মেগা প্রজেক্টে বরাদ্দ ২০২৬-২৭

মেগা প্রজেক্টে বরাদ্দ ২০২৬-২৭

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতকে ঢেলে সাজানোর যে মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, আপনার শেয়ার করা প্রতিবেদনটিতে তার একটি বিস্তারিত চিত্র ফুটে উঠেছে। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল বাজেটে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে অবকাঠামো উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

তথ্যগুলোকে সহজে বোঝার জন্য নিচে প্রধান খাত, প্রকল্প এবং চ্যালেঞ্জগুলো বিন্যস্ত করা হলো:

বাজেটের মূল বরাদ্দ ও খাতভিত্তিক বণ্টন

মোট ১ লাখ ৭৪,৯৮৮ কোটি টাকার অবকাঠামো বরাদ্দের একটি বড় অংশই যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ব্যয় হবে।

খাত/প্রকল্পবরাদ্দের পরিমাণ (টাকা)মূল লক্ষ্য/বৈশিষ্ট্য
অবকাঠামো খাত (মোট)১,৭৪,৯৮৮ কোটিসামগ্রিক দেশের অবকাঠামোগত রূপান্তর।
সড়ক, রেল ও বিমান৬০,৭৩০ কোটিযোগাযোগ ব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়ন (মোট বরাদ্দের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ)।
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প৩৪,৪৯৭ কোটি২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিতব্য ২.১ কিমি দীর্ঘ রেলসেতুসহ ব্যারেজ।
গ্রামীণ অবকাঠামো ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা১০,৩৫০ কোটিগ্রামীণ যোগাযোগ সচল রাখা ও দুর্যোগ মোকাবিলা।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়১০,৫৩৩ কোটিখাল খনন, ৩০৯ কিমি বাঁধ নির্মাণ ও ৪৮৪ কিমি নৌপথের নাব্য উন্নয়ন।

প্রধান মেগা প্রকল্প ও যোগাযোগ খাতের রূপান্তর

  • পদ্মা ব্যারেজ ও যমুনা সেতু: এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় মেগা প্রকল্প হলো পদ্মা ব্যারেজ, যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৭ কোটি মানুষকে সরাসরি উপকৃত করবে। এছাড়া যমুনা নদীতে দ্বিতীয় আরেকটি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
  • মেট্রোরেল ও মনোরেল: রাজধানীর যানজট নিরসনে চলমান ৬টি মেট্রোরেল লাইনের সমন্বিত নেটওয়ার্কের পাশাপাশি এবার নতুন সংযোজন হিসেবে ‘মনোরেল ভিত্তিক ফিডার নেটওয়ার্ক’ যুক্ত করা হচ্ছে।
  • ঢাকা-চট্টগ্রাম লাইফলাইন: এই রুটে যাতায়াতের সময় কমাতে ঢাকা-কুমিল্লা অংশে হাই-স্পিড বা কর্ড রেললাইন নির্মাণ করা হবে, যা রেলপথে দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার কমিয়ে আনবে। পাশাপাশি ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন (EV) ও শিল্পে প্রণোদনা

ইলেকট্রিক ভেহিকল (EV) বা বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসার এবং দেশীয় শিল্পকে উৎসাহিত করতে বাজেটে বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে:

  • ভ্যাট ও শুল্ক মওকুফ: ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত দেশে বৈদ্যুতিক বাস ও ট্রাক উৎপাদন শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে মাত্র ৫% ভ্যাট রেখে বাকি সব শুল্ক ও কর সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে।
  • রেজিস্ট্রেশন ফি হ্রাস: মোটরের ক্ষমতা ভেদে ইভি (EV) রেজিস্ট্রেশনের অগ্রিম আয়কর সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

বন্দর ও এভিয়েশন খাতের উন্নয়ন

  • মেরিটাইম সক্ষমতা: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গতি আনতে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দরের প্রথম টার্মিনাল, মংলা বন্দর, লালদিয়া এবং চট্টগ্রামের বে টার্মিনালের নির্মাণ কাজ দ্রুত শেষ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
  • এভিয়েশন হাব (২০৩৪): বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম এভিয়েশন হাবে পরিণত করার লক্ষ্যে বোইং থেকে ১৪টি আধুনিক বিমান কেনা হবে। এছাড়া ২২ হাজার কোটি টাকায় নির্মিত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল চলতি বছরের ডিসেম্বরে (২০২৬) উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। কক্সবাজার, যশোর, রাজশাহী ও সৈয়েদপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক গেটওয়ে হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

বাস্তবায়নের মূল চ্যালেঞ্জ ও নাগরিক শঙ্কা

প্রতিবেদনে জনস্বার্থ ও বাজেট বাস্তবায়নের একটি চিরচেনা সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করেছেন বিশ্লেষক হাসিব বিল্লাহ:

বাস্তবায়নের ধীরগতি ও এডিপি (ADP) ঘাটতি: অতীতের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (ADP) প্রথম ৬ মাসে সাধারণত ১১% থেকে ২০%-এর বেশি অগ্রগতি দেখা যায় না। অর্থবছরের শেষ দিকে (এপ্রিল, মে, জুন) তাড়াহুড়ো করে টাকা খরচ করার যে সংস্কৃতি, তা প্রকল্পের মান নষ্ট করে।

খরচ বাড়িয়ে দেখানোর সংস্কৃতি: প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং কৃত্রিমভাবে খরচ বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা বন্ধ করাই বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন প্রকল্পগুলোতে কঠোর নজরদারি ও প্রশাসনিক সংস্কার আনতে না পারলে এই বিশাল বাজেটের প্রকৃত সুফল সাধারণ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো কঠিন হবে।

বাজেটের এই বিশাল মহাপরিকল্পনাগুলোর মধ্যে কোন প্রকল্পটি আপনার এলাকায় সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আপনি মনে করেন?

Leave a Comment

Scroll to Top