আরাফার রোজা কয়টি? ফজিলত, নিয়ম ও নিয়ত

আরাফার রোজা কয়টি ফজিলত, নিয়ম ও নিয়ত

আরাফার রোজা ১টি — জিলহজ মাসের ৯ তারিখ (৯ই জিলহজ)। এই একটিমাত্র রোজা বিগত ও আগামী দুই বছরের গুনাহ মাফের উসিলা হয়। ২০২৬ সালে আরাফার দিন পড়েছে ২৬ মে, ২০২৬ (সোমবার)
আরাফার রোজা কয়টি?

আরাফার রোজা মাত্র ১টি। প্রতি বছর জিলহজ মাসের ৯ তারিখকে “আরাফার দিন” বা “ইয়াউমে আরাফা” বলা হয়। এই দিন হজযাত্রীরা আরাফার ময়দানে অবস্থান করেন। আর যারা হজে যাননি — অর্থাৎ দেশে থাকা মুসলিমদের জন্য — এই একটি রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ সুন্নত ইবাদত।

অনেকে বিভ্রান্তিতে পড়েন যে আরাফার রোজা ২টি নাকি ৯টি। আসলে আরাফার রোজা নির্দিষ্টভাবে ১টি — শুধু ৯ই জিলহজ। তবে জিলহজ মাসের প্রথম ৯ দিন নফল রোজা রাখা মুস্তাহাব, সেটি আলাদা বিষয়।

আরাফার রোজার ফজিলত কী?

আরাফার রোজার ফজিলত অন্য যেকোনো নফল রোজার চেয়ে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রাসুলুল্লাহ ﷺ এই রোজার মাহাত্ম্য স্পষ্টভাবে বলে গেছেন।

আরাফার রোজার প্রধান ফজিলতসমূহ:

  • দুই বছরের গুনাহ মাফ: বিগত এক বছর ও আগামী এক বছরের সগিরা গুনাহ মাফ হয়।
  • দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ দিন: আরাফার দিন আল্লাহ সবচেয়ে বেশি মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন।
  • শয়তানের পরাজয়ের দিন: এই দিন শয়তান সবচেয়ে বেশি অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়।
  • ইবাদতের সর্বোচ্চ সুযোগ: হজের মৌসুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন।

আরাফার রোজার হাদিস

হাদিস ১ — দুই বছরের গুনাহ মাফ (সহিহ মুসলিম)

হজরত আবু কাতাদা আনসারি (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ কে আরাফার দিনের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন:

“আরাফার দিনের রোজা বিগত এক বছর ও আগামী এক বছরের (সগিরা) গুনাহ মাফ করে দেয়।” — সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১১৬২

হাদিস ২ — শ্রেষ্ঠ নফল রোজা (সহিহ মুসলিম)

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, রমজানের পর সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ রোজা হলো মহররম মাসের রোজা। তবে আরাফার রোজা একক দিনের হিসেবে সবচেয়ে বেশি পাপমোচনকারী রোজা। — সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১১৬৩

হাদিস ৩ — আরাফার দিনের বিশেষত্ব (সহিহ মুসলিম)

হজরত আয়িশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“আরাফার দিনের চেয়ে বেশি কোনো দিন আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন না।” — সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৩৪৮

⚠️ গুরুত্বপূর্ণ নোট: এই রোজা শুধু সগিরা (ছোট) গুনাহ মাফ করে। কবিরা (বড়) গুনাহের জন্য তওবা করতে হবে।

আরাফার রোজা কখন রাখতে হয়?

আরাফার রোজা রাখতে হয় ৯ই জিলহজ তারিখে। এই দিন সূর্যোদয়ের আগে থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজার নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়।

২০২৬ সালে আরাফার রোজার তারিখ

বিবরণতারিখ
৯ই জিলহজ / আরাফার দিন২৬ মে, ২০২৬ (সোমবার)
ঈদুল আজহা (১০ই জিলহজ)২৭ মে, ২০২৬ (মঙ্গলবার)

📌 বাংলাদেশে চাঁদ দেখার উপর ভিত্তি করে তারিখ ১ দিন আগে বা পরে হতে পারে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের ঘোষণা অনুসরণ করুন।

আরাফার রোজার নিয়ত কী?

আরাফার রোজার জন্য বিশেষ কোনো আরবি নিয়ত বাধ্যতামূলক নয়। মনে মনে নিয়ত করাই যথেষ্ট। তবে মুখে নিয়ত করতে চাইলে বাংলায় বা আরবিতে বলতে পারেন:

বাংলা নিয়ত:

“আমি আগামীকাল (বা আজ) জিলহজের ৯ তারিখ আরাফার সুন্নত রোজা রাখার নিয়ত করছি।”

আরবি নিয়ত (প্রচলিত):

نَوَيْتُ صَوْمَ يَوْمِ عَرَفَةَ سُنَّةً لِلَّهِ تَعَالَى “নাওয়াইতু সাওমা ইয়াওমি আরাফাতা সুন্নাতান লিল্লাহি তা’আলা।”

📌 ফিকহি মাসআলা: সুবহে সাদিকের আগে নিয়ত করা উত্তম। তবে দুপুরের আগেও নিয়ত করা যায় যদি কিছু না খাওয়া থাকে।

আরাফার রোজা রাখার নিয়ম

আরাফার রোজা রমজানের রোজার মতোই নিয়মে রাখতে হয়। নিচে ধাপে ধাপে নিয়মগুলো দেওয়া হলো:

ধাপ ১: সূর্যোদয়ের আগে সেহেরি খান এবং নিয়ত করুন।

ধাপ ২: সারাদিন পানাহার, ধূমপান ও যাবতীয় রোজাভঙ্গকারী কাজ থেকে বিরত থাকুন।

ধাপ ৩: বেশি বেশি দোয়া, জিকির, তওবা ও ইস্তেগফার করুন — বিশেষত আসরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত।

ধাপ ৪: সূর্যাস্তের পর ইফতার করুন।

ধাপ ৫: এই দিন বেশি বেশি এই দোয়া পড়ুন:

لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির।”

হাজিদের জন্য কি আরাফার রোজা আছে?

না। যারা হজ পালন করছেন, তাদের জন্য আরাফার দিন রোজা রাখা মাকরুহ। কারণ এই দিন আরাফার ময়দানে অবস্থান করা হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুকন। রোজা রাখলে দুর্বলতার কারণে দোয়া ও ইবাদতে বিঘ্ন ঘটতে পারে।

হজরত আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেন: রাসুলুল্লাহ ﷺ আরাফায় অবস্থানকালে রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন। — সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ২৪৪০; সহিহ ইবনে খুজাইমাহ

জিলহজ মাসের প্রথম ৯ দিনের রোজা

অনেকে জিজ্ঞেস করেন, জিলহজের প্রথম ৯ দিন কি রোজা রাখা যায়?

হ্যাঁ, যায়। রাসুলুল্লাহ ﷺ জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের আমলকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। এই দিনগুলোতে রোজা রাখা নফল ইবাদত হিসেবে মুস্তাহাব।

তবে লক্ষ রাখুন:

  • ১০ই জিলহজ (ঈদুল আজহার দিন) রোজা রাখা হারাম
  • ১১, ১২, ১৩ই জিলহজ (আইয়ামে তাশরিক) রোজা রাখা সাধারণ মতে নিষিদ্ধ
  • ৯ই জিলহজ (আরাফার দিন) রোজা রাখা সর্বোচ্চ ফজিলতপূর্ণ।

জিলহজ মাসের রোজার সারণি:

তারিখবিধান
১ম থেকে ৮ই জিলহজমুস্তাহাব (নফল)
৯ই জিলহজ (আরাফার দিন)বিশেষ সুন্নত — সর্বোচ্চ ফজিলত
১০ই জিলহজ (ঈদের দিন)হারাম
১১–১৩ই জিলহজ (আইয়ামে তাশরিক)নিষিদ্ধ

আরাফার রোজা কি মহিলারা রাখতে পারবেন?

হ্যাঁ। মহিলারা আরাফার রোজা রাখতে পারবেন। তবে যদি ওই দিন ঋতুস্রাব বা প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণ চলতে থাকে, তাহলে রোজা রাখা যাবে না — এটি সব রোজার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

আরাফার দিন কোন আমলগুলো বেশি করবেন?

শুধু রোজা নয়, এই দিন আরও কিছু বিশেষ আমল করা উচিত:

  • তাকবির পাঠ: “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ” — ৯ই জিলহজ ফজর থেকে ১৩ই জিলহজ আসর পর্যন্ত।
  • বেশি বেশি ইস্তেগফার ও তওবা করা।
  • দোয়া ও কান্নাকাটি করা, বিশেষত আসরের পর।
  • কুরআন তেলাওয়াত করা।
  • সদকা-খয়রাত করা।

আরাফার রোজা সম্পর্কে সাধারণ ভুল ধারণা

অনেকের মধ্যে কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। চলুন সেগুলো পরিষ্কার করি:

ভুল ধারণা ১: “আরাফার রোজা ২টি রাখতে হয়।”

সঠিক তথ্য: আরাফার রোজা শুধু ১টি — ৯ই জিলহজ।

ভুল ধারণা ২: “হাজিরাও আরাফার রোজা রাখবেন।”

সঠিক তথ্য: হজরত আবু হুরাইরার হাদিস অনুযায়ী হাজিদের জন্য এই রোজা মাকরুহ।

ভুল ধারণা ৩: “আরাফার রোজায় কবিরা গুনাহও মাফ হয়।”

সঠিক তথ্য: শুধু সগিরা (ছোট) গুনাহ মাফ হয়। কবিরা গুনাহের জন্য সত্যিকারের তওবা করতে হবে।

ভুল ধারণা ৪: “আরাফার রোজা না রাখলে গুনাহ হয়।”

সঠিক তথ্য: এটি ফরজ নয়, সুন্নত ও মুস্তাহাব। না রাখলে গুনাহ নেই, তবে বিশাল ফজিলত থেকে বঞ্চিত হওয়া হয়।

আরাফার রোজা ও আশুরার রোজার পার্থক্য

অনেকে আরাফার রোজা ও আশুরার রোজার মধ্যে গুলিয়ে ফেলেন। নিচে পার্থক্য দেখুন:

বিষয়আরাফার রোজাআশুরার রোজা
তারিখ৯ই জিলহজ১০ই মহররম (+ ৯ বা ১১ই)
রোজার সংখ্যা১টি২টি (৯ ও ১০ মহররম)
গুনাহ মাফবিগত + আগামী ১ বছরবিগত ১ বছর
ফজিলতদুই বছরের গুনাহ মাফএক বছরের গুনাহ মাফ
উৎসসহিহ মুসলিম ১১৬২সহিহ মুসলিম ১১৬২

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন ১: আরাফার রোজা কি সুন্নত নাকি নফল?

উত্তর: আরাফার রোজা মুয়াক্কাদা সুন্নত — অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে নিয়মিত রাখতেন এবং উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন। এটি ফরজ নয়, কিন্তু এর ফজিলত অসামান্য।

প্রশ্ন ২: আরাফার রোজা কি প্রতি বছর রাখা জরুরি?

উত্তর: জরুরি নয়, কিন্তু প্রতি বছর রাখা অত্যন্ত উত্তম। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, এই রোজা দুই বছরের গুনাহ মাফ করে — তাই প্রতি বছর এই সুযোগ কাজে লাগানো বুদ্ধিমানের কাজ।

প্রশ্ন ৩: আরাফার রোজার দিন কি ঈদের কেনাকাটা করা যাবে?

উত্তর: হ্যাঁ, কেনাকাটা করা যাবে — রোজা ভাঙার কোনো কারণ নেই। তবে আরাফার দিন যতটুকু সম্ভব ইবাদতে মনোযোগ দেওয়া উচিত।

প্রশ্ন ৪: যদি কেউ ৯ই জিলহজ রোজা রাখতে না পারেন, তাহলে কি পরে কাজা করা যাবে?

উত্তর: না। আরাফার রোজা একটি নির্দিষ্ট সময়ের সাথে সম্পর্কিত সুন্নত, তাই এটি কাজা করার বিধান নেই। সুযোগ পেলে পরবর্তী বছর রাখুন।

প্রশ্ন ৫: ডায়াবেটিস রোগী কি আরাফার রোজা রাখতে পারবেন?

উত্তর: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিন। ইসলামে অসুস্থ ব্যক্তির জন্য ওজর আছে। স্বাস্থ্যের ক্ষতি হলে রোজা না রেখে অন্যভাবে ইবাদত করুন।

প্রশ্ন ৬: আরাফার রোজায় কি সেহেরি খাওয়া জরুরি?

উত্তর: সেহেরি খাওয়া সুন্নত ও উত্তম, তবে বাধ্যতামূলক নয়। সুবহে সাদিকের আগে নিয়ত করলেই রোজা হয়।

প্রশ্ন ৭: ২০২৬ সালে বাংলাদেশে আরাফার রোজা কবে?

উত্তর: ২০২৬ সালে বাংলাদেশে আরাফার দিন সম্ভাব্যভাবে ২৬ মে, ২০২৬ (সোমবার)। তবে চাঁদ দেখার উপর নির্ভর করে তারিখ পরিবর্তন হতে পারে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের অফিসিয়াল ঘোষণা অনুসরণ করুন।

প্রশ্ন ৮: জিলহজের কত তারিখে রোজা রাখা যায়?

উত্তর: জিলহজের ১ থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত রোজা রাখা মুস্তাহাব। ১০ তারিখ (ঈদুল আজহা) রোজা রাখা হারাম।

শেষকথা

আরাফার রোজা ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নফল ইবাদত। মাত্র একটি রোজায় দুই বছরের সগিরা গুনাহ মাফের সুযোগ পাওয়া মহান আল্লাহর অসীম রহমত। রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে এই রোজার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই প্রতিটি সুস্থ মুসলিমের উচিত প্রতি বছর ৯ই জিলহজ এই বিশেষ রোজাটি রাখা এবং দিনটিকে দোয়া, তওবা ও ইবাদতে পরিপূর্ণ করে তোলা।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স

  • সহিহ মুসলিম, কিতাবুস সিয়াম, হাদিস নং ১১৬২, ১১৬৩, ১৩৪৮
  • সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২৪৩৮–২৪৪০
  • সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৭৪৯
  • সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ১৭৩০
  • ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ — islamicfoundation.gov.bd
  • বাংলাদেশ জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি

এই আর্টিকেলটি কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে লেখা হয়েছে। কোনো ধর্মীয় বিষয়ে সন্দেহ হলে স্থানীয় বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নিন।

Leave a Comment

Scroll to Top