কেন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি দমানো আমেরিকা ও ইসরায়েলের জন্য অসম্ভব?

কেন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি দমানো আমেরিকা ও ইসরায়েলের জন্য অসম্ভব

আমেরিকা ও ইসরায়েল হাজার হাজার টন বোমা হামলা করে ইরানের উপরিভাগের কিছু ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা ধ্বংস করলেও তাদের মূল সামরিক শক্তি দমানো অসম্ভব হওয়ার প্রধান কারণ হলো “আন্ডারগ্রাউন্ড মিসাইল সিটি” এবং “মোবাইল লঞ্চার”। ইরানের মূল অস্ত্রভাণ্ডার পারস্যের মাটির অনেক গভীরে সুরক্ষিত, যা ধ্বংস করা মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের জন্যও অত্যন্ত কঠিন। এছাড়া, পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে রাখা অসংখ্য মোবাইল লঞ্চারের সঠিক সংখ্যা ও অবস্থান অজানা থাকায় ইরান খুব সহজেই তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা সচল রেখেছে।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কেন আলোচনার কেন্দ্রে?

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ পঞ্চম সপ্তাহে গড়িয়েছে। এই যুদ্ধে আন্তর্জাতিক মহল থেকে শুরু করে সামরিক বিশেষজ্ঞদের নজর কেড়েছে ইরানের শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো। যুদ্ধের ময়দানে এগুলো মার্কিন ও ইসরাইল বাহিনীর জন্য বড় ধরনের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ইরান প্রায় ২০০০ মাইল দূরে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ডিয়েগো গার্সিয়াতেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।

আমেরিকা ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের কী ক্ষতি হয়েছে?

যুদ্ধের প্রথম চার সপ্তাহে ইরানের সামরিক কাঠামো দুর্বল করার জন্য আমেরিকা ও ইসরায়েল একের পর এক ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্র ও আন্তর্জাতিক সূত্রমতে ইরানের যেসব স্থাপনার ক্ষতি হয়েছে:

  • প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র ধ্বংস: ইরানের অন্তত ৪টি প্রধান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র এবং ২৯টি উৎক্ষেপণ ঘাঁটিতে তাণ্ডব চালানো হয়েছে ।
  • খজির কমপ্লেক্স: তেহরানের পূর্বদিকে অবস্থিত এই কমপ্লেক্সের অন্তত ৮৮টি স্থাপনা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।
  • শাহরুদ উৎপাদন কেন্দ্র: এই কেন্দ্রে ধ্বংস হয়েছে আরও ২৮টি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
  • জ্বালানি কারখানা: প্রপেলার এবং জ্বালানি উৎপাদনের কারখানাগুলো ধ্বংস হওয়ায় নতুন করে স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা সাময়িকভাবে স্থবির হয়েছে বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

যে কারণে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি ধ্বংস করা যাচ্ছে না

এত ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পরও ইরান দুর্বল হয়নি এবং তারা নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে, যার মানে তাদের রসদ ফুরিয়ে যায়নি। এর পেছনে ৩টি প্রধান কৌশলগত কারণ রয়েছে:

মাটির গভীরে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড মিসাইল সিটি’

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হলো ইরানের আন্ডারগ্রাউন্ড মিসাইল সিটি। ইমাম আলী এবং খরগু নামক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির সুড়ঙ্গপথগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলেও মাটির গভীরে থাকা মূল অস্ত্রভাণ্ডার এখনো অক্ষত রয়েছে। সাময়িকভাবে সুড়ঙ্গপথ বন্ধ করা গেলেও ইরান দ্রুত তা পুনরায় খনন করে সচল করার সক্ষমতা রাখে।

মোবাইল লঞ্চারের অভিনব ব্যবহার

ইরানের সামরিক কৌশলের মূল শক্তি হলো তাদের ‘মোবাইল লঞ্চার’ বা ভ্রাম্যমাণ উৎক্ষেপণ যান। এই লঞ্চারগুলোর সঠিক সংখ্যা কত, তা খোদ পেন্টাগনের কাছেও অজানা। এগুলো পাহাড়ের আড়ালে বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় লুকিয়ে রাখা হয়, যার ফলে আকাশ থেকে এগুলো নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।

দ্রুত পুনর্গঠন সক্ষমতা

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বড় ধরনের হামলার পরও ইরান খুব দ্রুত তাদের উৎপাদন লাইন পুনর্গঠন করতে পারে। পারস্যের মাটির গভীরে যে সামরিক জাল ইরান বিছিয়ে রেখেছে, তা ছিঁড়ে ফেলা কেবল প্রযুক্তির জোরে সম্ভব নয়।

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মত ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি

সামরিক বিশেষজ্ঞ নিকোল গ্রাজেভসকির মতে, যতক্ষণ ইরানি শাসন ব্যবস্থা টিকে আছে, ততক্ষণ তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কৌশলে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসবে না। কারণ এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোই হলো বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তাদের চূড়ান্ত প্রতিরোধ দেওয়াল।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

ইরানের আন্ডারগ্রাউন্ড মিসাইল সিটি কী?

এটি হলো মাটির অনেক গভীরে তৈরি করা ইরানের গোপন ও সুরক্ষিত সামরিক ঘাঁটি (যেমন: ইমাম আলী এবং খরগু ঘাঁটি), যেখানে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও অস্ত্র মজুত রাখা হয়। মাটির গভীরে হওয়ায় সাধারণ বিমান হামলায় এগুলো ধ্বংস করা যায় না।

আমেরিকা কেন ইরানের মোবাইল লঞ্চার ধ্বংস করতে পারছে না?

ইরানের মোবাইল লঞ্চারগুলো আকারে ছোট এবং এগুলো পাহাড়ের গুহায় বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় লুকিয়ে রাখা হয়। এর সঠিক সংখ্যা পেন্টাগনের জানা নেই এবং স্যাটেলাইট দিয়েও এগুলো সহজে শনাক্ত করা যায় না।

ইরান কত দূরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারে?

সাম্প্রতিক সময়ে ইরান প্রায় ২০০০ মাইল দূরে অবস্থিত ডিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে প্রমাণ করেছে যে তাদের দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বহুদূর পর্যন্ত নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম।

ইসরায়েলের হামলায় কি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি বন্ধ হয়ে গেছে?

না। আমেরিকা ও ইসরায়েলের হামলায় কিছু কারখানা ও জ্বালানি স্থাপনা ধ্বংস হওয়ায় উৎপাদন সাময়িকভাবে ব্যাহত হলেও, মাটির গভীরে থাকা মূল মজুত অক্ষত রয়েছে এবং তারা দ্রুত কারখানা পুনর্গঠন করছে।

Leave a Comment

Scroll to Top