জুলাই সনদ (July Charter) হলো ২০২৫ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবিত একটি সংস্কার দলিল। এতে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে, যার মধ্যে ৪৭টি সাংবিধানিক পরিবর্তন এবং ৩৭টি আইনি বা নির্বাহী আদেশে বাস্তবায়িত হবে। আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দিনই এই সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ভোটাররা শুধুমাত্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে এই সনদ গ্রহণ বা বর্জন করবেন। ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে সংবিধানে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য এবং ন্যায়পাল নিয়োগসহ ব্যাপক পরিবর্তন আসবে।
নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের পথে বাংলাদেশ
আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঐতিহাসিক গণভোট। এই গণভোটের মূল বিষয়বস্তু হলো “জুলাই সনদ”। ভোটারদের মনে প্রশ্ন জাগছে, যদি আমি ‘হ্যাঁ’ ভোট দেই, তবে দেশের সংবিধানে ঠিক কী কী পরিবর্তন আসবে?
ডিবিসি নিউজের প্রতিবেদনের আলোকে এই আর্টিকেলে আমরা জুলাই সনদের চুম্বক অংশ এবং প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো সহজ ভাষায় তুলে ধরছি।
জুলাই সনদের প্রধান সাংবিধানিক সংস্কার
জুলাই সনদে মোট ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে ৪৭টি সরাসরি সংবিধানের সাথে সম্পর্কিত। উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. ভাষা ও জাতীয় পরিচয়
- বর্তমান: সংবিধানে বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষার স্বীকৃতি নেই। নাগরিকরা ‘বাঙালি’ হিসেবে পরিচিত।
- প্রস্তাবিত (জুলাই সনদ): রাষ্ট্রভাষা বাংলা থাকবে, তবে অন্যান্য মাতৃভাষারও স্বীকৃতি দেওয়া হবে। নাগরিকদের পরিচয় হবে ‘বাংলাদেশী’।
২. প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও মেয়াদ
- বর্তমান: প্রধানমন্ত্রীর পদের কোনো মেয়াদ নেই এবং তিনি একাধিক পদে থাকতে পারেন।
- প্রস্তাবিত: একজন ব্যক্তি ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। প্রধানমন্ত্রী একইসাথে দলের প্রধান বা অন্য কোনো লাভজনক পদে থাকতে পারবেন না।
৩. সংসদ ও সরকার ব্যবস্থা
- বর্তমান: এককক্ষ বিশিষ্ট সংসদ। সংবিধান সংশোধনে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট লাগে।
- প্রস্তাবিত: দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ (উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ) গঠন করা হবে। সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ (৮, ৪৮, ৫৬, ১৪২) এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য গণভোট বাধ্যতামূলক হবে।
৪. রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি
- বর্তমান: রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কাজ করেন এবং সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন।
- প্রস্তাবিত: রাষ্ট্রপতি উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সদস্যদের গোপন ভোটে নির্বাচিত হবেন। তিনি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ দিতে পারবেন। এছাড়া অপরাধীকে ক্ষমা করতে হলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সম্মতি লাগবে।
৫. মৌলিক অধিকার ও জরুরি অবস্থা
- বর্তমান: জরুরি অবস্থায় মৌলিক অধিকার স্থগিত থাকে।
- প্রস্তাবিত: জরুরি অবস্থা জারির জন্য মন্ত্রিসভার অনুমোদন লাগবে এবং বিরোধীদলীয় নেতার উপস্থিতি থাকতে হবে। জরুরি অবস্থাতেও মৌলিক অধিকার খর্ব করা যাবে না। ইন্টারনেটের অধিকার এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা মৌলিক অধিকারে যুক্ত হবে।
৬. বিচার বিভাগ ও ন্যায়পাল
- বর্তমান: রাষ্ট্রপতি যে কাউকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে পারেন। ন্যায়পাল নিয়োগের বিধান থাকলেও তা কার্যকর নেই।
- প্রস্তাবিত: প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে হবে আপিল বিভাগ থেকে। স্পিকারের নেতৃত্বে ৭ সদস্যের কমিটির মাধ্যমে ন্যায়পাল (Ombudsman) নিয়োগ দিতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের জন্য আলাদা সচিবালয় থাকবে।
৭. ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার
- বর্তমান: দলের বিপক্ষে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়।
- প্রস্তাবিত: শুধুমাত্র বাজেট ও অনাস্থা প্রস্তাব ছাড়া অন্য যেকোনো বিষয়ে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন।
নির্বাহী আদেশে বাস্তবায়নযোগ্য ৩৭টি সংস্কার
সংবিধানের বাইরেও ৩৭টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে যা আইন বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে:
- প্রশাসনিক বিভাগ: কুমিল্লা ও ফরিদপুরকে নতুন দুটি সাংগঠনিক বিভাগ ঘোষণা করা হবে।
- কমিশন গঠন: স্বাধীন ও স্থায়ী জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন, পুলিশ কমিশন, এবং স্বাস্থ্য কমিশন গঠন করা হবে।
- আন্তর্জাতিক চুক্তি: বিদেশের সাথে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত যেকোনো চুক্তি করতে হলে সংসদের উভয় কক্ষের অনুমোদন লাগবে।
গণভোটে ‘না’ জয়ী হলে কী হবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি গণভোটে ‘না’ জয়ী হয়, তবে দেশ আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে (Back to Square One)। অর্থাৎ, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে যে সংবিধান ও ব্যবস্থা ছিল, সেটাই বহাল থাকবে। সংস্কারের উদ্যোগগুলো বাতিল হয়ে যাবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
প্রশ্ন ১: জুলাই সনদে কি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরছে?
উত্তর: হ্যাঁ, জুলাই সনদে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকার ও বিরোধী দলের মতামতের ভিত্তিতে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ হবে।
প্রশ্ন ২: গণভোট কবে অনুষ্ঠিত হবে?
উত্তর: আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বৃহস্পতিবার) জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
প্রশ্ন ৩: জুলাই সনদে রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে কী বলা হয়েছে?
উত্তর: জুলাই সনদে রাষ্ট্রধর্ম বা ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে সকল সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। মূলনীতি হিসেবে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার’ প্রাধান্য পাবে।
শেষকথা
জুলাই সনদ বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি বড় বাঁকবদল হতে পারে। এটি কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের একটি রূপরেখা। ভোটারদের একটি সিল নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ কি পুরোনো পথে হাঁটবে, নাকি নতুন এক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে।
তথ্যসূত্র (Sources):
- DBC NEWS (Report on July Charter)
- জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংস্কার কমিশন রিপোর্ট
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”
