লেখক: ইসলামিক কন্টেন্ট ডেস্ক | সর্বশেষ আপডেট: মে ২০২৬ | পর্যালোচনা: কুরআন-হাদিসের রেফারেন্স যাচাইকৃত
আরাফার দিন রোজা রাখলে আল্লাহ তাআলা বান্দার বিগত এক বছর ও আগত এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেন — এটি সহিহ মুসলিমে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সরাসরি ঘোষণা। ইসলামের ইতিহাসে এমন সহজ আমলে এত বড় পুরস্কারের নজির বিরল।
আরাফার দিন কী এবং কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ?
আরাফার দিন হলো ইসলামিক হিজরি বর্ষপঞ্জির জিলহজ মাসের ৯ তারিখ। আরবিতে এই দিনকে বলা হয় ইয়াওমুল আরাফাহ (يوم عرفة)। এই দিনে হজের হাজিরা মক্কা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আরাফাতের ময়দানে সমবেত হন এবং দোয়া-ইবাদতে মশগুল থাকেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “আরাফায় অবস্থান করাই হলো হজ।” (তিরমিযি: ৮৮৯)
এই দিনটিকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ঘটনাও রয়েছে। বিদায় হজের সময় ১০ম হিজরির এই দিনেই আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম।” (সুরা মায়িদা: ৩)
২০২৬ সালে বাংলাদেশে আরাফার দিন কবে?
জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাব ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশে আরাফার দিন (৯ জিলহজ) ২৬ মে ২০২৬ (সোমবার) হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে এক দিন পরিবর্তন হতে পারে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করুন।
আরাফার দিন রোজার ফজিলত (হাদিসের আলোকে)
ফজিলত ১: দুই বছরের গুনাহ মাফ
আরাফার রোজার সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে বিখ্যাত ফজিলত হলো দুই বছরের গুনাহ মাফ। হাদিসে এসেছে:
হজরত আবু কাতাদাহ আল-আনসারি (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“আরাফার দিনের রোজার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে, তিনি আগের এক বছর ও পরের এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।” — সহিহ মুসলিম: ১১৬২
এই হাদিসটি ইসলামের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হাদিস গ্রন্থগুলোর অন্যতম সহিহ মুসলিম থেকে নেওয়া, তাই এর প্রামাণিকতা নিয়ে কোনো সংশয় নেই।
ফজিলত ২: এক হাজার দিনের রোজার সমান সওয়াব
উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:
“আরাফার দিনের রোজার সওয়াব এক হাজার দিন রোজা রাখার সমান।” — তারগিব ওয়াত তারহিব
ফজিলত ৩: জাহান্নাম থেকে মুক্তির দিন
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরাফার দিন সম্পর্কে বলেছেন:
“আরাফার দিনের মতো আর কোনো দিন এত অধিক পরিমাণে আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন না।” — সহিহ মুসলিম: ১৩৪৮
ফজিলত ৪: নবিজি (সা.) নিজে জিলহজের প্রথম নয় দিন রোজা রাখতেন
হজরত হুনাইদাহ ইবনে খালিদ (রা.) তার স্ত্রী থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো চারটি আমল পরিত্যাগ করেননি। সেগুলো হলো:
- আশুরার রোজা
- জিলহজের প্রথম দশকের রোজা (বিশেষত ৯ তারিখের রোজা)
- প্রতি মাসে তিন দিন রোজা
- ফজরের আগের দুই রাকাত সুন্নত নামাজ
— সুনানে নাসাঈ: ২৪১৬
আরাফার দিন রোজা কার জন্য প্রযোজ্য?
হজে না যাওয়া মুসলিমদের জন্য
যারা হজে যাননি অর্থাৎ সারা পৃথিবীর সাধারণ মুসলমান, তাদের জন্য আরাফার দিন রোজা রাখা মোস্তাহাব (অত্যন্ত পুণ্যের কাজ)। এই রোজা ওয়াজিব বা ফরজ নয়, তবে ফজিলতের দিক থেকে বছরের শ্রেষ্ঠ নফল রোজাগুলোর একটি।
হাজিদের জন্য বিধান
যারা হজ আদায় করছেন এবং আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করছেন, তাদের জন্য এই দিন রোজা রাখা মোস্তাহাব নয়। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে আরাফার দিন রোজা ছাড়াই আরাফাতে অবস্থান করেছিলেন। হাজিদের দোয়া ও ইবাদতে পূর্ণ শক্তি ব্যয় করা দরকার, তাই তাদের জন্য রোজা না রাখাই সুন্নত।
আরাফার দিনের রোজা কি জুমার দিনে পড়লে রাখা যাবে?
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যা অনেকের মনে আসে।
একটি হাদিসে শুধু জুমার দিন রোজা রাখতে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু ফকিহগণ এ বিষয়ে একমত যে, আরাফার দিনের রোজার উদ্দেশ্যে যদি সেই দিন জুমাবার হয়, তাহলে রোজা রাখতে কোনো বাধা নেই। কারণ এখানে শুধু জুমার দিনের রোজা নয়, বরং একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে রোজা রাখা হচ্ছে। মাসিক আলকাউসারসহ বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য ইসলামিক সূত্রও এই মতকে সমর্থন করে।
বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ প্রশ্ন: সৌদি আরবের তারিখ অনুসরণ করব, নাকি স্থানীয় চাঁদ দেখব?
এটি বাংলাদেশের মুসলিমদের মধ্যে একটি পরিচিত বিতর্ক।
দুটি মত প্রচলিত আছে:
প্রথম মত: স্থানীয়ভাবে চাঁদ দেখে তারিখ নির্ধারণ করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী ৯ জিলহজ রোজা রাখতে হবে।
দ্বিতীয় মত: হাজিরা যেদিন আরাফাতে থাকেন, সেদিন রোজা রাখলেই ফজিলত পাওয়া যাবে।
আলেমগণের প্রাধান্য দেওয়া মত: বাংলাদেশের ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও অধিকাংশ আলেম মনে করেন, স্থানীয় চাঁদ দেখার ভিত্তিতে নির্ধারিত ৯ জিলহজ তারিখেই রোজা রাখা উচিত। এটিই অধিকতর গ্রহণযোগ্য মত।
তাই বাংলাদেশে যারা আছেন, তারা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ঘোষণা অনুযায়ী রোজা রাখুন।
আরাফার দিন কীভাবে রোজা রাখবেন
আরাফার দিন রোজা রাখার পদ্ধতি রমজানের রোজার মতোই। তবে কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি:
১. রাতেই নিয়ত করুন রাতে ঘুমানোর আগে বা সেহরির সময় মনে মনে নিয়ত করুন যে আগামীকাল আরাফার দিনের নফল রোজা রাখবেন। নিয়ত মুখে বলা জরুরি নয়, মনের সংকল্পই যথেষ্ট।
২. সেহরি খান রাসুলুল্লাহ (সা.) সেহরি খাওয়াকে বরকতময় বলেছেন। সুবহে সাদিকের আগেই সেহরি শেষ করুন।
৩. ইফতারের সময় পর্যন্ত রোজা রাখুন স্বাভাবিক মাগরিবের আজানের সময় ইফতার করুন।
৪. দিনভর বিশেষ আমল করুন
- বেশি বেশি দোয়া করুন
- তাসবিহ, তাহলিল ও তাকবির পড়ুন
- কুরআন তিলাওয়াত করুন
- ইস্তিগফার করুন
- দান-সদকা করুন
আরাফার দিনের অন্যান্য আমল
রোজা রাখার পাশাপাশি এই দিনে আরো কিছু আমল করা সুন্নত ও মোস্তাহাব:
তাকবিরে তাশরিক পাঠ করুন ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রতিটি ফরজ নামাজের পর এই তাকবির পড়া ওয়াজিব:
আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ।
বেশি বেশি ইস্তিগফার করুন রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দিন সবচেয়ে বেশি যে দোয়া পড়তেন:
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইইন কাদির।”
দান-সদকা করুন এই দিনে সদকা করলে সওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
আরাফার রোজা নিয়ে সাধারণ ভুল ধারণাগুলো
বাংলাদেশে অনেকের মধ্যে এই রোজা নিয়ে কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত আছে:
ভুল ধারণা ১: “এই রোজা না রাখলে গুনাহ হবে” সঠিক তথ্য: এটি ফরজ বা ওয়াজিব নয়। নফল আমল, তবে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
ভুল ধারণা ২: “দুই রোজা রাখতে হয় — একটি সৌদির তারিখে, একটি বাংলাদেশের তারিখে” সঠিক তথ্য: শুধু স্থানীয় ৯ জিলহজ তারিখে একটি রোজাই যথেষ্ট।
ভুল ধারণা ৩: “হাজিদেরও এই রোজা রাখা উচিত” সঠিক তথ্য: হাজিদের জন্য এই দিন রোজা মোস্তাহাব নয়।
আরো যা জানতে চান
প্রশ্ন: আরাফার দিন কোন মাসের কত তারিখ? আরাফার দিন হলো ইসলামিক হিজরি বর্ষপঞ্জির জিলহজ মাসের ৯ তারিখ। প্রতি বছর সৌরবছরের হিসেবে এই তারিখ প্রায় ১০-১১ দিন এগিয়ে আসে।
প্রশ্ন: আরাফার দিনের রোজায় কত বছরের গুনাহ মাফ হয়? সহিহ মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী, এই রোজায় বিগত এক বছর এবং আগামী এক বছর — মোট দুই বছরের গুনাহ মাফ হয়। তবে এটি শুধু সগিরা (ছোট) গুনাহের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে অধিকাংশ আলেম মনে করেন।
প্রশ্ন: আরাফার রোজা কি শুধু এক দিন রাখতে হয়? হ্যাঁ, শুধু ৯ জিলহজ — একটি রোজাই। তবে কেউ চাইলে জিলহজের প্রথম ৯ দিনই রোজা রাখতে পারেন, যা নবিজি (সা.)-এর সুন্নত।
প্রশ্ন: আরাফার দিনের রোজা কি কবুল হওয়ার শর্ত আছে? যেকোনো ইবাদতের মতো — সঠিক নিয়ত, হালাল রিজিক এবং সিনসিয়ার মন নিয়ে করলেই আল্লাহর অনুগ্রহে কবুল হওয়ার আশা রাখা যায়।
প্রশ্ন: জিলহজের প্রথম ১০ দিন কি রোজা রাখা যায়? হ্যাঁ। জিলহজের প্রথম নয় দিন রোজা রাখা সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে এই রোজা রাখতেন। ১০ তারিখ অর্থাৎ ঈদের দিন রোজা রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
প্রশ্ন: আরাফার দিনের বিশেষ দোয়া কী? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “আরাফার দিনে সর্বোত্তম দোয়া হলো: ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইইন কাদির।'” (তিরমিযি: ৩৫৮৫)
প্রশ্ন: আরাফার দিন কি সব মুসলিমের জন্য ছুটির দিন? না, এটি ঈদের আগের দিন। বাংলাদেশে এই দিন সরকারি ছুটি থাকে না, তবে অনেকেই স্বেচ্ছায় আমল করেন।
কেন আরাফার দিনের রোজা এত সহজ অথচ এত গুরুত্বপূর্ণ?
ইসলামের সৌন্দর্য হলো — আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের জন্য কিছু বিশেষ মুহূর্ত রেখেছেন যেখানে অল্প আমলেও অনেক বেশি পুরস্কার পাওয়া যায়। আরাফার দিনের রোজা তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।
মাত্র একটি রোজার বিনিময়ে দুই বছরের গুনাহ মাফ — এটি আল্লাহর অসীম রহমতের প্রকাশ। বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মুসলিম যারা হজে যেতে পারেননি, তাদের জন্য এই রোজা হলো ঘরে বসেই হজের ফজিলতের কাছাকাছি যাওয়ার একটি বিশেষ সুযোগ।
এই দিনটিকে অবহেলায় কাটিয়ে না দিয়ে সজাগ ও সচেতনভাবে রোজা রাখুন, দোয়া করুন, কুরআন তিলাওয়াত করুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান।
আরাফার দিনের রোজার মূল বিষয়গুলো এক নজরে
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| দিনটি কবে | জিলহজ মাসের ৯ তারিখ |
| রোজার মর্যাদা | মোস্তাহাব (অত্যন্ত পুণ্যের আমল) |
| প্রধান ফজিলত | দুই বছরের (আগে ও পরে) গুনাহ মাফ |
| হাদিসের সূত্র | সহিহ মুসলিম: ১১৬২ |
| হাজিদের জন্য | রোজা মোস্তাহাব নয় |
| ২০২৬ সালে সম্ভাব্য তারিখ | ২৬ মে ২০২৬ (বাংলাদেশ) |
| তারিখ নির্ধারণ | ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ঘোষণা অনুযায়ী |
বিশ্বস্ত তথ্যসূত্র
- সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১১৬২ ও ১৩৪৮
- সুনানে তিরমিযি, হাদিস নং ৮৮৯ ও ৩৫৮৫
- সুনানে নাসাঈ, হাদিস নং ২৪১৬
- তারগিব ওয়াত তারহিব (ইমাম মুনযিরি)
- মাসিক আলকাউসার (বাংলাদেশ)
- ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ
এই আর্টিকেলের সকল হাদিস বিশ্বস্ত হাদিস গ্রন্থ থেকে যাচাই করা হয়েছে। ধর্মীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্থানীয় বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নিন।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”
