বাইক ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় নতুন কর ২০২৬

বাইক ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় নতুন কর ২০২৬

বাংলাদেশ সরকারের আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রথমবারের মতো মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর অগ্রিম আয়কর (AIT) আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ১১০ সিসি পর্যন্ত বাইকে কোনো অগ্রিম কর দিতে হবে না। তবে ১১১–১২৫ সিসির বাইকে ২,০০০ টাকা, ১২৬–১৬৫ সিসির বাইকে ৫,০০০ টাকা এবং ১৬৫ সিসির বেশি হলে ১০,০০০ টাকা কর দিতে হবে। অন্যদিকে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রে এলাকাভেদে বছরে ১,০০০ টাকা থেকে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত কর নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই কর বাইকের রেজিস্ট্রেশন বা ফিটনেস নবায়নের সময় আদায় করা হবে এবং তা বছর শেষে আয়কর রিটার্নের সাথে সমন্বয় করা যাবে।

বাংলাদেশে যাতায়াত ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান দুটি মাধ্যম হলো মোটরসাইকেল এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। সাম্প্রতিক সময়ে এই খাত দুটিতে ব্যাপক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সরকারের রাজস্বের আওতা বাড়াতে এবং যান চলাচলে শৃঙ্খলা আনতে আসন্ন ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে “বাইকের চাকা ঘুরলেই কর” নীতিতে নতুন অগ্রিম করের প্রস্তাব করা হয়েছে।

আপনি যদি একজন বর্তমান বাইকার হন, নতুন বাইক কেনার কথা ভাবেন, অথবা অটোরিকশা ব্যবসার সাথে যুক্ত থাকেন, তবে এই নতুন নিয়মের খুঁটিনাটি জেনে নেওয়া আপনার জন্য অত্যন্ত জরুরি। নিচে এ বিষয়ে বিস্তারিত ও ভেরিফায়েড তথ্য তুলে ধরা হলো।

মোটরবাইকে নতুন করের তালিকা (সিসিভেদে অগ্রিম কর)

মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে কর নির্ধারণ করা হয়েছে বাইকের ইঞ্জিন ক্যাপাসিটি বা সিসি (CC)-এর ওপর ভিত্তি করে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত মোটরবাইকের সংখ্যা প্রায় ৪৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৮০টি। নতুন বাজেটের প্রস্তাব অনুযায়ী সিসিভেদে করের পরিমাণ নিচে দেওয়া হলো:

  • ১১০ সিসি পর্যন্ত: কোনো অগ্রিম কর নেই (সম্পূর্ণ করমুক্ত)।
  • ১১১ থেকে ১২৫ সিসি পর্যন্ত: বছরে ২,০০০ টাকা
  • ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসি পর্যন্ত: বছরে ৫,০০০ টাকা
  • ১৬৫ সিসির বেশি হলে: বছরে ১০,০০০ টাকা

বিশেষ দ্রষ্টব্য: দেশের সাধারণ ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের যাতায়াত এবং রাইড শেয়ারিংয়ের সুবিধার্থে ১১০ সিসি পর্যন্ত কমিউটার বাইকগুলোকে করের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর।

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করের পরিমাণ (এলাকাভেদে)

সারা দেশে বর্তমানে অন্তত ৫০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে বলে ধারণা করা হয়। বিশাল এই খাতটিকে এবারই প্রথম আনুষ্ঠানিক করের আওতায় আনা হচ্ছে। অটোরিকশার ক্ষেত্রে কর নির্ধারণ করা হয়েছে চলাচলের এলাকা বা অঞ্চলের ওপর ভিত্তি করে:

  • সিটি করপোরেশন এলাকা: বছরে ৫,০০০ টাকা
  • পৌরসভা (Municipality) এলাকা: বছরে ২,০০০ টাকা
  • ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়: বছরে ১,০০০ টাকা

এই কর কীভাবে ও কখন দিতে হবে? (পদ্ধতি ও সমন্বয়)

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, এই কর কি প্রতি বছর আলাদাভাবে দিতে হবে নাকি একবারই দিতে হবে? নিয়মটি হলো:

১. আদায়ের সময়: সাধারণত মোটরসাইকেল বা অটোরিকশার নতুন রেজিস্ট্রেশন (নিবন্ধন) নেওয়ার সময় অথবা প্রতি বছর ফিটনেস টেস্ট ও ট্যাক্স টোকেন নবায়নের সময় বিআরটিএ (BRTA) বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এই কর পরিশোধ করতে হবে।

২. রিটার্নে সমন্বয়ের সুযোগ: এটি মূলত একটি অগ্রিম আয়কর (AIT)। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, যেসব বাইক বা অটোরিকশা মালিক বছর শেষে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (NBR) আয়কর রিটার্ন জমা দেন, তারা পরিশোধিত এই কর নিজেদের মূল আয়করের সাথে পুরোপুরি সমন্বয় (Adjust) করার সুযোগ পাবেন।

সাধারণ চালক ও মালিকদের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব

অর্থনীতিবিদদের মতে, যাদের উচ্চ সিসির প্রিমিয়াম বাইক কেনার সামর্থ্য রয়েছে, তাদের দেশের উন্নয়নে এই ন্যূনতম কর দেওয়ার সক্ষমতাও থাকা উচিত। তবে নিম্ন আয়ের চালক যারা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদের জন্য এলাকাভিত্তিক করের সঠিক প্রয়োগ ও সহজ পরিশোধ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

১. আমার বাইক ১০০ সিসির, আমাকে কি নতুন বাজেটে কর দিতে হবে?

না, আপনার বাইক যদি ১১০ সিসির নিচে বা ১০০ সিসির হয়, তবে আপনাকে কোনো অগ্রিম কর দিতে হবে না। ১১০ সিসি পর্যন্ত বাইক করমুক্ত রাখা হয়েছে।

২. ১২৫ সিসির বাইক কেনার সময় কত টাকা কর দিতে হবে?

১১১ থেকে ১২৫ সিসির বাইকের ক্ষেত্রে অগ্রিম করের প্রস্তাবিত পরিমাণ হলো ২,০০০ টাকা।

৩. ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কর কি চালককে দিতে হবে নাকি মালিককে?

আইন অনুযায়ী যানটির যিনি নিবন্ধিত মালিক, কর পরিশোধের দায়িত্ব তারই। তবে ভাড়ায় চালিত হলে এর পরোক্ষ প্রভাব ভাড়ার চুক্তির ওপর পড়তে পারে।

৪. আমি যদি আয়কর রিটার্ন জমা না দিই, তাহলেও কি এই কর দিতে হবে?

হ্যাঁ, রেজিস্ট্রেশন বা ফিটনেস নবায়নের সময় এই কর বাধ্যতামূলকভাবে অগ্রিম কেটে নেওয়া হবে। তবে আপনি যদি টিআইএন (TIN) ধারী হন এবং রিটার্ন জমা দেন, তবে পরবর্তীতে তা রিবেট বা সমন্বয় করতে পারবেন।

তথ্যসূত্র:

  • সোর্স: জাতীয় দৈনিকের বাজেট পর্যালোচনা প্রতিবেদন (মে ২০২৬), অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআর-এর প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ বাজেট রূপরেখা।
  • সর্বশেষ আপডেট: ১৩ মে, ২০২৬।

Leave a Comment

Scroll to Top