বর্তমানে ইরানে বিক্ষোভের মূল কারণ হলো দেশটির মুদ্রার (রিয়াল) নজিরবিহীন অবমূল্যায়ন, ৫০ শতাংশের বেশি মুদ্রাস্ফীতি এবং সরকারের কঠোর দমন-পীড়ন। ১ মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের দাম ১৪ লক্ষে গিয়ে ঠেকায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা শেষ হয়ে গেছে। এছাড়া আঞ্চলিক মিত্রদের পতন এবং সরকারের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এই বিক্ষোভকে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ দিয়েছে।
অর্থনৈতিক ধস: ১ ডলারে কেন ১৪ লাখ রিয়াল?
ইরানের বর্তমান অস্থিরতার সবচেয়ে বড় কারণ তাদের অর্থনীতি। গত কয়েক বছরে ইরানি মুদ্রার যে পতন হয়েছে তা আধুনিক ইতিহাসে বিরল।
- রেকর্ড দরপতন: কয়েক বছর আগে ১ ডলারে ৪২,০০০ রিয়াল পাওয়া যেত, যা ২০২৫ সালের শেষে ১৪ লক্ষে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
- তেল বিক্রিতে ধস: ইরানের আয়ের প্রধান উৎস তেল। কিন্তু বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে যাওয়া এবং প্রধান ক্রেতা চীনে চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় দেশটির কোষাগার এখন শূন্য।
- ব্যবসায়ীদের ব্ল্যাকমেইল: বড় বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো ডলার রিয়ালে রূপান্তর করতে অস্বীকৃতি জানানোয় মুদ্রাস্ফীতি ৫০% ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের দোকানদাররা প্রথম রাস্তায় নামতে বাধ্য হন।
এবারের আন্দোলন কেন অতীতের চেয়ে আলাদা?
ইরানে এর আগেও ২০১০, ২০১৯ বা ২০২২ (মাহসা আমিনি আন্দোলন) সালে বিক্ষোভ হয়েছে। তবে ২০২৬-এর এই আন্দোলন তিনটি কারণে আলাদা:
- পরিচয় প্রকাশ: আগে বিক্ষোভকারীরা ভয়ে মুখ ঢাকতেন। এবার তারা সরাসরি নিজেদের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করে সরকার পতনের ডাক দিচ্ছেন।
- সরাসরি সংঘাত: গ্রাম থেকে শহর সবখানেই নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সাধারণ মানুষের সরাসরি সংঘর্ষ হচ্ছে।
- আন্দোলনের লক্ষ্য: এবারের বিক্ষোভ কেবল অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য নয়, বরং সরাসরি আয়াতুল্লাহ খামেনীর নেতৃত্বাধীন শাসন ব্যবস্থার অবসানের জন্য।
আঞ্চলিক শক্তির পতন ও খামেনীর একাকীত্ব
ইরান এতদিন মধ্যপ্রাচ্যে তার ‘প্রক্সি নেটওয়ার্ক’ দিয়ে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই দেয়াল ধসে পড়েছে:
- বাশার আল আসাদের পতন: ইরানের সবচেয়ে বড় মিত্র সিরিয়ার শাসক বাশার আল আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় ইরান একা হয়ে পড়েছে।
- সামরিক ব্যর্থতা: ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা ঠেকাতে ইরানের সামরিক বাহিনী বা রিভল্যুশনারি গার্ডের ব্যর্থতা খোদ প্রশাসনের ভেতরেই ফাটল ধরিয়েছে।
বিশেষ নোট: রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অর্থনীতি ২০২৬ সালে আরও ২.৮ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে, যা বিক্ষোভের আগুন আরও উসকে দেবে।
প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল
ইরানের ক্ষমতা কাঠামোর ভেতরে এখন চরম বিভাজন স্পষ্ট। একদিকে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনী বিক্ষোভ দমনে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন, অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জনগণের কথা শোনার ওপর জোর দিচ্ছেন। নেতৃত্বের এই দ্বিধাবিভক্তি আন্দোলনকারীদের আরও সাহস জোগাচ্ছে।
সাধারণ মানুষের জিজ্ঞাস্য
ইরানে বর্তমানে কতজন বিক্ষোভকারী মারা গেছেন?
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে চলা এই আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অন্তত ৪৫ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান কী?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি বিক্ষোভকারীদের সমর্থন দিয়েছেন এবং হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো সময় সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
ইন্টারনেট কি বন্ধ আছে?
হ্যাঁ, বিক্ষোভ দমনে ব্যর্থ হয়ে ইরান সরকার দেশের অনেক এলাকায় ইন্টারনেট সেবা সীমিত বা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে।
ইরান কি বদলাবে?
ইতিহাস বলছে, ইরান সরকার প্রতিবারই সহিংসতা দিয়ে আন্দোলন দমানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ২০২৬ সালের বাস্তবতা ভিন্ন। অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব এবং আঞ্চলিক মিত্রদের হারানো ইরান সরকারকে এখন খাদের কিনারে নিয়ে এসেছে। এটি কি কেবল একটি বিক্ষোভ, নাকি নতুন কোনো বিপ্লবের শুরু তা সময়ই বলে দেবে।
তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ও ভিডিও বিশ্লেষণ।
