ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন ব্যবহারের অনুমতি আছে কি?

ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন ব্যবহারের অনুমতি আছে কি

নির্বাচন কমিশন (EC) আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন ব্যবহার সংক্রান্ত নির্দেশনায় বড় ধরণের পরিবর্তন এনেছে। সাধারণ ভোটার, সাংবাদিক এবং প্রার্থীরা কেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন কিনা তা নিয়ে জনমনে যে বিভ্রান্তি ছিল, তা পরিষ্কার করেছেন নির্বাচন কমিশন সচিব।

এই আর্টিকেলে আমরা জানাবো ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন ব্যবহারের সঠিক নিয়ম, কাদের জন্য নিষেধাজ্ঞা থাকছে এবং নির্বাচনে বিদেশী পর্যবেক্ষকদের অংশগ্রহণের বিস্তারিত তথ্য।

ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন ব্যবহারের অনুমতি আছে কি?

সহজ কথায় উত্তর হলো: হ্যাঁ, তবে শর্তসাপেক্ষে।

নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ সংশোধিত পরিপত্র অনুযায়ী, ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন। তবে গোপন কক্ষে (যেখানে ভোট প্রদান বা স্ট্যাম্পিং করা হয়) ছবি তোলা বা ভিডিও করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

বিস্তারিত নির্দেশনা: কার জন্য কী নিয়ম?

ইসি সচিবের ব্রিফিং অনুযায়ী, মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের জন্য আলাদা আলাদা নিয়ম করা হয়েছে:

সাধারণ ভোটারদের জন্য

  • প্রবেশাধিকার: ভোটাররা মোবাইল ফোন সাথে নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন।
  • নিষেধাজ্ঞা: গোপন কক্ষে (Secret Room) কোনোভাবেই ছবি তোলা বা ভিডিও করা যাবে না। ভোট প্রদানের গোপনীয়তা রক্ষা করা বাধ্যতামূলক।

প্রার্থী ও পোলিং এজেন্টদের জন্য

  • প্রার্থীরা এবং তাদের নির্বাচনী এজেন্টরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবেন। তবে কেন্দ্রের শৃঙ্খলার স্বার্থে কিছু নির্দিষ্ট রেস্ট্রিকশন বা বিধিনিষেধ মানতে হবে।

সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের জন্য

  • সাংবাদিক এবং নির্বাচনী পর্যবেক্ষকরা (Observers) মোবাইল ফোন ও ক্যামেরা নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন।
  • তারা কেন্দ্রের ভিতরের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও সংবাদ সংগ্রহের কাজ করতে পারবেন।
  • তবে ভোটারদের মতো তাদের জন্যও গোপন কক্ষের ছবি তোলা বা ভিডিও ধারণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ

নির্বাচনী কর্মকর্তাদের জন্য

  • প্রিজাইডিং অফিসার ছাড়া সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি বা রেস্ট্রিকশন থাকবে। এটি নির্বাচনী দায়িত্বে অবহেলা রোধ করার জন্য করা হয়েছে।

বিদেশী পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের অংশগ্রহণ

২০২৬ সালের এই নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইসি সচিবের দেওয়া তথ্যমতে, বিপুল সংখ্যক বিদেশী পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক বাংলাদেশে অবস্থান করছেন।

পরিসংখ্যান এক নজরে:

  • মোট বিদেশী অতিথি: ৫৪০ জন (পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক)।
  • আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক: ৩৩০ জন।
  • আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকর্মী: ১৫০ জন (৪৫টি প্রতিষ্ঠান থেকে)।
  • আমন্ত্রিত অতিথি: বিভিন্ন দেশের নির্বাচন কমিশনের ৬০ জন প্রতিনিধি।

যেসব দেশ ও সংস্থা থেকে পর্যবেক্ষকরা আসছেন:

  • দেশ: তুরস্ক, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, ফিলিপাইন, জর্জিয়া, পাকিস্তান, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ডস ইত্যাদি।
  • সংস্থা: ইউরোপীয় ইউনিয়ন (সবচেয়ে বেশি ২২৩ জন), কমনওয়েলথ (২৫ জন), ANFREL (২৮ জন), IRI (১২ জন)।
  • গণমাধ্যম: আল জাজিরা, বিবিসি নিউজ, এপি (AP), রয়টার্স, ডয়চে ভেলে (DW) ইত্যাদি।

বিশেষ তথ্য: বিদেশী সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের সহায়তার জন্য রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে একটি “মিডিয়া সেন্টার” চালু করা হয়েছে।

নির্বাচনী প্রচারণার সময়সীমা

নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, ভোটগ্রহণের দিন সকাল ৮টা থেকে ৪৮ ঘণ্টা আগে অর্থাৎ ভোটের আগের দিন সকাল সাড়ে ৭টার পর থেকে সব ধরণের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা বন্ধ থাকবে। প্রার্থীদের এই সময়ের মধ্যে সকল জনসভা ও মিছিল সমাপ্ত করতে হবে।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

১. ভোটকেন্দ্রে কি সেলফি তোলা যাবে?

উত্তর: ভোটকেন্দ্রের আঙ্গিনায় সেলফি তোলা নিয়ে সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও, ভোট দেওয়ার গোপন কক্ষে সেলফি তোলা বা ব্যালট পেপারের ছবি তোলা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

২. পোলিং এজেন্টরা কি মোবাইল ব্যবহার করতে পারবেন?

উত্তর: হ্যাঁ, তবে সীমিত পরিসরে। তারা কেন্দ্রের ভিতর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এমনভাবে ফোন ব্যবহার করতে পারবেন না।

৩. নির্বাচনে কতজন বিদেশী পর্যবেক্ষক আসছেন?

উত্তর: নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, মোট ৫৪০ জন বিদেশী পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।

৪. গোপন কক্ষে মোবাইল নিয়ে গেলে কী শাস্তি হতে পারে?

উত্তর: নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, গোপন কক্ষে মোবাইল ফোনে ছবি তুললে বা ভিডিও করলে ভোট বাতিলসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

লেখকের মতামত

নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তটি যুগোপযোগী। বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোন মানুষের নিত্যসঙ্গী, তাই এটি রেখে কেন্দ্রে যাওয়া অনেকের জন্য অসুবিধাজনক ছিল। তবে গোপন কক্ষের পবিত্রতা রক্ষা করা ভোটারদের নাগরিক দায়িত্ব। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নির্বাচনের স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে, কিন্তু অপব্যবহার পুরো প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। তাই ভোটার হিসেবে আমাদের সচেতন থাকা জরুরি।

তথ্যসূত্র: নির্বাচন কমিশন সচিবালয় প্রেস ব্রিফিং।

Leave a Comment

Scroll to Top