উত্তর কোরিয়ায় সিরিজ দেখলেই স্কুলছাত্রদের ফাঁসি

ভাবুন তো, শুধুমাত্র একটি বিদেশি সিনেমা দেখা বা গান শোনার অপরাধে কাউকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে আর সেই ভুক্তভোগী যদি হয় স্কুলপড়ুয়া কোনো শিক্ষার্থী! একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে এমন ঘটনা অবিশ্বাস্য মনে হলেও, উত্তর কোরিয়ায় এটিই রূঢ় বাস্তবতা।

সম্প্রতি মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল (Amnesty International)-এর একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমনই লোমহর্ষক তথ্য। দক্ষিণ কোরিয়ান ড্রামা (K-drama) বা কে-পপ (K-pop) গান শোনার অপরাধে দেশটিতে স্কুলছাত্রদেরও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে।

এই আর্টিকেলে আমরা জানব, কেন উত্তর কোরিয়া সরকার বিদেশি সংস্কৃতির ওপর এতটা ক্ষিপ্ত, তাদের আইন কতটা কঠোর এবং এই নির্মম বাস্তবতার পেছনের কারণগুলো কী।

উত্তর কোরিয়ায় বিদেশি মিডিয়া দেখার শাস্তি

উত্তর কোরিয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ান ড্রামা (যেমন: Squid Game), সিনেমা দেখা বা কে-পপ গান (যেমন: BTS) শোনাকে রাষ্ট্রদ্রোহীতার মতো গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, এই “অপরাধে” স্কুলছাত্রসহ সাধারণ মানুষকে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে অথবা বছরের পর বছর শ্রম শিবিরে পাঠানো হচ্ছে। ২০২০ সালের কঠোর আইন অনুযায়ী, এই কনটেন্টগুলো ছড়িয়ে দেওয়ার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। সরকার মূলত জনগণের ওপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করছে।

কেন এই নির্মমতা? অ্যামনেস্টির রিপোর্টে যা উঠে এসেছে

উত্তর কোরিয়া বিশ্বের অন্যতম বিচ্ছিন্ন একটি দেশ। দেশটির শাসক কিম জং উন প্রশাসন বাইরের বিশ্বের যেকোনো তথ্য বা সংস্কৃতিকে তাদের ক্ষমতার জন্য হুমকি মনে করে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে আসা ২৫ জন নাগরিকের জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে। তাদের সাক্ষ্য থেকে জানা যায়:

  • স্কুলছাত্রদের মৃত্যুদণ্ড: শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্করা নয়, স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও যদি দক্ষিণ কোরিয়ান কনটেন্ট (যেমন জনপ্রিয় সিরিজ Squid Game বা BTS-এর গান) উপভোগ করে, তবে তাদেরও রেহাই নেই। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে।
  • প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা: বিদেশি টিভি শো বা সিনেমা দেখাকে এতটাই ভয়াবহ অপরাধ ধরা হয় যে, এর শাস্তি হিসেবে জনসম্মুখে গুলি করে হত্যা (Public Execution) করা হয়।
  • ভয় দেখানোর কৌশল: পালিয়ে আসা নাগরিকরা জানান, স্কুলছাত্রসহ সাধারণ মানুষকে জোর করে এসব প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড দেখতে নিয়ে যাওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য হলো সবার মনে আতঙ্ক তৈরি করা, যাতে কেউ ভুলেও বিদেশি মিডিয়ার ধারেকাছে না যায়।

২০২০ সালের কঠোর আইন: “প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তা ও সংস্কৃতি বিরোধী আইন”

পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় ২০২০ সালে যখন উত্তর কোরিয়া সরকার “Anti-Reactionary Thought and Culture Act” নামে একটি নতুন আইন পাস করে। এই আইনের মূল লক্ষ্য হলো দক্ষিণ কোরিয়াসহ যেকোনো বিদেশি সাংস্কৃতিক প্রভাব দমন করা।

এই আইনের আওতায় শাস্তির বিধানগুলো নিম্নরূপ:

  1. কনটেন্ট দেখার শাস্তি: কেউ যদি দক্ষিণ কোরিয়ান ভিডিও বা কনটেন্ট দেখতে গিয়ে ধরা পড়ে, তবে তাকে পাঁচ থেকে পনেরো বছরের জন্য শ্রম শিবিরে (Labor Camp) পাঠানো হতে পারে। সেখানে অমানবিক পরিবেশে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করানো হয়।
  2. কনটেন্ট ছড়ানোর শাস্তি: যদি কেউ এই ধরনের কনটেন্ট অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়, পেনড্রাইভ বা এসডি কার্ডের মাধ্যমে আদান-প্রদান করে কিংবা গ্রুপ করে দেখে, তবে তার শাস্তি হতে পারে মৃত্যুদণ্ড

শাস্তির ক্ষেত্রেও বৈষম্য: গরিবের বাঁচার উপায় নেই

এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও দুর্নীতির এক করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে সাক্ষীদের জবানবন্দিতে। শাস্তির খড়গ সবার ওপর সমানভাবে নেমে আসে না:

  • সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ: যাদের টাকা বা ক্ষমতা নেই, অর্থাৎ গরিব ও সাধারণ মানুষ, তাদের জন্য এই আইন সবচেয়ে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়। তারা ধরা পড়লে শ্রম শিবির বা মৃত্যুদণ্ড এড়াতে পারে না।
  • প্রভাবশালীদের রক্ষা: অন্যদিকে, যাদের অর্থবিত্ত বা রাজনৈতিক পরিচিতি আছে, তারা অনেক সময় ঘুষ দিয়ে বা প্রভাব খাটিয়ে কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কী বলছে?

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের কর্মকর্তা সারাহ ব্রুকস (Sarah Brooks) উত্তর কোরিয়ার এই ব্যবস্থাকে একটি “আদর্শিক খাঁচা” (ideological cage) হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তিনি বলেন, “এই দমনমূলক ব্যবস্থাটি দাঁড়িয়ে আছে ভয়ের সংস্কৃতি এবং দুর্নীতির ওপর। জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে রাষ্ট্র এই নির্মম পথ বেছে নিয়েছে। এই ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা জরুরি, যদিও উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে এই নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার কোনো ইঙ্গিত মিলছে না।”

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১. উত্তর কোরিয়ায় কি টিভি দেখা নিষিদ্ধ?

উত্তর: না, টিভি দেখা পুরোপুরি নিষিদ্ধ নয়। তবে সেখানে শুধুমাত্র সরকারি বা রাষ্ট্র-অনুমোদিত চ্যানেলগুলোই দেখা যায়, যেখানে সারাদিন সরকারি প্রোপাগান্ডা প্রচার করা হয়। বিদেশি চ্যানেল দেখার কোনো সুযোগ নেই এবং তা দেখার চেষ্টা করা গুরুতর অপরাধ।

২. কেন তারা দক্ষিণ কোরিয়ান ড্রামাকে এত ভয় পায়?

উত্তর: দক্ষিণ কোরিয়ান ড্রামা বা কে-পপে উন্নত জীবনযাত্রা, স্বাধীনতা এবং আধুনিকতার চিত্র ফুটে ওঠে। উত্তর কোরিয়ার সরকার ভয় পায় যে, তাদের জনগণ যদি এই উন্নত জীবনযাত্রা দেখে ফেলে, তবে তারা নিজেদের দেশের দারিদ্র্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পারে।

৩. স্কুইড গেম (Squid Game) দেখার জন্য কি সত্যিই কাউকে মেরে ফেলা হয়েছে?

উত্তর: বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, Squid Game দেখার অপরাধে এবং তা পেনড্রাইভে করে ছড়িয়ে দেওয়ার দায়ে উত্তর কোরিয়ায় শিক্ষার্থীসহ একাধিক ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

শেষ কথা

বিনোদন মানুষের মৌলিক অধিকারের একটি অংশ। কিন্তু উত্তর কোরিয়ায় সেই সামান্য বিনোদনই হয়ে দাঁড়িয়েছে মৃত্যুর কারণ। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এই রিপোর্টটি বিশ্বের কাছে দেশটির মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে এমন ঘটনা আমাদের বাকরুদ্ধ করে দেয়।

তথ্যসূত্র (Sources): আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন।

Leave a Comment

Scroll to Top