তাকবিরে তাশরিক: কী, কখন থেকে কখন পড়তে হয়
বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও পড়ার সম্পূর্ণ নিয়ম
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী বিস্তারিত তথ্যভিত্তিক গাইডলাইন (ফজিলত, ইতিহাস ও সচরাচর জিজ্ঞাসাসহ)
তাকবিরে তাশরিক হলো জিলহজ মাসের নির্দিষ্ট দিনগুলোতে প্রতিটি ফরজ নামাজের পর একবার উচ্চস্বরে (পুরুষদের জন্য) পড়া হয় এমন একটি বিশেষ তাকবির বা আল্লাহর মহিমা ঘোষণাকারী বাক্য। এটি ৯ জিলহজের ফজর থেকে শুরু হয়ে ১৩ জিলহজের আসর পর্যন্ত পড়তে হয়। হানাফি মাযহাব অনুযায়ী এটি পড়া ওয়াজিব (আবশ্যক)।
📋 এই আর্টিকেলে যা পাবেন
তাকবিরে তাশরিক কী এবং কাকে বলে?
“তাকবির” অর্থ আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা এবং “তাশরিক” শব্দটি এসেছে আরবি “তাশরিক” মূল থেকে, যার অর্থ রোদে মাংস শুকানো বা সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল হওয়া। এ নামটি এসেছে কারণ আইয়ামে তাশরিক বা তাশরিকের দিনগুলোতে (১১, ১২ ও ১৩ জিলহজ) হাজিরা কুরবানির মাংস রোদে শুকাতেন।
ইসলামি পরিভাষায়, তাকবিরে তাশরিক হলো ঈদুল আজহা-সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট দিনগুলোতে (৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত) প্রতিটি ফরজ নামাজের পর একটি নির্ধারিত তাকবির পাঠ করা।
সংজ্ঞা
জিলহজের নির্দিষ্ট দিনে ফরজ নামাজের পর পঠিত বিশেষ তাকবির
সময়কাল
মোট ৫ দিন, ২৩ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর
বিধান
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী ওয়াজিব
পাঠকারী
মুকিম, মুসাফির, পুরুষ, মহিলা [সকলে]
তাকবিরে তাশরিক আরবিতে, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ
উচ্চারণ বিশ্লেষণ (শব্দে শব্দে)
| আরবি | বাংলা উচ্চারণ | অর্থ |
|---|---|---|
| اَللهُ أَكْبَرُ | আল্লাহু আকবার | আল্লাহ সবচেয়ে বড় |
| اَللهُ أَكْبَرُ | আল্লাহু আকবার | আল্লাহ সবচেয়ে বড় |
| لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ | লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু | আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই |
| وَاللهُ أَكْبَرُ | ওয়াল্লাহু আকবার | এবং আল্লাহ সবচেয়ে বড় |
| اَللهُ أَكْبَرُ | আল্লাহু আকবার | আল্লাহ সবচেয়ে বড় |
| وَلِلَّهِ الْحَمْدُ | ওয়ালিল্লাহিল হামদ | এবং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর |
⚠️ গুরুত্বপূর্ণ নোট
কিছু বইয়ে “আল্লাহু আকবার কাবিরা” বা ভিন্ন পাঠ দেখা যায়, কিন্তু উপরের পাঠটি হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাব দুররুল মুখতার ও ফাতাওয়া শামি-তে উল্লেখিত এবং বাংলাদেশের আলেমসমাজ কর্তৃক স্বীকৃত।
তাকবিরে তাশরিক কখন থেকে কখন পড়তে হয়?
তাকবিরে তাশরিক পড়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে। এটি কোনো নফল ইবাদত নয় বরং নির্দিষ্ট ওয়াক্তের সাথে বাঁধা একটি ওয়াজিব আমল।
শুরু হয়
আরাফার দিন ফজরের ফরজ নামাজ শেষে প্রথমবার পড়তে হয়
শেষ হয়
আইয়ামে তাশরিকের শেষ দিন আসরের নামাজের পর তাকবির দিয়ে সমাপ্ত
দিনওয়ারি সময়সূচি
| তারিখ (জিলহজ) | দিনের নাম | যে নামাজের পর পড়বেন | মোট বার |
|---|---|---|---|
| ৯ জিলহজ | আরাফার দিন | ফজর, জোহর, আসর, মাগরিব, এশা | ৫ বার |
| ১০ জিলহজ | ঈদুল আজহা | ফজর, জোহর, আসর, মাগরিব, এশা | ৫ বার |
| ১১ জিলহজ | আইয়ামে তাশরিক (১ম) | ফজর, জোহর, আসর, মাগরিব, এশা | ৫ বার |
| ১২ জিলহজ | আইয়ামে তাশরিক (২য়) | ফজর, জোহর, আসর, মাগরিব, এশা | ৫ বার |
| ১৩ জিলহজ | আইয়ামে তাশরিক (৩য়) | ফজর, জোহর, আসর (কেবল এই ৩টি) | ৩ বার |
📌 মনে রাখবেন
- ৯ জিলহজ ফজর থেকে শুরু — এর আগে পড়া যাবে না
- ১৩ জিলহজ আসরের পর পড়া শেষ — মাগরিব বা এশার পর আর নয়
- শুধুমাত্র ফরজ নামাজের পরই পড়তে হয়, নফল বা সুন্নত নামাজের পর নয়
- জামাতে পড়লেও আলাদাভাবেও পড়লেও তাকবির পড়তে হবে
তাকবিরে তাশরিক কতদিন ও কতবার পড়তে হয়?
মোট দিন
৯ থেকে ১৩ জিলহজ পর্যন্ত মোট ৫ দিন
মোট ওয়াক্ত
৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত মোট ২৩টি ফরজ নামাজ
প্রতিবার কতবার
প্রতিটি ফরজ নামাজের পর মাত্র ১ বার পড়তে হয়
অর্থাৎ, ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত মোট ২৩টি ফরজ নামাজ আদায় হয়। প্রতিটির পরে একবার করে তাকবিরে তাশরিক পড়তে হয়। তাই মোট ২৩ বার তাকবিরে তাশরিক পড়া ওয়াজিব।
তাকবিরে তাশরিক পড়ার সম্পূর্ণ নিয়ম
-
১ফরজ নামাজ সম্পন্ন করুন: যেকোনো ফরজ নামাজ — ফজর, জোহর, আসর, মাগরিব বা এশা শেষে সালাম ফিরানোর পরেই তাকবির পড়তে হবে।
-
২সালামের পরপরই পড়ুন: নামাজের সালামের ঠিক পরেই তাকবির পড়তে হবে। দেরি না করে সাথে সাথে পড়া উত্তম।
-
৩পুরুষদের জন্য উচ্চস্বরে: পুরুষরা উচ্চস্বরে তাকবির পড়বেন যাতে পাশের মানুষেরা শুনতে পান।
-
৪মহিলারা নিম্নস্বরে পড়বেন: মহিলারা নিজে শুনতে পান এতটুকু আওয়াজে তাকবির পড়বেন, উচ্চস্বরে নয়।
-
৫ইমাম ও মুক্তাদি উভয়ই পড়বেন: ইমাম নামাজ পড়ালে তাকবির পড়বেন, মুক্তাদিরাও নিজ নিজভাবে পড়বেন।
-
৬একাকী নামাজ পড়লেও পড়তে হবে: একা নামাজ পড়লেও তাকবির পড়া ওয়াজিব।
-
৭ছুটে গেলে করণীয়: যদি কোনো ওয়াক্তে তাকবির পড়তে ভুলে যান, তাহলে মসজিদ থেকে বের হওয়ার আগেই পড়ে নিন।
🕌 মসজিদে যদি নামাজ পড়েন
জামাতে নামাজ শেষে ইমাম যখন তাকবির পড়বেন, মুক্তাদিরাও একসাথে বা আলাদা আলাদাভাবে পড়বেন। ইমামের তাকবির মুক্তাদির জন্য যথেষ্ট নয়, প্রত্যেককে নিজে পড়তে হবে।
মুসাফিরের ক্ষেত্রে নিয়ম
যারা সফরে থাকেন (মুসাফির) এবং কসর নামাজ পড়েন তারাও ফরজ নামাজের পর তাকবিরে তাশরিক পড়বেন। হানাফি মাযহাবে মুকিম ও মুসাফির উভয়ের জন্যই তা ওয়াজিব।
তাকবিরে তাশরিক পড়া কি ওয়াজিব?
হ্যাঁ, হানাফি মাযহাব অনুযায়ী তাকবিরে তাশরিক পড়া ওয়াজিব। বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলিম হানাফি মাযহাব অনুসরণ করেন, তাই এটি তাদের জন্য আবশ্যিক আমল।
| মাযহাব | বিধান | পাঠকারী |
|---|---|---|
| হানাফি | ওয়াজিব আবশ্যক | সকল মুসল্লি — মুকিম ও মুসাফির |
| শাফেয়ি | সুন্নাহ মুআক্কাদাহ | জামাতে নামাজ পড়লে |
| মালিকি | সুন্নাহ | নির্দিষ্ট মতভেদ রয়েছে |
| হাম্বলি | সুন্নাহ | সকলের জন্য |
হযরত আলী (রা.) ও হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তাঁরা ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রতিটি ফরজ নামাজের পর তাকবির পড়তেন। এই আমল সাহাবায়ে কেরামের মাধ্যমে প্রমাণিত।
— মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা, হাদিস: ৫৬৫৫; বাদায়েউস সানায়ে ও ফাতাওয়া শামি-এর বরাতে
তাকবিরে তাশরিক ছেড়ে দিলে গুনাহ হবে। তবে এর জন্য পৃথক কোনো কাফফারা বা কাযা নেই — কেউ ভুলে গেলে বা ইচ্ছাকৃতভাবে না পড়লে তাওবা করতে হবে।
তাকবিরে তাশরিকের ফজিলত
তাকবিরে তাশরিক শুধু একটি নিয়ম নয় — এর পেছনে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য এবং বহুমুখী ফজিলত।
- আল্লাহর মহিমা ঘোষণা: এই তাকবিরে তিনবার “আল্লাহু আকবার” বলা হয়, যা সর্বোচ্চ সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম।
- কোরআনের নির্দেশের প্রতিফলন: সূরা হজ (আয়াত ২৮) ও সূরা বাকারা (আয়াত ২০৩)-এ আল্লাহ নির্দিষ্ট দিনগুলোতে তাঁর নাম স্মরণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
- সাহাবায়ে কেরামের আমল: হযরত আলী (রা.), ইবনে মাসউদ (রা.) সহ বহু সাহাবি এই তাকবির পড়তেন — তাই এটি অনুসরণ করা সুন্নাহের পথে চলা।
- উম্মতের ঐক্যের প্রতীক: বিশ্বের সব মুসলিম এই দিনগুলোতে একই তাকবির পড়েন, যা মুসলিম ভ্রাতৃত্বের প্রকাশ।
- গুনাহ মাফের সুযোগ: আশুরার মতো জিলহজের দিনগুলো অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ — এই সময়ে যিকির ও ইবাদতে বিশেষ সওয়াব রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: “এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ কর।”
— সূরা হজ, আয়াত: ২৮
আল্লাহ তাআলা বলেন: “এবং গণনার নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহকে স্মরণ কর।”
— সূরা বাকারা, আয়াত: ২০৩
তাকবিরে তাশরিকের ইতিহাস ও পটভূমি
তাকবিরে তাশরিকের ইতিহাস হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত। ইসলামি ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী:
-
🕋হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সংযোগ: হজের আনুষ্ঠানিকতা মূলত হযরত ইব্রাহিম (আ.) প্রবর্তিত। তাকবিরে তাশরিক হজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তখন থেকেই প্রচলিত।
-
🌿আইয়ামে তাশরিকের প্রেক্ষাপট: কুরবানির পর ১১, ১২ ও ১৩ জিলহজ — এই তিনদিন হলো আইয়ামে তাশরিক। সেসময় হাজিরা মিনায় অবস্থান করে আল্লাহর জিকির করতেন, মাংস রোদে শুকাতেন এবং এই তাকবির পড়তেন।
-
📜নবীজি (সা.)-এর সময়ে প্রমাণ: রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে এই দিনগুলোতে তাকবির পড়তেন। সাহাবায়ে কেরামের বর্ণনায় এটি সুনির্দিষ্টভাবে এসেছে।
-
📚ফিকহি গ্রন্থে স্থান পাওয়া: পরবর্তীতে ইমাম আবু হানিফা (র.), ইমাম শাফেয়ি (র.) সহ চার মাযহাবের ইমামগণ তাঁদের কিতাবে এই তাকবিরের বিধান বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
এক নজরে তাকবিরে তাশরিক
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| সংজ্ঞা | জিলহজ মাসে নির্দিষ্ট দিনে ফরজ নামাজের পর পঠিত বিশেষ তাকবির |
| আরবি পাঠ | اَللهُ أَكْبَرُ اَللهُ أَكْبَرُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَاللهُ أَكْبَرُ اَللهُ أَكْبَرُ وَلِلَّهِ الْحَمْدُ |
| শুরুর সময় | ৯ জিলহজ ফজরের ফরজ নামাজের পর |
| শেষের সময় | ১৩ জিলহজ আসরের ফরজ নামাজের পর |
| মোট দিন | ৫ দিন (৯, ১০, ১১, ১২, ১৩ জিলহজ) |
| মোট ওয়াক্ত | ২৩ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ |
| কতবার | প্রতি ওয়াক্তে একবার |
| বিধান | ওয়াজিব (হানাফি মাযহাব) |
| পুরুষ | উচ্চস্বরে পড়বেন |
| মহিলা | নিম্নস্বরে (শুধু নিজে শুনতে পান এতটুকু) পড়বেন |
| মুসাফির | পড়বেন (ওয়াজিব) |
📚 তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স
- রদ্দুল মুহতার আলা দুররিল মুখতার (ফাতাওয়া শামি) — আল্লামা ইবনে আবেদিন শামি
- বাদায়েউস সানায়ে — ইমাম কাসানি হানাফি
- আল-মাবসুত — ইমাম সারাখসি
- মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা — হাদিস নং ৫৬৫৫
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগিরী) — হানাফি ফিকহ সংকলন
- সূরা হজ: ২৮ এবং সূরা বাকারা: ২০৩ — আল কুরআনুল কারিম
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”


