হাম প্রতিরোধের একমাত্র কার্যকর উপায় হলো সময়মতো শিশুকে টিকা দেওয়া। বাংলাদেশে সরকারি নিয়মে শিশুদের হাম-রুবেলা (এমআর/MR) টিকা দুটি ডোজে দেওয়া হয়। শিশুর বয়স ৯ মাস পূর্ণ হলে ১ম ডোজ এবং ১৫ মাস পূর্ণ হলে ২য় ডোজ দিতে হয়। আপনার নিকটস্থ যেকোনো ইপিআই (EPI) টিকাদান কেন্দ্র থেকে এই টিকা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে গ্রহণ করা যায়। সম্পূর্ণ সুরক্ষার জন্য দুটি ডোজ সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক।
শিশুর সুস্থতা ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ প্রত্যেক বাবা-মায়ের প্রধান লক্ষ্য। শিশুদের জন্য অন্যতম একটি মারাত্মক ও ছোঁয়াচে রোগ হলো ‘হাম’ (Measles)। তবে আশার কথা হলো, সঠিক সময়ে মাত্র দুটি ডোজ টিকা গ্রহণের মাধ্যমেই এই রোগ থেকে শিশুকে ১০০% সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা জানবো বাংলাদেশে শিশুর হাম-রুবেলা বা এমআর (MR) টিকার সময়সূচি, কোথায় টিকা দেবেন এবং টিকা মিস হলে করণীয় কী।
হাম ও রুবেলা কী এবং কেন এটি মারাত্মক?
হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাল রোগ, যা খুব দ্রুত শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে জ্বর, শরীরে র্যাশ, কাশি এবং চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা বা প্রতিরোধ না করলে নিউমোনিয়া বা ব্রেন ড্যামেজের মতো মারাত্মক জটিলতা হতে পারে। এর সাথে ‘রুবেলা’ ভাইরাস যুক্ত হয়ে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই এমআর (MR – Measles and Rubella) টিকা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশে শিশুর এমআর (MR) টিকার সময়সূচি
বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) গাইডলাইন অনুযায়ী, হাম প্রতিরোধে একটি সুনির্দিষ্ট টিকাদান রুটিন রয়েছে। আপনার শিশুর সুরক্ষায় নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
১. এমআর (MR) টিকার প্রথম ডোজ
- কখন দিতে হবে: শিশুর বয়স সঠিকভাবে ৯ মাস পূর্ণ হলে।
- গুরুত্ব: এটি শিশুর শরীরে হাম ও রুবেলা ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অ্যান্টিবডি তৈরি করে।
২. এমআর (MR) টিকার দ্বিতীয় ডোজ
- কখন দিতে হবে: শিশুর বয়স ১৫ মাস পূর্ণ হলে।
- গুরুত্ব: মনে রাখবেন, সম্পূর্ণ সুরক্ষা পেতে শিশুকে অবশ্যই সময়মতো দুই ডোজ টিকা দিতে হবে। দ্বিতীয় ডোজ শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করে।
যদি শিশুর টিকা মিস হয়ে যায়, তবে করণীয় কী?
অনেক সময় অসুস্থতা বা ব্যস্ততার কারণে সঠিক সময়ে শিশুর টিকা মিস হয়ে যেতে পারে। এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, তবে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
- ২ বছরের কম বয়সী শিশু: যে সকল শিশুর বয়স ২ বছরের কম, কিন্তু এখনও হাম-রুবেলা (এমআর) টিকা গ্রহণ করেনি, তাদের জন্য অতি দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে এই টিকা নিশ্চিত করতে হবে।
কোথা থেকে শিশুর হামের টিকা দেবেন?
বাংলাদেশ সরকারের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির (EPI) আওতায় এই টিকা দেওয়া হয়। আপনি নিচের স্থানগুলো থেকে টিকা দিতে পারবেন:
- আপনার নিকটস্থ যেকোনো ইপিআই (EPI) টিকাদান কেন্দ্র।
- সরকারি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।
- ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র।
- কমিউনিটি ক্লিনিক।
বিশেষ নোট: হামের সংক্রমণ রুখে দিতে আপনার দ্রুত পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি। আপনার শিশুকে সুরক্ষিত রাখতে টিকাদানের এই রুটিন মেনে চলুন। আপনার পরিবার ও প্রতিবেশীদেরও এই তথ্য জানিয়ে দিন এবং তাদের উৎসাহিত করুন।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর
১. শিশুর হামের টিকা কত মাসে দিতে হয়?
বাংলাদেশে শিশুর বয়স ৯ মাস পূর্ণ হলে হাম-রুবেলা (MR) টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস পূর্ণ হলে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়।
২. এমআর (MR) টিকা কি হাম প্রতিরোধ করে?
হ্যাঁ, এমআর (MR) টিকা হাম (Measles) এবং রুবেলা (Rubella) এই দুটি মারাত্মক ভাইরাসের আক্রমণ থেকে শিশুকে দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা প্রদান করে।
৩. হামের টিকার দ্বিতীয় ডোজ কেন জরুরি?
শুধুমাত্র একটি ডোজ শিশুর সম্পূর্ণ সুরক্ষার জন্য যথেষ্ট নয়। প্রথম ডোজের পর শরীরে যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, তা আজীবন ধরে রাখতে এবং ১০০% কার্যকর সুরক্ষার জন্য ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া বাধ্যতামূলক।
৪. দুই বছর পার হয়ে গেলে কি হামের টিকা দেওয়া যায়?
ইপিআই এর নিয়ম অনুযায়ী ২ বছরের কম বয়সী শিশুদের দ্রুত ক্যাচ-আপ (Catch-up) টিকা দেওয়া হয়। যদি শিশুর বয়স ২ বছরের বেশি হয়ে যায় এবং টিকা না দেওয়া থাকে, তবে অবশ্যই একজন শিশু বিশেষজ্ঞ (Pediatrician)-এর পরামর্শ নিতে হবে।
৫. হামের টিকা দিলে কি শিশুর জ্বর আসতে পারে?
টিকা দেওয়ার পর শিশুর সামান্য জ্বর আসা বা টিকার স্থান কিছুটা লাল হয়ে যাওয়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এটি প্রমাণ করে যে টিকা কাজ করছে। তবে জ্বর বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে প্যারাসিটামল খাওয়ানো যেতে পারে।
শেষকথা
আপনার শিশুর জীবন অমূল্য। সাময়িক অবহেলা শিশুর ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। তাই আজই আপনার শিশুর টিকার কার্ডটি চেক করুন। ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে এমআর (MR) টিকা নিশ্চিত করে শিশুকে দিন এক সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ।
(আর্টিকেলটি জনস্বার্থে তৈরি। যেকোনো চিকিৎসা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সর্বদা আপনার রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করুন।)
তথ্যসূত্র (Sources): সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) বাংলাদেশ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), এবং ইউনিসেফ (UNICEF)।
