আশুরার রোজার ফজিলত: ইসলামের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ নফল রোজা

আশুরার রোজার ফজিলত

তথ্যটি সেভ করে রাখুন — আশুরার রোজা সম্পর্কে যা জানা দরকার সব এখানেই পাবেন।

আশুরার রোজার ফজিলত কী?

আশুরার রোজা রাখলে বিগত এক বছরের গুনাহ মাফ হয়ে যায় — এটি সহিহ মুসলিমে বর্ণিত রাসুল (সা.)-এর হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আশুরা হলো মহররম মাসের ১০ তারিখ। সুন্নত হলো ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম একসাথে রোজা রাখা, যাতে ইহুদিদের সাথে মিল না হয়।

আশুরার রোজা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

মহররম মাস আসলেই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে — “আশুরার রোজা আসলে কী? কেন রাখবো? কবে রাখবো?”

বাংলাদেশে অনেকেই আশুরার দিনটিকে শুধু কারবালার ঘটনার সাথে যুক্ত করে জানেন। কিন্তু ইসলামে আশুরার ফজিলত আরও গভীর এবং আরও পুরোনো — এটি মুসা (আ.)-এর মুক্তির দিন, এবং রাসুল (সা.) নিজে এই রোজা রাখতেন ও রাখতে উৎসাহিত করতেন।

এই আর্টিকেলে আপনি পাবেন:

  • আশুরার রোজার সঠিক ফজিলত ও হাদিস
  • কবে ও কতটি রোজা রাখবেন
  • সহিহ নিয়ত (বাংলা উচ্চারণ সহ)
  • ২০২৬ সালে আশুরা কত তারিখে পড়েছে
  • সাধারণ ভুল ও সঠিক আমল

আশুরার রোজার ফজিলত — হাদিসের আলোকে

১. এক বছরের গুনাহ মাফ

রাসুল (সা.) বলেছেন:

“আশুরার দিনের রোজা সম্পর্কে আমি আশাবাদী যে, আল্লাহ তায়ালা বিগত এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।”

সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১১৬২

এটি নফল রোজাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফজিলতপূর্ণ রোজাগুলোর একটি। আরাফার দিনের রোজায় দুই বছরের গুনাহ মাফ হয়, আশুরার রোজায় এক বছরের।

২. রমজানের পরে সর্বোত্তম রোজা

রাসুল (সা.) বলেছেন:

“রমজানের পরে সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।”

সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১১৬৩

অর্থাৎ, মহররম মাসে রোজা রাখা, বিশেষত আশুরার রোজা, রমজানের পরে সবচেয়ে বেশি সওয়াবের কাজ।

৩. রাসুল (সা.)-এর নিজস্ব আমল

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন:

“রাসুল (সা.) মদিনায় আসার পর দেখলেন ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা রাখছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটি কিসের রোজা?’ তারা বলল, ‘এই দিনে আল্লাহ মুসা (আ.) ও তাঁর সাথীদের ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউনকে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন। তাই মুসা (আ.) শুকরিয়াস্বরূপ রোজা রেখেছিলেন।’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘আমরা মুসা (আ.)-এর সাথে তোমাদের চেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ।’ অতঃপর তিনি রোজা রাখলেন এবং রোজা রাখতে আদেশ দিলেন।”

সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২০০৪

আশুরার রোজা কবে — ২০২৬ সালে কত তারিখে?

২০২৬ সালে আশুরা পড়বে জুলাই মাসে।

হিজরি ১৪৪৭ সনের মহররম মাস অনুযায়ী, আশুরা অর্থাৎ ১০ মহররম হবে আনুমানিক ৫ জুলাই ২০২৬ (রবিবার)

নোট: চাঁদ দেখার উপর নির্ভর করে তারিখ এক দিন আগে বা পরে হতে পারে। বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ঘোষণা অনুযায়ী নিশ্চিত করুন।

রোজার দিনহিজরি তারিখআনুমানিক ইংরেজি তারিখ (২০২৬)
তাসুয়া (৯ মহররম)৯ মহররম ১৪৪৭৪ জুলাই ২০২৬ (শনিবার)
আশুরা (১০ মহররম)১০ মহররম ১৪৪৭৫ জুলাই ২০২৬ (রবিবার)
বিকল্প: ১১ মহররম১১ মহররম ১৪৪৭৬ জুলাই ২০২৬ (সোমবার)

আশুরার রোজা কতটি রাখবেন? সঠিক নিয়ম

রোজার সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করুন

অনেকেই জানেন না — শুধু ১০ মহররম একটি রোজা রাখা যথেষ্ট কিনা? উত্তর হলো, একটি রোজাতেও সওয়াব পাওয়া যাবে, তবে সুন্নত হলো দুটি রোজা রাখা।

রাসুল (সা.) বলেছেন:

“যদি আমি আগামী বছর বেঁচে থাকি, তাহলে অবশ্যই ৯ তারিখেও রোজা রাখবো।”

সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১১৩৪

এর কারণ হলো ইহুদিদের সাথে মিল না করা। তারাও ১০ মহররম রোজা রাখে, তাই মুসলমানরা এর সাথে আরেকটি রোজা যোগ করবেন।

তিনটি স্বীকৃত পদ্ধতি

পদ্ধতি ১ (সর্বোত্তম): ৯ ও ১০ মহররম (তাসুয়া ও আশুরা)

পদ্ধতি ২ (গ্রহণযোগ্য): ১০ ও ১১ মহররম

পদ্ধতি ৩ (ন্যূনতম): শুধু ১০ মহররম

অধিকাংশ আলেমের মত হলো, ৯ ও ১০ মহররম রোজা রাখা সবচেয়ে সুন্নতসম্মত।

আশুরার রোজার নিয়ত — বাংলা উচ্চারণ সহ

আরবি নিয়ত

نَوَيْتُ صَوْمَ يَوْمِ عَاشُورَاءَ سُنَّةً لِلَّهِ تَعَالَى

বাংলা উচ্চারণ

“নাওয়াইতু সাওমা ইয়াওমিল আশুরা-ই সুন্নাতান লিল্লাহি তাআলা।”

বাংলা অর্থ

“আমি আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য আশুরার সুন্নত রোজার নিয়ত করলাম।”

গুরুত্বপূর্ণ: নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা শর্ত নয়। মনে মনে সংকল্প করলেই যথেষ্ট। তবে উচ্চারণ করা উত্তম।

আশুরার দিনের অন্যান্য আমল

আশুরার রোজার পাশাপাশি এই দিন কিছু নফল আমল করা যায়:

  • বেশি বেশি তওবা ও ইস্তেগফার করা
  • কুরআন তিলাওয়াত করা
  • নফল নামাজ পড়া
  • পরিবারের জন্য উত্তম খাবারের ব্যবস্থা করা (এ বিষয়ে কিছু দুর্বল হাদিস আছে, তাই এটি বাধ্যতামূলক নয়)
  • দান-সদকা করা

সতর্কতা: আশুরায় মাতম করা, গায়ে আঘাত করা, শোক পালন করা — এগুলো ইসলামে অনুমোদিত নয়। এগুলো বিদআত।

মহররম মাসের রোজার ফজিলত

শুধু আশুরার দিন নয়, পুরো মহররম মাসেই নফল রোজা রাখা ফজিলতপূর্ণ। মহররম চারটি সম্মানিত মাসের একটি (আশহুরুল হুরুম)।

মাসের বিশেষত্ববিবরণ
সম্মানিত মাসযুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ ছিল এই মাসে
আল্লাহর মাসহাদিসে মহররমকে “শাহরুল্লাহ” বলা হয়েছে
রোজার ফজিলতরমজানের পরে সর্বোত্তম মাস
তওবার মাসএই মাসে তওবা কবুলের বিশেষ সম্ভাবনা

আশুরা সম্পর্কে সাধারণ ভুল ধারণা

ভুল ১: আশুরা শুধু কারবালার দিন

সত্য: কারবালার ঘটনা (৬১ হিজরি) হওয়ার অনেক আগে থেকেই আশুরার রোজার বিধান ছিল। রাসুল (সা.) মক্কায় থাকতেও এই রোজা রাখতেন।

ভুল ২: শুধু একটি রোজা রাখলেই হয় না

সত্য: শুধু ১০ মহররমের রোজাতেও সওয়াব হয়। তবে ৯ ও ১০ একসাথে রাখা সুন্নতসম্মত।

ভুল ৩: আশুরায় শোক পালন করতে হয়

সত্য: ইসলামে শোক পালনের সর্বোচ্চ সময় তিন দিন। কারবালার ঘটনায় ব্যথিত হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু বিশেষ শোক আচার পালন করা সুন্নতসম্মত নয়।

ভুল ৪: আশুরার রোজায় সব গুনাহ মাফ হয়

সত্য: শুধু সগিরা (ছোট) গুনাহ মাফ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। কবিরা গুনাহের জন্য আলাদাভাবে তওবা করতে হবে।

সাধারন জিজ্ঞাসা

আশুরার রোজা কি ফরজ?

না, আশুরার রোজা ফরজ নয়। এটি সুন্নত বা নফল রোজা। রাসুল (সা.) রাখতেন এবং উৎসাহিত করতেন, কিন্তু এটি বাধ্যতামূলক করেননি।

আশুরার রোজায় কি বিগত বছরের সব গুনাহ মাফ হয়?

হাদিসে “বিগত এক বছরের গুনাহ মাফ” বলা হয়েছে। আলেমরা বলেন, এটি সগিরা গুনাহের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কবিরা গুনাহের জন্য আলাদা তওবা প্রয়োজন।

আশুরার দিন কি কোনো বিশেষ নামাজ আছে?

না, আশুরার দিন কোনো বিশেষ নামাজ নেই। যা প্রচলিত আছে (যেমন ১২ রাকাত বিশেষ নামাজ) তার সহিহ ভিত্তি নেই।

নিয়ত ছাড়া কি আশুরার রোজা হবে?

রোজার জন্য নিয়ত (সংকল্প) থাকতে হবে। তবে নিয়ত মনে মনে করলেই যথেষ্ট, মুখে বলা শর্ত নয়।

আশুরার রোজা কি শুক্রবার বা শনিবারেও রাখা যাবে?

হ্যাঁ। আশুরার রোজা যেকোনো দিন পড়লেও রাখা যাবে। সপ্তাহের নির্দিষ্ট কোনো দিনের নিষেধাজ্ঞা এখানে প্রযোজ্য নয়, কারণ এটি নির্দিষ্ট কারণে রাখা রোজা।

মহিলারা কি আশুরার রোজা রাখতে পারবেন?

হ্যাঁ। তবে যে মহিলার মাসিক চলছে তিনি রোজা রাখতে পারবেন না, পরে কাযা করার সুযোগও নেই কারণ এটি নফল রোজা। তবে পরে অন্য দিন নিয়ত করে রোজা রাখলে সওয়াব পাওয়া যাবে।

আশুরার দিন সদকা করা কি বিশেষভাবে ফজিলতপূর্ণ?

যেকোনো দিনই সদকা ভালো কাজ। আশুরার দিনে পরিবারের জন্য উত্তম খাবারের ব্যবস্থা করার কথা কিছু হাদিসে আছে, তবে সেগুলোর সনদ দুর্বল বলে অনেক মুহাদ্দিস মত দিয়েছেন।

মানুষ আরও প্রশ্ন করে

প্রশ্ন: আশুরার রোজার নিয়ত কখন করতে হয়?

উত্তর: সূর্যোদয়ের আগে (সেহরির সময়ের মধ্যে) নিয়ত করা উত্তম। তবে যদি সকালে মনে পড়ে এবং সকাল থেকে কিছু না খেয়ে থাকেন, তাহলে দুপুরের আগেও নিয়ত করা যাবে — এটি নফল রোজার ক্ষেত্রে অনুমোদিত।

প্রশ্ন: তাসুয়া কী?

উত্তর: তাসুয়া হলো মহররমের ৯ তারিখ। “তাসুয়া” শব্দের অর্থ নয়। রাসুল (সা.) বলেছিলেন, পরের বছর বেঁচে থাকলে ৯ তারিখেও রোজা রাখবেন, যাতে ইহুদিদের সাথে পার্থক্য হয়।

প্রশ্ন: ৯ মহররমের রোজা না রেখে শুধু ১০ মহররম রাখলে কি সওয়াব হবে?

উত্তর: হ্যাঁ, সওয়াব হবে। তবে ৯ ও ১০ একসাথে রাখা বেশি ফজিলতপূর্ণ ও সুন্নতসম্মত।

প্রশ্ন: আশুরার দিন কি কবর জিয়ারত করা সুন্নত?

উত্তর: না, এটি সুন্নত নয়। যেকোনো দিন কবর জিয়ারত করা জায়েজ, তবে আশুরার সাথে এর কোনো বিশেষ সম্পর্ক নেই।

প্রশ্ন: আশুরায় কি ভিন্ন ধরনের খাবার রান্না করা বাধ্যতামূলক?

উত্তর: না। বাংলাদেশের কিছু অঞ্চলে আশুরায় খিচুড়ি বা বিশেষ খাবার রান্নার প্রচলন আছে, কিন্তু এর কোনো শরিয়তসম্মত ভিত্তি নেই। এটি সাংস্কৃতিক প্রথা।

প্রশ্ন: বাচ্চাদের আশুরার রোজা রাখানো যাবে কি?

উত্তর: প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত রোজা ফরজ নয়। তবে অভ্যাস তৈরির জন্য বড় বাচ্চাদের আশুরার রোজায় উৎসাহিত করা যায়।

প্রশ্ন: আশুরার রোজার পর কি বিশেষ দোয়া আছে?

উত্তর: রোজা ভাঙার সময় যেকোনো দোয়া করা যায়। বিশেষভাবে: “আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়া আলা রিযকিকা আফতারতু” পড়া সুন্নত।

আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে মূল তথ্য:

  • আশুরা = ১০ মহররম (হিজরি বর্ষের প্রথম মাসের ১০ তারিখ)
  • আশুরার রোজায় বিগত এক বছরের গুনাহ মাফ হয় (সহিহ মুসলিম)
  • রমজানের পরে সর্বোত্তম রোজা মহররমে (সহিহ মুসলিম)
  • সুন্নত হলো ৯ ও ১০ মহররম বা ১০ ও ১১ মহররম দুটি রোজা রাখা
  • রাসুল (সা.) নিজে এই রোজা রাখতেন এবং সাহাবিদের রাখতে উৎসাহিত করতেন
  • মুসা (আ.)-এর ফেরাউন থেকে মুক্তির দিন উপলক্ষে এই রোজার প্রচলন
  • ২০২৬ সালে আশুরা আনুমানিক ৫ জুলাই (চাঁদ দেখার উপর নির্ভরশীল)

Reference / Source List

১. সহিহ মুসলিম — কিতাবুস সিয়াম, হাদিস নং ১১৩৪, ১১৬২, ১১৬৩ (ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ)

২. সহিহ বুখারি — কিতাবুস সিয়াম, হাদিস নং ২০০৪ (ইমাম বুখারি)

৩. বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশনwww.islamicfoundation.gov.bd

৪. Sunnah.com — Online Hadith Reference (হাদিস যাচাইয়ের জন্য) — sunnah.com

৫. IslamQA.info — ইসলামিক প্রশ্নোত্তর, শায়খ মুহাম্মদ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ

৬. দারুল ইফতা, বাংলাদেশ — ইসলামী ফিকহ সংক্রান্ত রায়

Leave a Comment

Scroll to Top