বরদা চতুর্থী 2026: তারিখ, মুহূর্ত, পূজা বিধি, উপবাসের নিয়ম ও মাহাত্ম্য

বরদা চতুর্থী 2026

বরদা চতুর্থী 2026 পালিত হবে বুধবার, ২০ মে ২০২৬ তারিখে। এটি জ্যেষ্ঠ অধিক মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্থী তিথিতে পড়েছে। মধ্যাহ্ন মুহূর্ত: সকাল ১০:৫৬ থেকে ১১:০৬ পর্যন্ত।

বরদা চতুর্থী কী?

বরদা চতুর্থী হলো হিন্দু ধর্মের একটি অত্যন্ত পবিত্র ব্রত, যা ভগবান গণেশের উপাসনায় পালিত হয়। “বরদা” শব্দের অর্থ হলো “বর দাতা” বা “যিনি মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন।” তাই এই তিথিতে গণেশ পূজা করলে সুখ, সমৃদ্ধি, জ্ঞান ও বিঘ্ন দূর হওয়ার বিশেষ ফল পাওয়া যায়।

প্রতি মাসে শুক্লপক্ষের চতুর্থী তিথিতে বিনায়ক চতুর্থী পালিত হলেও, অধিক মাসে (মল মাস বা পুরুষোত্তম মাস) যখন এই চতুর্থী আসে, তখন তাকে বরদা চতুর্থী বা বরদ বিনায়ক চতুর্থী বলা হয়। মুদ্গল পুরাণ অনুযায়ী অধিক মাসের এই শুক্লপক্ষ চতুর্থীকে বরদা চতুর্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

বরদা চতুর্থী 2026: সঠিক তারিখ ও মুহূর্ত

বিবরণতথ্য
তারিখবুধবার, ২০ মে ২০২৬
মাস ও পক্ষজ্যেষ্ঠ অধিক মাস, শুক্লপক্ষ
চতুর্থী তিথি শুরু১৯ মে ২০২৬, বিকাল ২:১৮ মিনিট
চতুর্থী তিথি সমাপ্তি২০ মে ২০২৬, সকাল ১১:০৬ মিনিট
মধ্যাহ্ন মুহূর্ত (পূজার সেরা সময়)সকাল ১০:৫৬ থেকে ১১:০৬ পর্যন্ত
মুহূর্তের স্থায়িত্বমাত্র ১০ মিনিট

গুরুত্বপূর্ণ নোট: উদয় তিথি অনুসারে চতুর্থী তিথি ১৯ মে বিকেলে শুরু হলেও, সূর্যোদয়ের ভিত্তিতে ব্রতের দিন নির্ধারিত হয় ২০ মে। বিভিন্ন পঞ্জিকায় তারিখে সামান্য পার্থক্য দেখা যেতে পারে, তাই নিজের এলাকার পঞ্জিকা অনুসরণ করুন।

অধিক মাসে বরদা চতুর্থীর বিশেষ গুরুত্ব কেন?

হিন্দু পঞ্জিকায় প্রতি তিন বছরে একবার অধিক মাস বা মল মাস আসে। এটি সৌর ও চন্দ্র বছরের মধ্যে পার্থক্য মেটাতে যোগ করা একটি অতিরিক্ত মাস।

ভবিষ্যপুরাণ ও গণেশ পুরাণে বলা হয়েছে:

  • অধিক মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্থীতে গণেশ পূজার ফল সাধারণ চতুর্থীর তুলনায় অনেক গুণ বেশি
  • এই ব্রত পালনে পূর্বজন্মের কর্মদোষ ও বর্তমান জীবনের বিঘ্ন দূর হয়।
  • ভক্ত ধন, সন্তান, যশ ও দীর্ঘায়ু লাভ করেন।
  • পিতৃগণ ও দেবগণ উভয়ই সন্তুষ্ট হন।
  • ভগবান বিষ্ণু নিজেই এই মাসটিকে তাঁর প্রকাশ হিসেবে ঘোষণা করেছেন, তাই এই মাসে গণেশ পূজায় ভগবান বিষ্ণুর পুরুষোত্তম রূপের আশীর্বাদও পাওয়া যায়।

বরদা চতুর্থী ব্রত পালনের নিয়ম

ধাপ ১: প্রাতঃকালীন প্রস্তুতি

  • ভোরে উঠে পবিত্র স্নান করুন।
  • পরিষ্কার ও সাদা বা হলুদ পোশাক পরুন।
  • ব্রতের সংকল্প নিন (মনে মনে বা উচ্চস্বরে)।
  • পূজার স্থান পরিষ্কার করুন।

ধাপ ২: গণেশ মূর্তি স্থাপন

  • একটি কাঠের পাটাতনে লাল কাপড় বিছান।
  • গণেশ মূর্তি বা ছবি স্থাপন করুন।
  • ফুল, চন্দন, সিঁদুর ও দূর্বা ঘাস দিয়ে সাজান।

ধাপ ৩: ষোড়শোপচার পূজা

পূজার ১৬টি উপচার (শোড়শোপচার গণেশ পূজন):

  • আবাহন, আসন, অর্ঘ্য, পাদ্য, স্নান, গন্ধ
  • পুষ্প, ধূপ, দীপ, নৈবেদ্য, তাম্বুল, দক্ষিণা ও আরতি

ধাপ ৪: বিশেষ নৈবেদ্য অর্পণ

  • ২১টি দূর্বা ঘাস (অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ)
  • মোদক ও লাড্ডু
  • নারকেল, গুড় ও ফল
  • লাল ও হলুদ ফুল
  • বিশুদ্ধ ঘি

ধাপ ৫: মন্ত্র জপ ও প্রার্থনা

  • “ওঁ গং গণপতয়ে নমঃ” — ১০৮ বার জপ করুন
  • গণেশ চালিশা পাঠ করুন
  • গণেশ আরতি করুন
  • বরদা চতুর্থী ব্রতকথা পাঠ করুন বা শুনুন

ধাপ ৬: উপবাস ভঙ্গ

  • সন্ধ্যায় আরতির পর উপবাস ভাঙুন।
  • পরদিন পঞ্চমী তিথিতে পারণ করুন (মুদ্গল পুরাণ নির্দেশিত)।

বরদা চতুর্থীতে কী করবেন ও কী করবেন না

✅ যা করবেন

  • সারাদিন সত্যিকারের ভক্তি ও নিষ্ঠার সাথে উপবাস রাখুন
  • গণেশ মন্দিরে গিয়ে বিশেষ পূজায় অংশ নিন
  • দান ও সেবামূলক কাজ করুন (অধিক মাসে দানের ফল বহুগুণ বাড়ে)
  • গণেশ চালিশা ও মন্ত্র পাঠ করুন
  • পরিবারের বড়দের আশীর্বাদ নিন

❌ যা করবেন না

  • মিথ্যা কথা, ক্রোধ ও হিংসা থেকে বিরত থাকুন
  • মাংস, মাছ ও মদ থেকে দূরে থাকুন
  • অপরের নিন্দা করবেন না
  • চন্দ্র দর্শনের আগে পূজা সম্পন্ন না করে উপবাস ভাঙবেন না

বরদা চতুর্থীর ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্য

হিন্দু শাস্ত্রে ভগবান গণেশকে “বিঘ্নহর্তা” — বাধা দূরকারী এবং “বরদ গণপতি” — বর প্রদানকারী রূপে পূজা করা হয়। মুদ্গল পুরাণ ও ভবিষ্যপুরাণে বরদা চতুর্থী সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা রয়েছে।

শাস্ত্র অনুযায়ী এই ব্রত পালনের ফল:

  • জীবনের বিঘ্ন দূর হয়: কর্মজীবন, পড়ালেখা ও পারিবারিক বাধা অতিক্রম করা সহজ হয়।
  • সমৃদ্ধি ও সফলতা: ব্যবসা ও পেশাগত ক্ষেত্রে উন্নতি হয়।
  • জ্ঞান ও প্রজ্ঞা বৃদ্ধি: শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ উপকারী।
  • পরিবারে শান্তি: সম্পর্কের টানাপোড়েন কমে।
  • পূর্বজন্মের পাপ ক্ষয়: কর্মদোষ থেকে মুক্তি মেলে।

গণেশ মন্ত্র: বরদা চতুর্থীতে জপ করুন

মূল মন্ত্র:

ওঁ গং গণপতয়ে নমঃ

বরদ গণপতি মন্ত্র:

ওঁ শ্রীং হ্রীং ক্লীং গ্লৌং গং গণপতয়ে বর বরদ সর্বজনং মে বশমানয় স্বাহা

গণেশ গায়ত্রী:

ওঁ একদন্তায় বিদ্মহে বক্রতুণ্ডায় ধীমহি তন্নো দন্তিঃ প্রচোদয়াৎ

বরদা চতুর্থী 2026 ও বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়

বাংলাদেশে প্রায় ১.৩ কোটিরও বেশি হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ রয়েছেন (বিবিএস ২০২২ তথ্য অনুযায়ী)। তাদের মধ্যে গণেশ পূজা, বিশেষত চতুর্থী ব্রত পালনের ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের।

বাংলাদেশে বরদা চতুর্থী উপলক্ষে:

  • ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও রাজশাহীর বিভিন্ন গণেশ মন্দিরে বিশেষ পূজার আয়োজন হয়
  • সনাতন ধর্মীয় সংস্থাগুলো সম্মিলিত পূজা ও ভজন-কীর্তনের ব্যবস্থা করে
  • পরিবারে বাড়িতেও এই পূজা পালন করা হয়

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

বরদা চতুর্থী 2026 কত তারিখ?

বরদা চতুর্থী 2026 পালিত হবে বুধবার, ২০ মে ২০২৬ তারিখে। এটি জ্যেষ্ঠ অধিক মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্থী তিথিতে পড়েছে।

বরদা চতুর্থী ও গণেশ চতুর্থীর মধ্যে পার্থক্য কী?

গণেশ চতুর্থী (গণেশ জন্মোৎসব) ভাদ্র মাসে পালিত হয়, যা গণেশের জন্মদিন হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। অন্যদিকে, বরদা চতুর্থী অধিক মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্থীতে পালিত হয়, যেটি তিন বছরে একবার আসে এবং বিশেষভাবে বর প্রদানের উদ্দেশ্যে পালিত হয়।

বরদা চতুর্থীতে কী কী নৈবেদ্য দেওয়া হয়?

২১টি দূর্বা ঘাস, মোদক, লাড্ডু, নারকেল, গুড়, লাল ও হলুদ ফুল, সিঁদুর এবং বিশুদ্ধ ঘি বিশেষভাবে অর্পণ করা হয়।

বরদা চতুর্থী ব্রতের উপবাস কীভাবে পালন করতে হয়?

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উপবাস রাখতে হয়। শুধু ফল, মূল ও দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণ করা যায়। সন্ধ্যায় আরতির পর উপবাস ভাঙা হয় এবং পরদিন পঞ্চমী তিথিতে পারণ করা হয়।

অধিক মাস কী এবং কেন এই মাসে পূজার গুরুত্ব বেশি?

অধিক মাস হলো হিন্দু চন্দ্র পঞ্জিকায় প্রতি তিন বছরে একবার যোগ করা অতিরিক্ত মাস। ভগবান বিষ্ণু এই মাসটিকে নিজের হিসেবে ঘোষণা করেছেন বলে ভবিষ্যপুরাণে উল্লেখ আছে। তাই এই মাসে যেকোনো ধর্মীয় কাজের ফল বহুগুণ বেশি।

গণেশ চতুর্থী 2026 কত তারিখ?

গণেশ চতুর্থী (গণেশ জন্মোৎসব) 2026 পালিত হবে ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সোমবার তারিখে।

বরদা চতুর্থীর মধ্যাহ্ন মুহূর্ত কেন গুরুত্বপূর্ণ?

হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী গণেশ পূজার সবচেয়ে শুভ সময় হলো মধ্যাহ্ন কাল (দুপুর)। চতুর্থী তিথি যদি মধ্যাহ্নে সক্রিয় থাকে, তখন পূজা করলে সর্বোচ্চ ফল পাওয়া যায়। ২০২৬ সালে এই মুহূর্ত মাত্র ১০ মিনিট (সকাল ১০:৫৬ – ১১:০৬), তাই সময়মতো পূজা সম্পন্ন করা অত্যন্ত জরুরি।

বরদা চতুর্থীতে চাঁদ দেখা কি নিষিদ্ধ?

গণেশ চতুর্থী তিথিতে চাঁদ দেখা নিষিদ্ধ বলে শাস্ত্রে উল্লেখ আছে। তবে বরদা চতুর্থীর ক্ষেত্রে এই নিয়মটি অধিক মাসে কতটুকু প্রযোজ্য তা স্থানীয় পুরোহিত বা পঞ্জিকা দেখে নিশ্চিত হওয়া উচিত।

বরদা গণপতি: কে তিনি?

মুদ্গল পুরাণে গণেশের ৮টি অবতারের কথা বলা হয়েছে। বরদ গণপতি হলো তাঁর সেই বিশেষ রূপ যেখানে তিনি করুণা, উদারতা ও দিব্য অনুগ্রহের প্রতীক। এই রূপে তাঁর হাত থাকে ভক্তদের দিকে প্রসারিত — যেন তিনি সর্বদা বর প্রদানের জন্য প্রস্তুত।

বিশ্বস্ত সূত্র ও তথ্যনির্দেশ

১. Drik Panchang — Varada Chaturthi 2026 Date & Timings: drikpanchang.com ২. AstroSage — Varada Chaturthi 2026 Shubh Muhurat: astrosage.com ³. Free Press Journal — Varada Chaturthi 2026 Complete Guide ⁴. মুদ্গল পুরাণ — গণেশের ৮ অবতার ও বরদা চতুর্থীর উল্লেখ ⁵. ভবিষ্যপুরাণ ও গণেশ পুরাণ — অধিক মাসের চতুর্থীর মাহাত্ম্য

এই নিবন্ধটি সম্পূর্ণ তথ্যভিত্তিক ও ধর্মীয় সাহিত্যের উপর নির্ভর করে লেখা হয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলের পঞ্জিকায় তারিখ ও মুহূর্তে সামান্য পার্থক্য হতে পারে। আপনার এলাকার স্থানীয় পঞ্জিকা বা পুরোহিতের পরামর্শ অনুসরণ করুন।

Leave a Comment

Scroll to Top