্তমান অবস্থান ও বৈশ্বিক শঙ্কা
সম্প্রতি ইরান প্রায় ৪,০০০ কিলোমিটার দূরে সফলভাবে মিসাইল হামলা চালিয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, ইরান অচিরেই ৫,৫০০ কিলোমিটারের বেশি পাল্লার আইসিবিএম তৈরিতে সক্ষম দেশের তালিকায় নাম লেখাতে চলেছে। যা মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বের ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।
একটি আইসিবিএম কেন এত ভয়ংকর ও ধ্বংসাত্মক?
সমরাস্ত্র বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র হলো এই আইসিবিএম। এর ভয়াবহতার পেছনের প্রধান কয়েকটি কারণ হলো:
১. অকল্পনীয় গতি: উৎক্ষেপণের শুরুতে এটি শব্দের গতির চেয়ে ২০ গুণেরও বেশি গতিতে মহাকাশের দিকে উপরে উঠে যায় এবং এরপর টার্গেটে আঘাত হানে। এই গতির কারণে একে মাঝপথে আটকে দেওয়া বা ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব।
২. নিউক্লিয়ার ট্রায়াড (Nuclear Triad) ব্যবস্থা: যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ অনেক দেশ এই অস্ত্রকে ভূমি, আকাশ এবং জলপথ (সাবমেরিন)—এই তিন দিক থেকেই হামলার উপযোগী করে তৈরি করেছে। ফলে যেকোনো পরিস্থিতি থেকেই শত্রুপক্ষের ওপর পাল্টা পারমাণবিক হামলা চালানো সম্ভব [02:07]।
৩. পারমাণবিক বোমার বহন: আইসিবিএম সাধারণ বিস্ফোরকের পাশাপাশি পারমাণবিক বা নিউক্লিয়ার বোমা বহন করতে পারে।
৪. অল্প সময়ে ধ্বংসলীলা: পরমাণু বিস্ফোরক যুক্ত একটি আইসিবিএম মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের একটি বড় শহরকে মুহূর্তের মধ্যে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে পারে।
সাধারণ জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
আইসিবিএম (ICBM) এর পূর্ণরূপ কী?
আইসিবিএম (ICBM)-এর পূর্ণরূপ হলো ‘Intercontinental Ballistic Missile’ বা আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইল।
আইসিবিএম-এর সর্বনিম্ন রেঞ্জ বা পাল্লা কত?
একটি মিসাইলকে আইসিবিএম হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে এর পাল্লা বা রেঞ্জ কমপক্ষে ৫,৫০০ কিলোমিটার (সাড়ে ৫ হাজার কিলোমিটার) হতে হয়।
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পাল্লার আইসিবিএম কোন দেশের কাছে আছে?
তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে উত্তর কোরিয়ার কাছে থাকা ‘তাইপোডং’ সিরিজের আইসিবিএমগুলোর রেঞ্জ সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় ১৫,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম।
কোনো দেশ আইসিবিএম হামলা করলে তা কি ঠেকানো সম্ভব?
সমরাস্ত্র বিশ্লেষকদের মতে, শব্দের চেয়ে ২০ গুণ বেশি গতির কারণে একটি আধুনিক আইসিবিএম-এর হামলা মাঝপথে ঠেকানো বা ইন্টারসেপ্ট করা বর্তমান বিশ্বের রাডার ও অ্যান্টি-মিসাইল সিস্টেমগুলোর জন্য প্রায় অসম্ভব।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”

