হিজরি নববর্ষ ২০২৬ কবে? হিজরি নববর্ষ ১৪৪৮ (১ মুহররম ১৪৪৮ হিজরি) মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬ তারিখে পালিত হওয়ার কথা। তবে চাঁদ দেখার উপর নির্ভর করে এটি ১৫ বা ১৭ জুনও হতে পারে। বাংলাদেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশন চাঁদ দেখার পর আনুষ্ঠানিক তারিখ ঘোষণা করবে। এ বছর আশুরা পালিত হবে বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬ তারিখে (সম্ভাব্য)।
হিজরি নববর্ষ ২০২৬ কত তারিখে?
অনেকেই জানতে চান — এ বছর হিজরি নববর্ষ ঠিক কোন তারিখে পড়েছে। সহজ কথায়:
- হিজরি সন: ১৪৪৮
- সম্ভাব্য তারিখ: ১৬ জুন ২০২৬ (মঙ্গলবার)
- সৌদি আরবে: ১৫ জুন ২০২৬ (সোমবার সন্ধ্যা থেকে)
- বাংলাদেশে: চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ১৬ বা ১৭ জুন
- আশুরা (১০ মুহররম): ২৫ জুন ২০২৬ (সম্ভাব্য)
⚠️ গুরুত্বপূর্ণ নোট: হিজরি ক্যালেন্ডার চান্দ্র পঞ্জিকা অনুযায়ী চলে, তাই চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে তারিখ এক দিন এগিয়ে বা পিছিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাঁদ দেখা কমিটির ঘোষণাই চূড়ান্ত।
হিজরি নববর্ষ কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
হিজরি নববর্ষ হলো ইসলামিক চান্দ্র পঞ্জিকার প্রথম দিন — অর্থাৎ মুহররম মাসের ১ তারিখ। এটি শুধু একটি নতুন বছরের শুরু নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর জন্য আত্মিক পুনর্জাগরণ ও আত্মসমালোচনার একটি বিশেষ মুহূর্ত।
ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে এই দিনটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ:
- এটি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের (৬২২ খ্রিস্টাব্দ) ঐতিহাসিক স্মৃতিকে ধারণ করে।
- এই মাসটিকে পবিত্র কুরআনে “শাহরুল্লাহ” বা আল্লাহর মাস বলা হয়েছে।
- মুহররম ইসলামের চারটি পবিত্র মাসের একটি।
- এ মাসে নফল রোজার বিশেষ ফজিলত রয়েছে।
হিজরি সনের ইতিহাস: কখন ও কীভাবে শুরু হয়েছিল?
হিজরি সনের সূচনা হয়েছিল ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনামলে। এর পেছনে একটি চমৎকার ঐতিহাসিক ঘটনা রয়েছে।
হিজরি সন প্রবর্তনের ঘটনা
হযরত আবু মুসা আশআরী (রা.) খলিফা উমর (রা.)-কে জানালেন যে, মদিনা থেকে পাঠানো চিঠিগুলোতে কোনো তারিখ না থাকায় প্রশাসনিক কাজে বড় সমস্যা হচ্ছে। এ অভিযোগ পেয়ে খলিফা উমর (রা.) একটি পরামর্শ সভা ডাকলেন এবং একটি ইসলামি পঞ্জিকা প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলেন।
পরামর্শে স্থির হলো যে, মহানবী (সা.)-এর মদিনায় হিজরতের বছর থেকেই গণনা শুরু হবে। সেই থেকে এটি “হিজরি সন” নামে পরিচিত।
হিজরি সনের বৈশিষ্ট্য
- হিজরি বছর সৌর বছরের চেয়ে প্রায় ১০-১১ দিন ছোট।
- তাই প্রতি বছর হিজরি নববর্ষ ইংরেজি ক্যালেন্ডারে ১০-১১ দিন করে এগিয়ে আসে।
- এ কারণে ২০২৬ সালে এটি জুনে পড়েছে।
- হিজরি বছরে ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিন থাকে।
- বর্তমানে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ হিজরি ১৪৪৭-১৪৪৮ সনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মুহররম মাসের ফজিলত ও গুরুত্ব
মুহররম মাস ইসলামে একটি বিশেষ মর্যাদার মাস। এই মাস সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রমজানের পরে সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মুহররমের রোজা।
মুহররমে যা করণীয়
নফল রোজা রাখুন: মুহররম মাসে যত বেশি সম্ভব নফল রোজা রাখা মুস্তাহাব। বিশেষত আশুরার দিন (১০ মুহররম) এবং তার আগের দিন (৯ মুহররম) রোজা রাখা সুন্নত।
আশুরার রোজা: আশুরার রোজার বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, এটি আগের এক বছরের গুনাহ মোচন করে দেয়।
বেশি বেশি তওবা ও ইস্তেগফার: নতুন হিজরি বছরের শুরুতে অতীতের গুনাহের জন্য তওবা করা এবং আগামী বছরের জন্য ভালো নিয়ত করা উচিত।
কুরআন তেলাওয়াত ও জিকির বাড়ানো: এই পবিত্র মাসে ইবাদত বৃদ্ধি করা বিশেষ সওয়াবের কাজ।
আশুরা ২০২৬: তারিখ ও তাৎপর্য
আশুরা হলো মুহররম মাসের ১০ তারিখ। ২০২৬ সালে আশুরা পালিত হবে ২৫ জুন ২০২৬ (বৃহস্পতিবার) তারিখে (চাঁদ দেখার উপর নির্ভরশীল)।
আশুরার ঐতিহাসিক গুরুত্ব
এই দিনে মুসলিম ইতিহাসে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে:
- হযরত মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।
- হযরত নূহ (আ.)-এর নৌকা তুর পর্বতে নোঙর করেছিল।
- ৬১ হিজরিতে কারবালার ময়দানে ইমাম হোসাইন (রা.) শহীদ হয়েছিলেন।
আশুরার রোজার নিয়ম
- ৯ ও ১০ মুহররম — দুইদিন রোজা রাখা সবচেয়ে উত্তম।
- শুধু ১০ মুহররম রাখলেও আদায় হবে।
- ১০ ও ১১ মুহররম রোজা রাখলেও জায়েজ।
হিজরি নববর্ষে কী করবেন, কী করবেন না
যা করবেন ✅
- নতুন বছরের শুরুতে আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।
- বিগত বছরের ভুল-ত্রুটির জন্য তওবা করুন।
- আগামী বছরের জন্য ইসলামিক জীবনযাপনের পরিকল্পনা করুন।
- মুহররম মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখুন।
- পরিবার ও বন্ধুদের সাথে হিজরি নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় করুন।
যা করবেন না ❌
- বাজি, আতশবাজি বা অনর্থক উৎসব পালন করবেন না।
- হিজরি নববর্ষ উপলক্ষে কোনো বিদআত চর্চা করবেন না।
- আশুরায় নিজেকে কষ্ট দেওয়া বা শোকানুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ইসলামসম্মত নয়।
হিজরি নববর্ষের দোয়া
নতুন বছর শুরুতে সাহাবায়ে কেরাম নিচের দোয়া পড়তেন:
“আল্লাহুম্মা আদখিলহু আলাইনা বিল-আমনি ওয়াল ঈমানি ওয়াস-সালামাতি ওয়াল-ইসলামি ওয়া রিদওয়ানিম মিনার-রহমানি ওয়া জিওয়ারিম মিনাশ-শাইতান।”
অর্থ: হে আল্লাহ! এই মাসটিকে আমাদের উপর নিরাপত্তা, ঈমান, শান্তি, ইসলাম এবং রহমানের সন্তুষ্টি এবং শয়তান থেকে আশ্রয় নিয়ে প্রবেশ করাও।
বাংলাদেশে হিজরি নববর্ষ কীভাবে পালিত হয়?
বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও হিজরি নববর্ষ সরকারি ছুটির দিন নয়। তবে ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বিভিন্ন মসজিদ ও ইসলামিক সংগঠন এ উপলক্ষে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে।
- মসজিদে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতের আয়োজন করা হয়।
- ইসলামিক টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার হয়।
- সামাজিক মিডিয়ায় শুভেচ্ছা বার্তা বিনিময় হয়।
- ধর্মীয় সংগঠনগুলো সেমিনার ও আলোচনা সভার আয়োজন করে।
হিজরি ও ইংরেজি সনের পার্থক্য
| বিষয় | হিজরি সন | ইংরেজি (গ্রেগরিয়ান) সন |
|---|---|---|
| ভিত্তি | চান্দ্র পঞ্জিকা | সৌর পঞ্জিকা |
| দিনসংখ্যা | ৩৫৪–৩৫৫ দিন | ৩৬৫–৩৬৬ দিন |
| মাসের শুরু | চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল | নির্দিষ্ট তারিখ |
| শুরুর ঘটনা | নবীজির হিজরত (৬২২ খ্রি.) | জুলিয়াস সিজারের ক্যালেন্ডার |
| বর্তমান সন (২০২৬) | ১৪৪৭–১৪৪৮ হিজরি | ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ |
আসন্ন হিজরি নববর্ষগুলোর সম্ভাব্য তারিখ
| হিজরি সন | ইংরেজি তারিখ (সম্ভাব্য) |
|---|---|
| ১৪৪৮ হিজরি | ১৬ জুন ২০২৬ |
| ১৪৪৯ হিজরি | ৫ জুন ২০২৭ |
| ১৪৫০ হিজরি | ২৬ মে ২০২৮ |
(প্রতি বছর প্রায় ১০-১১ দিন করে এগিয়ে আসে)
হিজরি নববর্ষের শুভেচ্ছা বাক্য — কীভাবে উইশ করবেন?
অনেকে জানতে চান হিজরি নববর্ষে কীভাবে শুভেচ্ছা জানাবেন। এখানে কিছু প্রচলিত শুভেচ্ছা বাক্য দেওয়া হলো:
- আরবিতে: “কুল্লু আমিন ওয়া আন্তুম বিখাইর” (প্রতিটি বছর আপনি ভালো থাকুন)
- বাংলায়: “পবিত্র হিজরি নববর্ষ মুবারক”
- ইংরেজিতে: “Happy Islamic New Year / Hijri New Year Mubarak”
প্রশ্নোত্তর
হিজরি নববর্ষ ২০২৬ বাংলাদেশে কত তারিখে?
সম্ভাব্যভাবে ১৬ জুন ২০২৬ (মঙ্গলবার)। তবে চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে ১৭ জুনও হতে পারে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ঘোষণা অনুযায়ী চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারিত হবে।
১ মুহররম ১৪৪৮ হিজরি কোন দিন?
মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬ (সম্ভাব্য)।
হিজরি নববর্ষ কি সরকারি ছুটির দিন?
বাংলাদেশে হিজরি নববর্ষ সরকারি ছুটির দিন নয়। তবে আশুরার দিন (১০ মুহররম) সরকারি ছুটি রয়েছে।
হিজরি নববর্ষ কেন প্রতি বছর তারিখ বদলায়?
কারণ হিজরি পঞ্জিকা চান্দ্র ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে এবং এটি গ্রেগরিয়ান (সৌর) ক্যালেন্ডারের চেয়ে প্রতি বছর ১০-১১ দিন ছোট। তাই প্রতি বছর ইংরেজি তারিখে হিজরি নববর্ষ এগিয়ে আসে।
মুহররম মাসে রোজা রাখলে কী ফজিলত?
হাদিস অনুযায়ী, রমজানের পরে সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ রোজা হলো মুহররম মাসের রোজা। বিশেষত আশুরার রোজা রাখলে আগের এক বছরের গুনাহ মাফ হয় বলে হাদিসে এসেছে।
হিজরি সন কে প্রবর্তন করেন?
হিজরি সন প্রবর্তন করেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)। মহানবী (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ঘটনাকে ভিত্তি করে এই পঞ্জিকা চালু হয়।
আশুরা ২০২৬ কত তারিখে?
সম্ভাব্যভাবে ২৫ জুন ২০২৬ (বৃহস্পতিবার)। এটিও চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল।
হিজরি নববর্ষ ও ইসলামিক নববর্ষ কি একই?
হ্যাঁ, একই। হিজরি নববর্ষ, ইসলামিক নববর্ষ, আরবি নববর্ষ — সবই ১ মুহররম থেকে শুরু হওয়া একই দিনকে বোঝায়।
শেষকথা
হিজরি নববর্ষ ২০২৬ (১ মুহররম ১৪৪৮) আমাদের সামনে নতুন একটি সুযোগ নিয়ে এসেছে — নিজেকে শুধরে নেওয়ার, আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার এবং ইসলামের পথে আরও দৃঢ়ভাবে চলার। এই পবিত্র মাসে বেশি বেশি ইবাদত করুন, নফল রোজা রাখুন এবং আশুরার দিনকে বিশেষ মর্যাদায় পালন করুন।
হিজরি নববর্ষ মুবারক — ১৪৪৮ হিজরি
তথ্যসূত্র
- উম্মুল কুরা ক্যালেন্ডার (সৌদি আরব)
- ইসলামিক ফাইন্ডার (islamicfinder.org)
- বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
- উইকিপিডিয়া — হিজরি সন (bn.wikipedia.org)
- Wego Travel Blog — Muharram 2026 Guide
- পবিত্র কুরআন, সূরা তওবা, আয়াত ৩৬
- সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১১৬৩
এই আর্টিকেলটি সর্বশেষ জুন ২০২৬ সালে আপডেট করা হয়েছে। হিজরি তারিখ চাঁদ দেখার উপর নির্ভরশীল বলে বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সরকারি ঘোষণা অনুসরণ করুন।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”
