রিটার্নিং অফিসার (Returning Officer) হলেন একটি নির্বাচনী এলাকার প্রধান নির্বাচন পরিচালক। সহজ কথায়, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা থেকে শুরু করে চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার ‘ক্যাপ্টেন’ হলেন তিনি। ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি প্রকাশিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO), ১৯৭২-এর সর্বশেষ সংশোধনী অনুযায়ী রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব ও ক্ষমতায় বেশ কিছু নতুনত্ব এসেছে।
আজকে আমরা রিটার্নিং অফিসারের কাজ, নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং ২০২৬ সালের নতুন আইন অনুযায়ী তাদের বিশেষ ক্ষমতাগুলো জানব।
রিটার্নিং অফিসার কে ও কীভাবে নিয়োগ পান?
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (EC) গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকার জন্য একজন করে রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ দেয় । সাধারণত জেলা প্রশাসক (DC) বা সমপর্যায়ের কর্মকর্তাদের এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। কমিশন প্রয়োজনে সহায়তার জন্য সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ দিতে পারে ।
রিটার্নিং অফিসারের প্রধান কাজ ও দায়িত্বসমূহ
নির্বাচনী চক্রের প্রতিটি ধাপে রিটার্নিং অফিসারকে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করতে হয়:
ধাপ ১: ভোটকেন্দ্র ও কর্মকর্তা নিয়োগ
- ভোটকেন্দ্র চূড়ান্তকরণ: কমিশন কর্তৃক প্রেরিত ভোটকেন্দ্রের তালিকা অনুযায়ী তিনি প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার জন্য ভোটকেন্দ্রের ব্যবস্থা করেন । তবে কোনো প্রার্থীর ব্যক্তিগত স্থাপনায় ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা যাবে না ।
- কর্মকর্তা নিয়োগ (প্যানেল তৈরি): তিনি বিভিন্ন সরকারি/বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের তালিকা থেকে প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার নিয়োগ দেন ।
ধাপ ২: মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও যাচাই-বাছাই (Scrutiny)
- মনোনয়নপত্র গ্রহণ: নির্বাচনের তফসিলে ঘোষিত তারিখের মধ্যে তিনি প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র গ্রহণ করেন ।
- বাছাই (Scrutiny): ১৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তিনি প্রার্থীদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতা (যেমন: ঋণখেলাপি কিনা, বিল বকেয়া আছে কিনা) যাচাই করেন । যাচাই-বাছাই শেষে বৈধ প্রার্থীর তালিকা প্রকাশ করেন ।
ধাপ ৩: প্রতীক বরাদ্দ (Symbol Allocation)
- ২০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, তিনি বৈধ প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ করেন। নিবন্ধিত দলের প্রার্থীদের দলীয় প্রতীক এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পছন্দ অনুযায়ী (উপলব্ধ থাকা সাপেক্ষে) প্রতীক দেন ।
ধাপ ৪: পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাপনা (গুরুত্বপূর্ণ আপডেট)
- নতুন সংশোধনী (অনুচ্ছেদ ২৭) অনুযায়ী, যারা সশরীরে ভোট দিতে অক্ষম (যেমন: প্রবাসী, কারাবন্দি, নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা), তাদের জন্য পোস্টাল ব্যালট ইস্যু করা এবং তা ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থা করা রিটার্নিং অফিসারের অন্যতম কাজ ।
ধাপ ৫: ফলাফল একত্রীকরণ ও ঘোষণা
- ভোটগ্রহণ শেষে প্রিজাইডিং অফিসাররা ফলাফল পাঠালে রিটার্নিং অফিসার ৩৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সকল কেন্দ্রের ফলাফল একত্র (Consolidate) করেন ।
- সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থীকে তিনি গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নির্বাচিত ঘোষণা করেন ।
২০২৬ সালের সংশোধনী অনুযায়ী বিশেষ দায়িত্ব
আপনার দেওয়া ডকুমেন্ট অনুযায়ী রিটার্নিং অফিসারের কাজে কিছু নতুন আইনি প্রেক্ষাপট যুক্ত হয়েছে:
ক. পোস্টাল ব্যালট গণনা কেন্দ্র (৩৭ক অনুচ্ছেদ)
নতুন ৩৭ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাচনের দিন রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় একটি “ভোটকেন্দ্র” হিসেবে গণ্য হবে শুধুমাত্র পোস্টাল ব্যালট গণনার জন্য। তিনি সেখানে একজন প্রিজাইডিং অফিসার নিয়োগ দেবেন যিনি ডাকযোগে প্রাপ্ত ভোটগুলো গণনা করে মূল ফলাফলের সাথে যোগ করবেন ।
খ. নির্বাচনী অপরাধ ও AI-এর অপব্যবহার রোধ (৭৩ক অনুচ্ছেদ)
নতুন যুক্ত হওয়া ৭৩ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাচনে কেউ যদি Artificial Intelligence (AI) বা ডিপফেকের মাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়ায়, তবে তা দুর্নীতিমূলক অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। যদিও এটি আদালতের বিচার্য, কিন্তু নির্বাচনী এলাকার প্রধান হিসেবে রিটার্নিং অফিসারকে এই ধরনের অভিযোগের প্রাথমিক তদারকি করতে হতে পারে ।
গ. কর্মকর্তা প্রত্যাহারের ক্ষমতা (৭ অনুচ্ছেদ)
নির্বাচন চলাকালীন কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা পুলিশ সদস্য যদি সুষ্ঠু নির্বাচনে বাধা সৃষ্টি করেন, তবে রিটার্নিং অফিসারের রিপোর্টের ভিত্তিতে কমিশন তাদের তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করতে পারে ।
রিটার্নিং অফিসার বনাম প্রিজাইডিং অফিসার
| দায়িত্বের ক্ষেত্র | রিটার্নিং অফিসার (RO) | প্রিজাইডিং অফিসার (PO) |
| এলাকা | সম্পূর্ণ সংসদীয় আসন (যেমন: ঢাকা-১০)। | নির্দিষ্ট একটি ভোটকেন্দ্র। |
| ক্ষমতা | প্রার্থী চূড়ান্ত করা, প্রতীক দেওয়া, ফলাফল ঘোষণা। | ভোটগ্রহণ পরিচালনা ও কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ। |
| রিপোর্টিং | সরাসরি নির্বাচন কমিশনে। | রিটার্নিং অফিসারের কাছে। |
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
১. একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ কয়টি আসনে প্রার্থী হতে পারেন?
১৩ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি একই সময়ে সর্বোচ্চ তিনটি (৩) নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রার্থী হতে পারেন। এর বেশি হলে সব মনোনয়ন বাতিল হয়ে যাবে ।
২. রিটার্নিং অফিসারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করা যায় কি?
হ্যাঁ। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় রিটার্নিং অফিসার কোনো সিদ্ধান্ত দিলে, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি নির্বাচন কমিশনে আপিল করতে পারেন ।
৩. নির্বাচনে সমান ভোট (Tie) হলে কী হবে?
৩৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যদি দুজন প্রার্থীর ভোট সমান হয়, তবে রিটার্নিং অফিসার বিষয়টি কমিশনকে জানাবেন এবং ওই দুই প্রার্থীর মধ্যে পুনরায় ভোট (Re-poll) অনুষ্ঠিত হবে । (আগে লটারির বিধান থাকলেও নতুন সংশোধনীতে পুনঃভোটের কথা বলা হয়েছে)।
শেষ কথা
সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য রিটার্নিং অফিসার হলেন নির্বাচন কমিশনের ‘চোখ ও কান’। প্রার্থীর যোগ্যতা যাচাই থেকে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তির (AI) অপব্যবহার রোধ সবক্ষেত্রেই তাকে সজাগ থাকতে হয়। ২০২৬ সালের সংশোধনীতে পোস্টাল ব্যালটের ওপর জোর দেওয়ায় রিটার্নিং অফিসারের কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে।

আমি বিগত ৫ বছর ধরে রাজনীতি এবং অর্থনীতি ও সংবিধান নিয়ে গবেষণা ও লেখালেখি করছি। সরকারি প্রজ্ঞাপন, প্রশাসনিক আইন এবং নির্বাচনী আচরণবিধিকে সহজ ভাষায় সাধারণ মানুষের উপযোগী করে বিশ্লেষণ করতে চেষ্টা করি।

