আইয়্যামে তাশরিক কী? আমল, ফজিলত ও তাকবিরে তাশরিক পড়ার নিয়ম

আইয়্যামে তাশরিক

জিলহজ মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি মাস। এই মাসের সাথে জড়িয়ে আছে হজ ও কুরবানির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। জিলহজ মাসের বিশেষ কয়েকটি দিনকে ইসলামী পরিভাষায় ‘আইয়্যামে তাশরিক’ বলা হয়।

আইয়্যামে তাশরিক বলতে কী বোঝায়, এর আমল কী এবং তাকবিরে তাশরিক পড়ার সঠিক নিয়ম কী? আজকের এই আর্টিকেলে কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে আমরা এই বিষয়গুলো বিস্তারিত জানবো।

আইয়্যামে তাশরিক কী বা কাকে বলে?

জিলহজ মাসের ১১, ১২ ও ১৩ তারিখকে ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় ‘আইয়্যামে তাশরিক’ বলা হয়। এই দিনগুলোতে রোজা রাখা হারাম এবং বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করা সুন্নাত। তবে, তাকবিরে তাশরিক পড়ার বিধান জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ফজর থেকে শুরু হয়ে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত বলবৎ থাকে। (সহিহ মুসলিম: ১১৪১)

আইয়্যামে তাশরিক কত দিন বা কবে থেকে কবে?

আইয়্যামে তাশরিক মূলত ৩ দিন। তবে তাকবিরে তাশরিকের সময়কাল হিসাব করলে এটি ৫ দিনব্যাপী বিস্তৃত। জিলহজ মাসের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এর সময়কাল হলো:

  • তাকবিরে তাশরিকের শুরু: ৯ জিলহজ (আরাফার দিন) ফজর থেকে।
  • কুরবানির দিন / আইয়্যামে নহর: ১০ জিলহজ (ঈদুল আজহার দিন)।
  • মূল আইয়্যামে তাশরিক: ১১, ১২ এবং ১৩ জিলহজ।
  • তাকবির শেষ হওয়ার সময়: ১৩ জিলহজ আসরের নামাজ পর্যন্ত।

অর্থাৎ, জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর তাকবিরে তাশরিক পড়া ওয়াজিব।

আইয়্যামে তাশরিকে রোজা রাখার বিধান কী?

আইয়্যামে তাশরিকে রোজা রাখা সম্পূর্ণ হারাম। ইসলামে বছরে মোট ৫ দিন রোজা রাখা নিষিদ্ধ, যার মধ্যে ঈদুল ফিতর (১ শাওয়াল), ঈদুল আজহা (১০ জিলহজ) এবং আইয়্যামে তাশরিকের ৩ দিন (১১, ১২ ও ১৩ জিলহজ) অন্তর্ভুক্ত।

সহিহ বুখারি ও মুসলিম শরিফের হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আইয়্যামে তাশরিক হলো খাওয়া-দাওয়া এবং মহান আল্লাহর জিকির করার দিন।” (সহিহ মুসলিম: ১১৪১)। তাই এই দিনগুলোতে রোজা না রেখে আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে হবে।

আইয়্যামে তাশরিকের আমল ও ফজিলত

কুরবানি ও হজের সাথে আইয়্যামে তাশরিকের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এই দিনগুলোর বিশেষ আমল ও ফজিলত নিচে তুলে ধরা হলো:

  • তাকবিরে তাশরিক পাঠ: ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর একবার তাকবির পড়া ওয়াজিব।
  • কুরবানি করা: ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কুরবানি করা যায়। এই দিনগুলোকে একত্রে ‘আইয়্যামে নহর’ বা কুরবানির দিন বলা হয়।
  • মিনায় অবস্থান: হজ্জ পালনের সময় হাজিদের জন্য এই দিনগুলোতে মিনায় অবস্থান করে শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ (রমি) করা ওয়াজিব।
  • বেশি বেশি জিকির করা: এই দিনগুলোতে বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করতে হবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর তোমরা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহকে স্মরণ করো।” (সূরা বাকারা: ২০৩)

তাকবিরে তাশরিক পড়ার নিয়ম

তাকবিরে তাশরিক প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারী-পুরুষ, মুকিম-মুসাফির এবং জামাতে নামাজ আদায়কারী বা একাকী নামাজ আদায়কারী সবার ওপর ওয়াজিব। সালাম ফেরানোর পর কোনো কথা না বলে বা মসজিদ থেকে বের না হয়ে তৎক্ষণাৎ একবার তাকবির পড়া সুন্নাত। ৩ বার পড়াও জায়েজ, তবে একবার পড়া ওয়াজিব।

মহিলাদের তাকবিরে তাশরিক পড়ার নিয়ম

অনেক নারীই জানতে চান, মহিলাদের তাকবিরে তাশরিক পড়ার নিয়ম কী? পুরুষরা এই তাকবির উচ্চস্বরে পড়বেন, কিন্তু মহিলারা তাকবিরে তাশরিক পড়বেন নিচু স্বরে বা মনে মনে। অর্থাৎ, নারীদের ক্ষেত্রে আওয়াজ করে তাকবির পড়া মাকরুহ। তবে কোনো ফরজ নামাজ বাদ গেলে তার কাজা আদায় করার সময়ও এই তাকবির পড়তে হবে।

তাকবিরে তাশরিক: আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ

তাকবিরে তাশরিক মুখস্থ রাখা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জরুরি। নিচে তাকবিরটির আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ দেওয়া হলো:

  • আরবি: اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ وَلِلَّهِ الْحَمْدُ
  • বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।
  • বাংলা অর্থ: আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান। আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান। সমস্ত প্রশংসা কেবল আল্লাহরই জন্য।

শেষকথা

আইয়্যামে তাশরিক মুসলিম জীবনে ইবাদত ও আনন্দ উদযাপনের এক অনন্য সমন্বয়। কোরআন ও হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী এই দিনগুলোতে তাকবিরে তাশরিক পাঠ, কুরবানি এবং বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করে আমাদের উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক নিয়মে আইয়্যামে তাশরিকের আমলগুলো পালন করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি ও মুসলিম শরিফের হাদিস

Leave a Comment

Scroll to Top