মা বাবার জন্য দোয়া কী এবং কেন করবেন?
মা-বাবার জন্য দোয়া করা প্রতিটি সন্তানের ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব। ইসলামে পিতামাতার প্রতি সদাচার ও তাঁদের জন্য দোয়া করাকে আল্লাহর ইবাদতের পরেই সর্বোচ্চ আমল হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
মা বাবার জন্য সবচেয়ে পরিচিত দোয়াটি হলো —
আরবি: رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا উচ্চারণ: রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা অর্থ: “হে আমার রব! তাঁদের উভয়ের প্রতি রহম করুন, যেমন তাঁরা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন।” (সূরা বনি ইসরাইল: আয়াত ২৪)
এই একটি দোয়াই জীবিত ও মৃত — উভয় মা-বাবার জন্য করা যায়।
মা বাবার জন্য দোয়া করার ফজিলত কী?
ইসলামে মা-বাবার জন্য দোয়ার ফজিলত অত্যন্ত গভীর। হাদিসে এসেছে —
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি আমলের সওয়াব অব্যাহত থাকে — সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা থেকে মানুষ উপকৃত হয়, এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।” (সহিহ মুসলিম: হাদিস ১৬৩১)
সন্তানের দোয়ার মাধ্যমে মৃত মা-বাবার কবরে আলো বাড়ে, মর্যাদা উন্নীত হয় এবং গুনাহ মাফ হয়। হাদিসে আরও এসেছে —
“কোনো কোনো ব্যক্তি জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা পেয়ে বলবে, আমি এই মর্যাদার অধিকারী কীভাবে হলাম? তাকে বলা হবে, তোমার সন্তানের দোয়া ও ইস্তেগফারের কারণে।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, মুসনাদে আহমাদ)
জীবিত মা বাবার জন্য দোয়া
মা-বাবা জীবিত থাকতেই তাঁদের জন্য বেশি বেশি দোয়া করা উচিত। নিচে কুরআন ও হাদিস থেকে প্রমাণিত দোয়াগুলো দেওয়া হলো।
দোয়া ১ — রহমতের দোয়া (সূরা বনি ইসরাইল: ২৪)
আরবি:
رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
উচ্চারণ: রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা
অর্থ: হে আমার রব! তাঁদের উভয়ের প্রতি রহম করুন, যেমন তাঁরা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন।
কখন পড়বেন: নামাজের পর, সকাল-সন্ধ্যা, যেকোনো সময়।
দোয়া ২ — ক্ষমা ও মাগফেরাতের দোয়া (সূরা ইবরাহিম: ৪১)
এই দোয়াটি নবী ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়া। আল্লাহ স্বয়ং কুরআনে এটি লিপিবদ্ধ করেছেন।
আরবি:
رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ
উচ্চারণ: রাব্বানাগফিরলি ওয়ালে ওয়ালিদাইয়্যা ওয়া লিলমুমিনিনা ইয়াওমা ইয়াকুমুল হিসাব
অর্থ: হে আমাদের রব! আমাকে, আমার মা-বাবাকে এবং সকল মুমিনকে ক্ষমা করুন — যেদিন হিসাব প্রতিষ্ঠিত হবে।
দোয়া ৩ — কৃতজ্ঞতা ও সুপথের দোয়া (সূরা আহকাফ: ১৫)
আরবি:
رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَىٰ وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ وَأَصْلِحْ لِي فِي ذُرِّيَّتِي ۖ إِنِّي تُبْتُ إِلَيْكَ وَإِنِّي مِنَ الْمُسْلِمِينَ
উচ্চারণ: রাব্বি আওযি’নি আন আশকুরা নি’মাতাকাল্লাতি আনআ’মতা আলাইয়্যা ওয়া আলা ওয়ালিদাইয়্যা ওয়া আন আ’মালা সালিহান তারদাহু ওয়া আসলিহলি ফি যুররিয়্যাতি, ইন্নি তুবতু ইলাইকা ওয়া ইন্নি মিনাল মুসলিমিন।
অর্থ: হে আমার রব! তুমি আমাকে ও আমার মা-বাবাকে যে নিয়ামত দান করেছ, সে বিষয়ে কৃতজ্ঞ হওয়ার এবং তোমার পছন্দমতো নেক আমল করার তাওফিক দাও। আমার বংশধরদেরও সংশোধন করে দাও। আমি তোমার কাছে তাওবা করলাম এবং আমি মুসলিমদের একজন।
মৃত মা বাবার জন্য দোয়া
মা-বাবা মারা গেলেও সন্তানের দোয়া তাঁদের কাছে পৌঁছায় — এটি কুরআন ও সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
মৃত মা-বাবার জন্য বিশেষ দোয়া (সূরা নুহ: ২৮)
আরবি:
رَّبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِمَن دَخَلَ بَيْتِيَ مُؤْمِنًا وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ
উচ্চারণ: রাব্বিগফিরলি ওয়া লিওয়ালিদাইয়্যা ওয়া লিমান দাখালা বাইতিয়া মুমিনান ওয়া লিলমুমিনিনা ওয়াল মুমিনাত।
অর্থ: হে আমার রব! আমাকে, আমার মা-বাবাকে, যারা আমার ঘরে ঈমানদার হয়ে প্রবেশ করেছে এবং সকল মুমিন নারী-পুরুষকে ক্ষমা করুন।
ইস্তেগফার — মৃত মা-বাবার জন্য সর্বোত্তম আমল
মৃত মা-বাবার জন্য প্রতিদিন এই দোয়াটি পড়ুন:
আস্তাগফিরুল্লাহ হাল আজিম — “আমি মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।”
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“সন্তানের দোয়া ও ইস্তেগফার মৃত মা-বাবার জন্য আলো হয়ে কবরে পৌঁছায়।” (আল-আদাবুল মুফরাদ: ৩৬)
মা বাবার জন্য দোয়া করার সঠিক সময় ও নিয়ম
দোয়া কবুলের বিশেষ সময় ও পদ্ধতি জানলে দোয়ার প্রভাব আরও বাড়ে।
দোয়া কবুলের সেরা সময়গুলো:
- ফরজ নামাজের পর — বিশেষত ফজর ও মাগরিবের পর
- সেজদায় থাকা অবস্থায় — রাসূল ﷺ বলেছেন, বান্দা সেজদায় আল্লাহর সবচেয়ে কাছে থাকে
- তাহাজ্জুদের সময় — রাতের শেষ তৃতীয়াংশে
- জুমার দিন আসরের পর — দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত
- ইফতারের আগ মুহূর্তে — রমজান মাসে বিশেষভাবে
দোয়ার আদব ও নিয়ম:
১. অজু করে কিবলামুখী হয়ে বসুন ২. আল্লাহর হামদ ও দরুদ দিয়ে শুরু করুন ৩. বিনয়ের সাথে হাত তুলুন ৪. বিশ্বাস রেখে দোয়া করুন — সন্দেহ না রেখে ৫. মা-বাবার নাম উল্লেখ করে দোয়া করলে আরও ভালো ৬. “আমিন” বলে শেষ করুন
মা বাবার প্রতি ইসলামের নির্দেশনা
মা-বাবার জন্য দোয়া করার পাশাপাশি তাঁদের প্রতি সঠিক আচরণও জরুরি। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন:
“তোমার রব নির্দেশ দিয়েছেন তিনি ছাড়া অন্য কাউকে উপাসনা না করতে এবং মা-বাবার প্রতি সদাচার করতে।” (সূরা বনি ইসরাইল: ২৩)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় আমল কী?” — “সময়মতো নামাজ।” “তারপর?” — “মা-বাবার সাথে সদাচার।” “তারপর?” — “আল্লাহর পথে জিহাদ।” (সহিহ বুখারী: হাদিস ৫৯৭০)
মা-বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব:
- তাঁদের সাথে কোনোদিন “উফ” শব্দটিও বলা যাবে না (সূরা ইসরা: ২৩)
- তাঁদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন
- তাঁদের চাহিদা আগে পূরণ করুন
- দৈনিক অন্তত একবার তাঁদের জন্য দোয়া করুন
- তাঁদের সাথে সুন্দর ভাষায় কথা বলুন
মৃত মা বাবার জন্য যা করবেন — ১০টি কার্যকর আমল
মা-বাবা মারা যাওয়ার পর শুধু দোয়াই নয়, আরও কিছু আমল তাঁদের আত্মার কাছে পৌঁছায়।
১. নিয়মিত দোয়া ও ইস্তেগফার করুন — প্রতিদিন নামাজের পর
২. সদকায়ে জারিয়া করুন — তাঁদের নামে পানির ব্যবস্থা, মাদরাসা বা দ্বীনী কাজে দান করুন
৩. তাঁদের পক্ষ থেকে রোজা রাখুন — বিশেষত মানতের বা কাজা রোজা থাকলে
৪. কুরআন তিলাওয়াত করুন — সূরা ইয়াসিন পড়ে রুহ পাঠান
৫. তাঁদের ঋণ পরিশোধ করুন — মৃত্যুর আগে ঋণ ছিলে সন্তানের উপর দায়িত্ব
৬. তাঁদের বন্ধুদের সাথে সুসম্পর্ক রাখুন — এটি পিতামাতার প্রতি সম্মানের চিহ্ন
৭. তাঁদের অসম্পূর্ণ মানত পূর্ণ করুন
৮. জানাজার নামাজ পড়ুন — যদি সুযোগ থাকে
৯. তাঁদের কবর জিয়ারত করুন — দোয়া করুন, ফুল দিন না
১০. দ্বীনি জ্ঞান অর্জন ও প্রচার করুন — ইলমের সওয়াব মৃত মা-বাবার কাছেও পৌঁছায়
সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন ১: মা বাবার জন্য দোয়া করলে কি সওয়াব পাওয়া যায়?
হ্যাঁ, অবশ্যই। সহিহ মুসলিমের হাদিসে স্পষ্টভাবে এসেছে যে নেক সন্তান যখন মৃত মা-বাবার জন্য দোয়া করে, সেই দোয়ার সওয়াব মৃত মা-বাবার কাছে পৌঁছায় এবং তাঁদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি দোয়াকারী সন্তানও নেকি পান।
প্রশ্ন ২: মৃত মা বাবার জন্য কোন দোয়া সবচেয়ে উত্তম?
মৃত মা-বাবার জন্য সবচেয়ে প্রমাণিত ও উত্তম দোয়া হলো:
- রাব্বির হামহুমা (সূরা বনি ইসরাইল: ২৪)
- রাব্বানাগফিরলি ওয়ালে ওয়ালিদাইয়্যা (সূরা ইবরাহিম: ৪১)
- রাব্বিগফিরলি ওয়া লিওয়ালিদাইয়্যা (সূরা নুহ: ২৮)
এবং প্রতিদিন ইস্তেগফার পড়া।
প্রশ্ন ৩: জীবিত মা বাবার জন্য কোন দোয়া পড়বো?
জীবিত মা-বাবার জন্য সূরা বনি ইসরাইলের ২৪ নম্বর আয়াতের দোয়াটি পড়ুন: “রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা” — এটি জীবিত ও মৃত উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য।
প্রশ্ন ৪: মা বাবার জন্য দোয়া কি নামাজের মধ্যে পড়া যায়?
হ্যাঁ। নামাজের সেজদায় এবং তাশাহহুদের পর দোয়া করার সুযোগ আছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, সেজদায় বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে নিকটে থাকে, তাই সেই সময়ে দোয়া বেশি কবুল হয়।
প্রশ্ন ৫: মা বাবার জন্য দোয়া না করলে কি গুনাহ হবে?
সরাসরি “গুনাহ” বলা না গেলেও, যে সন্তান মা-বাবার জন্য দোয়া করে না, সে নেক সন্তানের মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়। হাদিসে নেক সন্তানকে মৃত মা-বাবার জন্য সবচেয়ে বড় সাদকায়ে জারিয়া বলা হয়েছে।
প্রশ্ন ৬: মা বাবার জন্য দোয়া বাংলায় করা যাবে?
হ্যাঁ। ফরজ নামাজের বাইরে দোয়া বাংলায় করা যায়। আল্লাহ সব ভাষা বোঝেন। তবে কুরআনে বর্ণিত আরবি দোয়াগুলো পড়লে অতিরিক্ত বরকত পাওয়া যায়।
প্রশ্ন ৭: প্রতিদিন কতবার মা বাবার জন্য দোয়া করা উচিত?
নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। তবে প্রতি ফরজ নামাজের পর অন্তত একবার দোয়া করা উত্তম। রাতের তাহাজ্জুদে এবং বিশেষ দোয়া কবুলের সময়গুলোতে নিয়মিত মা-বাবার কথা মনে করে দোয়া করুন।
মা বাবার জন্য দোয়া করার গুরুত্ব
আমরা প্রায়ই মনে করি মা-বাবার জন্য কিছু করতে হলে টাকা বা বড় সম্পদ লাগে। কিন্তু ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে যে সবচেয়ে সহজ ও মূল্যবান উপহার হলো — তাঁদের জন্য দোয়া।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“বাবা জান্নাতের মধ্যবর্তী দরজা। এখন তোমার ইচ্ছা — এই দরজার হেফাজত করো অথবা নষ্ট করে দাও।” (তিরমিযী: হাদিস ১৯০১)
তাঁরা বেঁচে থাকতে দোয়া করুন। মারা গেলেও দোয়া করুন। দোয়াই সেই অদৃশ্য সেতু — যা সন্তান ও মা-বাবার মধ্যে মৃত্যুর পরেও সংযোগ রক্ষা করে।
সারসংক্ষেপ
- মা-বাবার জন্য দোয়া করা নেক সন্তানের পরিচয়
- সূরা বনি ইসরাইল: ২৪ — জীবিত ও মৃত উভয়ের জন্য সর্বোত্তম দোয়া
- প্রতিদিন নামাজের পর অন্তত একটি দোয়া পড়ুন
- মৃত মা-বাবার জন্য সদকায়ে জারিয়া, দোয়া ও ইস্তেগফার করুন
- সেজদায় ও তাহাজ্জুদে দোয়া কবুলের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি
বিশ্বাসযোগ্য সূত্র:
- পবিত্র কুরআনুল কারিম (সূরা বনি ইসরাইল: ২৩-২৪, সূরা ইবরাহিম: ৪১, সূরা নুহ: ২৮, সূরা আহকাফ: ১৫)
- সহিহ মুসলিম: হাদিস ১৬৩১, ৪৩১০
- সহিহ বুখারী: হাদিস ৫৯৭০
- সুনানে তিরমিযী: হাদিস ১৯০১
- আল-আদাবুল মুফরাদ: হাদিস ৩৬
- সুনানে ইবনে মাজাহ, মুসনাদে আহমাদ
এই আর্টিকেলে দেওয়া সকল তথ্য কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে যাচাইকৃত। কোনো তথ্যে দ্বিমত থাকলে একজন যোগ্য আলেমের পরামর্শ নিন।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”


