আপনি যখন গুগল বা চ্যাটজিবিটিকে কোনো প্রশ্ন করেন কিংবা ক্লাউডে ছবি জমা রাখেন, তখন মনে হতে পারে সবকিছু আকাশের কোনো অদৃশ্য মেঘে হচ্ছে। কিন্তু আসল সত্য হলো, এগুলো মাটির ওপর থাকা বিশাল বিশাল ওয়্যারহাউজের মতো ‘ডেটা সেন্টার’-এ জমা থাকে। বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে বিশ্বে অন্তত দুইটি নতুন জায়ান্ট ডেটা সেন্টার তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এই উন্নতির পেছনে লুকিয়ে আছে পরিবেশগত বিপর্যয় এবং অর্থনৈতিক সংকটের এক ভয়ংকর চিত্র।
ডেটা সেন্টার আসলে কী?
ডেটা সেন্টারকে আপনি একটি বিশাল ‘কম্পিউটারের শহর’ হিসেবে ভাবতে পারেন। এর ভেতরে থাকে হাজার হাজার সার্ভার যা ২৪/৭ বিরতিহীনভাবে কাজ করে। একটি ডেটা সেন্টারে শুধু কম্পিউটার থাকে না, বরং থাকে:
- বিশাল কুলিং সিস্টেম ও পানির পাম্প।
- অতিকায় ফ্যান এবং ব্যাকআপ ব্যাটারি।
- সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিশাল বিশাল ডিজেল জেনারেটর। কারণ বিদ্যুৎ চলে গেলেও ডেটা সেন্টার এক সেকেন্ডের জন্যও থামতে পারে না।
যদি ডেটা সেন্টার ২ দিন বন্ধ থাকে তবে কী হবে?
ভিডিওতে ‘ডিজিটাল শাটডাউন’-এর এক ভয়ংকর চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। যদি কোনো কারণে ডেটা সেন্টার দুই দিন বন্ধ থাকে:
- হাসপাতাল ও ট্রান্সপোর্ট: জরুরি চিকিৎসাসেবা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।
- ব্যাংকিং ও ইমেইল: অনলাইন লেনদেন বন্ধ হবে এবং ইমেইল আদান-প্রদান অসম্ভব হয়ে পড়বে।
- সরকারি স্থবিরতা: একটি সরকার ব্যবস্থা শাটডাউন হলে যে বিশৃঙ্খলা হয়, ডিজিটাল শাটডাউন তার চেয়েও বহুগুণ ভয়াবহ হবে।
বিদ্যুৎ ও পানির খরচের অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান
ডেটা সেন্টারের সবচেয়ে বড় নেতিবাচক দিক হলো এর সীমাহীন সম্পদের ব্যবহার।
১. বিদ্যুতের পাহাড়: একটি বড় ডেটা সেন্টার বছরে প্রায় ২ টেরাওয়াট আওয়ার বিদ্যুৎ খরচ করে, যা প্রায় ২ লক্ষ বাসাবাড়ির মোট বিদ্যুতের সমান।
২. ফ্রেশ ওয়াটারের সংকট: সার্ভার ঠান্ডা রাখতে মাইক্রোসফটের একটি ডেটা সেন্টার বিল্ডিংয়েই দিনে ১০ লাখ গ্যালন পানি লাগে। বছরে এর পরিমাণ প্রায় ১.৮৩ বিলিয়ন গ্যালন, যা ৬১ হাজার মানুষের সারা বছরের পানির চাহিদার সমান।
৩. মরুভূমি ও খরা এলাকায় প্রভাব: আমেরিকার অ্যারিজোনা বা কলোরাডো রিভার অঞ্চলে এমনিতেই পানির অভাব। সেখানে ২০০০ সাল থেকে পানির প্রবাহ ২০% কমেছে। অথচ সেখানেই গড়ে উঠছে বড় বড় ডেটা সেন্টার। এখন প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—মানুষ খাবে নাকি সার্ভার ঠান্ডা করবে?
চ্যাটজিবিটি পরবর্তী যুগ
চ্যাটজিবিটি আসার আগে ও পরে ডেটা সেন্টারের ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে।
- সিপিইউ বনাম জিপিইউ: আগের ডেটা সেন্টার চলত সিপিইউ দিয়ে, কিন্তু এআই-এর জন্য লাগে জিপিইউ (GPU), যা ৫-১০ গুণ বেশি শক্তি টানে।
- বিদ্যুৎ চাহিদাহ: আগে একটি ক্যাবিনেটে ৫-১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ লাগত, এখন এআই-এর প্রভাবে সেটি ৭০-১০০ কিলোওয়াটে গিয়ে ঠেকেছে।
সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব
অনেকেই খেয়াল করেছেন কম্পিউটারের পার্টস বা র্যামের দাম বাড়ছে। এর পেছনে মূল হোতা এই ডেটা সেন্টারগুলো।
- এইচবিএম (HBM) মেমোরি: ডেটা সেন্টারে এখন হাই ব্যান্ডউইথ মেমোরি লাগে।
- উৎপাদন পরিবর্তন: স্যামসাং (Samsung), এসকে হাইনিক্স (SK Hynix) এবং মাইক্রন (Micron)-এর মতো শীর্ষ কোম্পানিগুলো এখন সাধারণ পিসি-র জন্য ডিডিআর (DDR) র্যাম বানানোর বদলে ডেটা সেন্টারের জন্য দামি র্যাম বানাতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য বাজারে র্যামের সংকট ও দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রশ্ন: ডেটা সেন্টারে কেন ডিজেল জেনারেটর থাকে? উত্তর: বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময়ও যাতে সার্ভার সচল থাকে এবং ডিজিটাল সেবাগুলো নিরবচ্ছিন্ন থাকে, তা নিশ্চিত করতে বিশাল ব্যাকআপ হিসেবে এগুলো রাখা হয়।
প্রশ্ন: চ্যাটজিবিটি ব্যবহার করলে কি পানি খরচ হয়? উত্তর: হ্যাঁ, পরোক্ষভাবে। চ্যাটজিবিটি বা জেমিনি-র মতো এআই মডেলগুলো যে ডেটা সেন্টারে প্রসেস হয়, সেই সার্ভারগুলো ঠান্ডা রাখতে বিপুল পরিমাণ ফ্রেশ ওয়াটার বা বিশুদ্ধ পানি প্রয়োজন হয়।
প্রশ্ন: ভবিষ্যতে এর সমাধান কী? উত্তর: পরিবেশবিদরা ডেটা সেন্টারের জন্য নির্দিষ্ট লিমিটেশন বা সীমা নির্ধারণের কথা বলছেন। পাশাপাশি কোম্পানিগুলোকে গ্রিন এনার্জি এবং পানির বিকল্প কুলিং সিস্টেম ব্যবহারে বাধ্য করার দাবি উঠছে।
শেষকথা
আমরা কেউই প্রযুক্তিবিরোধী নই; এআই, ক্লাউড এবং ইন্টারনেট আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এর পেছনে যে পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় হচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এখনই লাগাম টানা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পানির স্তর ও জ্বালানি সংকটে ভয়ংকর সমস্যার সম্মুখীন হবে।
