বর্তমান যুদ্ধ কি কিয়ামতের লক্ষণ? কোরআন-হাদিস কী বলে?

বর্তমান যুদ্ধ কি কিয়ামতের লক্ষণ কোরআন-হাদিস কী বলে

বিশ্বের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি, যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং বিভিন্ন সংকট দেখে অনেকেই প্রশ্ন করছেন, “বর্তমান যুদ্ধ কি কিয়ামতের লক্ষণ?” কোরআন এবং হাদিসে কিয়ামতের অনেকগুলো আলামতের কথা বলা হয়েছে। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা কোরআন-হাদিসের আলোকে জানবো কিয়ামত কতটা সন্নিকটে এবং এর প্রধান লক্ষণ বা আলামতগুলো কী কী।

বর্তমান যুদ্ধ কি কিয়ামতের লক্ষণ?

হ্যাঁ, বিশ্বে অন্যায়, অবিচার, যুদ্ধ-বিগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়া কিয়ামতের ছোট আলামতগুলোর অন্তর্ভুক্ত। কোরআন ও হাদিস মতে, কিয়ামত অত্যন্ত সন্নিকটে, তবে এর নির্দিষ্ট দিনক্ষণ শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন। পৃথিবীতে ঘন ঘন যুদ্ধ, অশান্তি এবং সময়ের বরকত কমে যাওয়া কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

কিয়ামত কতটা সন্নিকটে? কোরআনের ঘোষণা

কোরআন মাজিদে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন প্রায় সাড়ে ১৪০০ বছর আগেই ঘোষণা করেছেন যে কিয়ামত নিকটবর্তী।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

“কিয়ামত নিকটবর্তী হয়েছে এবং চাঁদ বিদীর্ণ হয়েছে।”

নবী করিম (সা.)-এর মোজেজায় চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ঘটনাটি কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার একটি বড় প্রমাণ। তাছাড়া, নবীজি (সা.) তাঁর নিজের দুই আঙুল পাশাপাশি রেখে বলেছেন, “আমার আবির্ভাব এবং কিয়ামত এই দুই আঙুলের মতো পাশাপাশি অবস্থান করছে।” অর্থাৎ, তাঁর পরে পৃথিবীতে আর কোনো নতুন নবী বা রাসূল আসবেন না, এরপর সরাসরি কিয়ামত সংঘটিত হবে।

কিয়ামতের দিনক্ষণ কি কেউ জানে?

অনেকে বিভিন্ন যুদ্ধ বা ঘটনা দেখলেই কিয়ামতের সাল বা দিনক্ষণ গণনা শুরু করেন। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভুল। নবী করিম (সা.)-কে যখন কিয়ামত কবে হবে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন, “যাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে তিনি প্রশ্নকর্তার চেয়ে বেশি জানেন না।”

কিয়ামতের সঠিক সময় বা এলেম একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছেই রয়েছে। এটি ২০০ বছর পর হতে পারে, আবার ২০০০ বছর পরও হতে পারে।

কিয়ামতের আলামত কয় প্রকার ও কী কী?

কিয়ামতের আলামত বা লক্ষণগুলোকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়:

১. আলামতে কুবরা (কিয়ামতের বড় আলামত)

এগুলো হলো কিয়ামতের ঠিক কাছাকাছি সময়ে বা শেষ মুহূর্তে প্রকাশ পাবে। হাদিসে মোট ১০টি বড় আলামতের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • সূর্য পশ্চিম দিক থেকে ওঠা: যেদিন সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠবে, সেদিন থেকে তওবার দরজা বন্ধ হয়ে যাবে।
  • বড় ধরনের ভূমিধস: পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে তিনটি বড় ভূমিধস হবে।
  • ইয়াজুজ-মাজুজের প্রকাশ: পৃথিবীতে ইয়াজুজ-মাজুজ আত্মপ্রকাশ করবে।
  • দাব্বাতুল আরদ: মাটি থেকে একটি অদ্ভুত প্রাণী বের হবে যা মানুষের সাথে কথা বলবে।

২. আলামতে সুগরা (কিয়ামতের ছোট আলামত)

ছোট আলামতগুলো কিয়ামতের অনেক আগে থেকেই প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। ডক্টর মোহাম্মদ আল আরিফীর গবেষণা অনুযায়ী কিয়ামতের প্রায় ১৩১টি ছোট আলামত রয়েছে। যেমন:

  • নবীজি (সা.) এর আবির্ভাব: তাঁর নবী হিসেবে আগমনই কিয়ামতের একটি বড় ছোট আলামত।
  • সময়ের বরকত কমে যাওয়া: বছর মাসের মতো, মাস সপ্তাহের মতো এবং দিন ঘণ্টার মতো দ্রুত পার হয়ে যাবে।
  • রাখালদের অট্টালিকার মালিক হওয়া: সাধারণ ও দরিদ্র মানুষ রাতারাতি বড় বড় অট্টালিকা বা সম্পদের মালিক হবে।
  • পিতা-মাতার অবাধ্যতা: সন্তানেরা তাদের মায়ের সাথে দাসীর মতো বা কাজের লোকের মতো অসম্মানজনক আচরণ করবে।

কিয়ামতের প্রস্তুতি: আমাদের কী করা উচিত?

এক সাহাবী নবীজি (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “কিয়ামত কবে হবে?”

নবীজি (সা.) উত্তরে তাকে পাল্টা প্রশ্ন করেন, “কিয়ামতের জন্য তোমার প্রস্তুতি কী?”

আসলে কিয়ামত কবে হবে, তার হিসাব মেলানোর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আমাদের নিজেদের আমল ও প্রস্তুতি। মানুষের মৃত্যুর মাধ্যমেই তার ব্যক্তিগত কিয়ামত শুরু হয়ে যায়। তাই আমাদের উচিত সব সময় আখিরাতের প্রস্তুতি গ্রহণ করা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা.) দেখানো পথে চলা।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

কিয়ামতের মোট কতটি আলামত রয়েছে?

ইসলামিক স্কলারদের মতে, কিয়ামতের প্রায় ১৪১টি আলামত রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি হলো বড় আলামত এবং বাকি ১৩১টি হলো ছোট আলামত।

বর্তমান ফিলিস্তিন বা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কি কিয়ামতের আলামত?

ঘন ঘন যুদ্ধ-বিগ্রহ, রক্তপাত এবং বিশ্বে অশান্তি বৃদ্ধি পাওয়া কিয়ামতের ছোট আলামতের অন্তর্ভুক্ত। তবে নির্দিষ্ট কোনো যুদ্ধকেই সরাসরি কিয়ামত শুরুর চূড়ান্ত সংকেত বলা যাবে না।

সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠলে কী হবে?

সূর্য পশ্চিম দিক থেকে ওঠার পর কিয়ামতের একেবারে চূড়ান্ত সময় শুরু হবে। তখন থেকে আল্লাহ তাআলা আর কারও তওবা কবুল করবেন না।

আমার ব্যক্তিগত কিয়ামত কখন শুরু হবে?

প্রত্যেকটি মানুষের মৃত্যুর সাথে সাথেই তার ব্যক্তিগত কিয়ামত বা আখিরাতের জীবন শুরু হয়ে যায়। তাই সামগ্রিক কিয়ামতের আগে আমাদের নিজেদের মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত।

তথ্যের উৎস: শায়খ আহমাদুল্লাহর আলোচনা এবং কোরআন-হাদিস

Leave a Comment

Scroll to Top