২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে বিশ্ব রাজনীতি এক অভূতপূর্ব উত্তেজনার সাক্ষী হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের ঘোষণা এবং ইউরোপীয় মিত্রদের পাল্টা অবস্থান এখন টক অফ দ্য টাউন। কেন হঠাৎ বরফে ঢাকা এই দ্বীপটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে এত শোরগোল? জেনে নিন সর্বশেষ পরিস্থিতি।
এক নজরে বর্তমান সংকট
- ট্রাম্পের ঘোষণা: ৩ জানুয়ারি ২০২৬-এ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সশরীরে আটকের পর ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, গ্রিনল্যান্ড দখল করা এখন আমেরিকার “জাতীয় নিরাপত্তা অগ্রাধিকার”।
- হোয়াইট হাউসের অবস্থান: ৬ জানুয়ারি প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানান, গ্রিনল্যান্ড দখলে প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহার করা একটি “খোলা বিকল্প” (Always an option)।
- ইউরোপের বর্ম: ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড, স্পেন ও যুক্তরাজ্য ঐক্যবদ্ধভাবে এই দাবির বিরোধিতা করে ডেনমার্কের পাশে দাঁড়িয়েছে।
- মূল লক্ষ্য: উত্তর মেরুর বিরল খনিজ সম্পদ (Rare Earth) এবং নতুন বাণিজ্যিক নৌ-পথ নিয়ন্ত্রণ।
ভেনেজুয়েলা কান্ডের পর ট্রাম্পের ‘গ্রিনল্যান্ড চাই-ই চাই’
গত ৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর ‘অপারেশন অ্যাবসোলুট রিজলভ’-এর মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার মাদুরোকে গ্রেফতার করা হয়। এই অভাবনীয় সামরিক সাফল্যের ঠিক পরদিনই ট্রাম্প আবারও গ্রিনল্যান্ডের দাবি সামনে আনেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আমাদের গ্রিনল্যান্ড খুব বেশি প্রয়োজন। এটি এখন কেবল জমি নয়, একটি কৌশলগত ব্যাপার।”
হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ স্টিফেন মিলার আরও এক ধাপ এগিয়ে মন্তব্য করেছেন যে, “কোনো আন্তর্জাতিক আইন বা কূটনৈতিক শিষ্টাচার আমেরিকার জাতীয় স্বার্থের চেয়ে বড় হতে পারে না।”
কেন ইউরোপের ৬ দেশ একাট্টা?
সাধারণত ন্যাটোর (NATO) অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে নানা মতভেদ থাকলেও গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তারা এখন ইস্পাত কঠিন ঐক্য প্রদর্শন করছে। ৭ জানুয়ারি ২০২৬-এ ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড, স্পেন ও যুক্তরাজ্যের নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন:
“গ্রিনল্যান্ড কেবল তার জনগণের। এর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার একমাত্র ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের। যেকোনো বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।”
ডেনিশ প্রধানমন্ত্রী মেত্তে ফ্রেদেরিকসেন সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, গ্রিনল্যান্ডে কোনো মার্কিন আক্রমণ হলে তা হবে ন্যাটোর আনুষ্ঠানিক মৃত্যু।
ট্রাম্পের হঠাৎ এই আগ্রাসনের কারণ কী?
২০২৬ সালের শুরুতে ভেনেজুয়েলায় সফল মার্কিন সামরিক অভিযানের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন। মাদুরোকে গ্রেফতারের ঠিক পরেই তিনি ঘোষণা করেন যে, গ্রিনল্যান্ড দখল করা এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য “জাতীয় নিরাপত্তা অগ্রাধিকার”।
ট্রাম্পের যুক্তি হলো:
- খনিজ সম্পদ: গ্রিনল্যান্ডে থাকা বিপুল পরিমাণ লিথিয়াম ও বিরল মৃত্তিকা মৌলের (Rare Earth Elements) ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
- আর্কটিক নিরাপত্তা: বরফ গলে যাওয়ায় আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব ঠেকাতে সেখানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি স্থায়ী করা।
- নতুন নৌ-পথ: উত্তর মেরু দিয়ে ভবিষ্যতে তৈরি হওয়া নতুন বাণিজ্য পথের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া।
কেন ইউরোপের ৬ দেশ একাট্টা হয়ে বর্ম গড়েছে?
ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড, স্পেন এবং যুক্তরাজ্য এই ৬টি দেশ ডেনমার্কের পাশে দাঁড়িয়ে একটি যৌথ বিবৃতি জারি করেছে। তাদের একাট্টা হওয়ার পেছনে মূল কারণগুলো হলো:
ন্যাটোর (NATO) অস্তিত্ব রক্ষা
ডেনমার্ক ন্যাটোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য দেশ। ইউরোপীয় দেশগুলো মনে করে, যদি যুক্তরাষ্ট্র কোনো মিত্র দেশের ভূখণ্ড দখলের হুমকি দেয় বা সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে, তবে ন্যাটো জোটের আর কোনো ভিত্তি থাকবে না। ডেনিশ প্রধানমন্ত্রী মেত্তে ফ্রেদেরিকসেন স্পষ্টভাবে বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো ন্যাটো মিত্রের ওপর আক্রমণ চালায়, তবে সব নিরাপত্তা চুক্তি অর্থহীন হয়ে পড়বে।”
সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন
ইউরোপীয় নেতারা মনে করেন, কোনো স্বাধীন বা স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ড জোর করে দখল করা একবিংশ শতাব্দীতে অগ্রহণযোগ্য। এটি আন্তর্জাতিক সীমানা এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতার নীতির পরিপন্থী। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলো একে “সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব” হিসেবে দেখছে।
নিরাপত্তার ঝুঁকি ও রাশিয়ার প্রভাব
ইউরোপীয় নেতারা মনে করেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে সংঘাত শুরু হলে সেই সুযোগে রাশিয়া ও চীন ওই অঞ্চলে আরও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এটি ইউরোপের সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
ভেনেজুয়েলা পরবর্তী আতঙ্ক
ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের সামরিক হস্তক্ষেপ সফল হওয়ায় ইউরোপের দেশগুলো আশঙ্কা করছে যে, ট্রাম্প এখন আন্তর্জাতিক আইন বা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের তোয়াক্কা করবেন না। তাই তারা শুরুতেই একটি “রেড লাইন” টেনে দিতে চায়।
বর্তমান পরিস্থিতি কী?
৭ জানুয়ারি ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপের এই ৬টি দেশ ন্যাটোর ভেতরেই একটি শক্তিশালী ব্লক তৈরি করেছে যারা ডেনমার্ককে প্রয়োজনে সামরিক বা কূটনৈতিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত। অন্যদিকে, হোয়াইট হাউস এখনও নমনীয় হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না।
ইউরোপের ৬ দেশের মূল দাবি:
- গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কেবল সেখানকার জনগণ ও ডেনমার্কের।
- আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা সম্মিলিতভাবে ন্যাটোর মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে, একতরফা দখলদারিত্বের মাধ্যমে নয়।
সাধারণ কিছু জিজ্ঞাসা
ট্রাম্প কি আসলেও গ্রিনল্যান্ড দখল করতে পারবেন?
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো স্বাধীন ভূখণ্ড জোর করে দখল করা অবৈধ। তবে ট্রাম্প প্রশাসন ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র দোহাই দিয়ে কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল নিচ্ছে।9
ডেনমার্কের অবস্থান কী?
ডেনমার্ক এবং গ্রিনল্যান্ডের স্থানীয় সরকার বারবার বলছে, “গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়।” তারা মার্কিন হুমকির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এই সংকটের ফলে ন্যাটোর কী হবে?
যদি যুক্তরাষ্ট্র কোনো মিত্র দেশের ভূখণ্ড দখলের চেষ্টা করে, তবে ন্যাটোর ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ইউরোপীয় দেশগুলো পাল্টা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে, যা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
শেষকথা
২০২৬ সালের এই গ্রিনল্যান্ড সংকট প্রমাণ করছে যে, বর্তমান বিশ্বে পেশিশক্তি আর কূটনীতি একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। ইউরোপের ৬ দেশের ঐক্য কি পারবে ট্রাম্পের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে থামাতে? নাকি উত্তর মেরুর এই বরফ শীতল দ্বীপটি বিশ্ব রাজনীতির উত্তাপে গলে যাবে?
সোর্স: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, বিবিসি ওয়ার্ল্ড, আল-জাজিরা এবং হোয়াইট হাউস প্রেস রিলিজ।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”

