পদ্মিনী একাদশী, যা পুরুষোত্তমী একাদশী বা মলমাসী একাদশী নামেও পরিচিত, হিন্দু ধর্মে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্রত। প্রতি তিন বছর পর পর আসা অধিক মাসে (মলমাস বা পুরুষোত্তম মাস) এই একাদশী পালিত হয়, যা এর মাহাত্ম্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ২০২৬ সালে এই পুণ্য তিথি কবে পড়েছে, এর পারণের সময় কখন এবং এই ব্রতের মাহাত্ম্যই বা কী—এই সকল প্রশ্নের উত্তর নিয়েই আমাদের আজকের এই বিস্তারিত আলোচনা।
পদ্মিনী একাদশী ২০২৬ কবে?
২০২৬ সালে পদ্মিনী একাদশী ব্রত পালিত হবে ২৭শে মে, বুধবার (বাংলা ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩)।
একাদশী তিথি কখন শুরু ও শেষ হবে?
- তিথি শুরু: ২৬শে মে, মঙ্গলবার।
- তিথি শেষ: ২৭শে মে, বুধবার।
দ্রষ্টব্য: উদয়া তিথি অনুসারে, অর্থাৎ সূর্যোদয়ের সময় একাদশী তিথি থাকায়, ব্রতটি ২৭শে মে পালিত হবে।
একাদশী পারণের সময় (Ekadashi Paran Time in Bangladesh)
সঠিক সময়ে পারণ বা ব্রত ভঙ্গ করা একাদশী পালনের একটি অপরিহার্য অঙ্গ।
- পারণের দিন: ২৮শে মে, বৃহস্পতিবার।
- ইসকন (ISKCON) মতে পারণের সময়: পরদিন ভোর ৫টা ১১ মিনিট থেকে সকাল ৮টা ২৯ মিনিটের মধ্যে।
- স্মার্ত, গোস্বামী ও নিম্বার্ক মতে পারণের সময়: পরদিন সূর্যোদয় থেকে সকাল ৯টা ১০ মিনিটের মধ্যে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: উল্লেখিত সময়সূচী বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য। স্থানভেদে সময়ের সামান্য তারতম্য হতে পারে।
পদ্মিনী একাদশীর গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য
পদ্মিনী একাদশী অন্য সকল একাদশী থেকে অধিক ফলদায়ী বলে মনে করা হয়। যেহেতু এটি ভগবান বিষ্ণুর প্রিয় পুরুষোত্তম মাসে অনুষ্ঠিত হয়, তাই এর মাহাত্ম্যও বিশেষ।
- সর্বপাপ বিনাশ: এই ব্রত নিষ্ঠার সাথে পালন করলে সকল প্রকার পাপ থেকে মুক্তি লাভ করা যায়।
- মনস্কামনা পূরণ: পদ্মিনী একাদশী ব্রত পালনকারীর সকল মনস্কামনা, বিশেষ করে পুত্র লাভের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয় বলে শাস্ত্রে বর্ণিত আছে।
- যজ্ঞ ও তপস্যার সমান ফল: শাস্ত্র মতে, এই একটি ব্রত পালন করলে সকল যজ্ঞ, তপস্যা এবং দানের সমান পুণ্যফল লাভ করা যায়।
- বিষ্ণুর আশীর্বাদ ও বৈকুণ্ঠ প্রাপ্তি: এই ব্রত পালনকারী ভগবান বিষ্ণুর বিশেষ কৃপা লাভ করেন এবং মৃত্যুর পর বৈকুণ্ঠ ধামে গমন করেন।
- পিতৃপুরুষের মুক্তি: এই ব্রত পালনের ফলে ব্রতকারীর পিতৃপুরুষরাও মোক্ষ লাভ করে থাকেন।
পদ্মিনী একাদশী ব্রত কথা
ত্রেতা যুগে মহিষ্মতী পুরীর রাজা কৃতবীর্য নিঃসন্তান ছিলেন। তাঁর হাজার স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও তিনি পুত্রসুখ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। সন্তান লাভের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে, তিনি তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী পদ্মিনীকে নিয়ে গন্ধমাদন পর্বতে কঠোর তপস্যা শুরু করেন। হাজার হাজার বছর তপস্যার পরেও যখন ফল মিলল না, তখন রাণী পদ্মিনী দেবী অনসূয়ার শরণাপন্ন হন।
দেবী অনসূয়া তাঁকে প্রতি বত্রিশ মাস অন্তর আসা পুরুষোত্তম মাসের শুক্লপক্ষের পদ্মিনী একাদশী ব্রত পালনের কথা বলেন। রাণীর শ্রদ্ধাপূর্ণ ব্রত পালনে সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান বিষ্ণু গরুড়ে আরোহণ করে তাঁর সামনে উপস্থিত হন এবং বর চাইতে বলেন। রাণী পদ্মিনী নিজের জন্য কিছু না চেয়ে তাঁর স্বামীর জন্য এমন এক পুত্র প্রার্থনা করেন যিনি সর্বগুণসম্পন্ন এবং ত্রিভুবনে সম্মানীয় হবেন।
ভগবানের আশীর্বাদে তাঁদের কার্তবীর্যার্জুন নামে এক পুত্র জন্মগ্রহণ করেন, যিনি ছিলেন অত্যন্ত বলশালী এবং এই কার্তবীর্যই একসময় লঙ্কাপতি রাবণকে পরাজিত ও বন্দী করেছিলেন।
পদ্মিনী একাদশী পালনের নিয়মাবলী
সঠিক নিয়ম মেনে ব্রত পালন করলে পূর্ণ ফল লাভ করা যায়।
ব্রতের আগের দিন (দশমী)
- একবার নিরামিষ আহার গ্রহণ করুন।
- কাঁসার পাত্রে ভোজন, মসুর ডাল, ছোলা, শাক এবং পেঁয়াজ-রসুন বর্জন করুন।
- শারীরিক ও মানসিকভাবে শুদ্ধ থাকুন এবং ব্রহ্মচর্য পালন করুন।
একাদশীর দিন
- উপবাস: সূর্যোদয় থেকে দ্বাদশী তিথির পারণের সময় পর্যন্ত নিরম্বু (জল ছাড়া) বা সজল (শুধু জল) উপবাস পালন করুন। অসুস্থ বা অশক্ত ব্যক্তিরা ফলমূল গ্রহণ করতে পারেন।
- পূজা: সকালে স্নান সেরে পরিষ্কার বস্ত্রে ভগবান বিষ্ণুর পূজা করুন। হলুদ ফুল, ফল, ধূপ, দীপ ও চন্দন দিয়ে পূজা নিবেদন করুন।
- মন্ত্র জপ: “ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায় নমঃ” – এই মন্ত্রটি সারাদিন ধরে জপ করুন।
- সৎকর্ম: এই দিনে দান করা, শাস্ত্র পাঠ (বিশেষ করে গীতার একাদশ অধ্যায়) এবং ভগবানের নাম-গুণ কীর্তন করা অত্যন্ত পুণ্যের কাজ।
- জাগরণ: রাতে জেগে থেকে ভগবানের নাম সংকীর্তন করলে বিশেষ ফল লাভ হয়।
পারণের দিন (দ্বাদশী)
- সকালে স্নান সেরে পূজা নিবেদন করুন।
- ব্রাহ্মণ বা দরিদ্রদের ভোজন করান ও দান করুন।
- নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জল ও প্রসাদ গ্রহণ করে ব্রত ভঙ্গ করুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন: পদ্মিনী একাদশী কি প্রতি বছর হয়?
উত্তর: না, পদ্মিনী একাদশী প্রতি বছর হয় না। এটি কেবল মাত্র অধিক মাস বা মলমাসে পালিত হয়, যা সাধারণত প্রতি তিন বছর পর পর আসে।
প্রশ্ন: এই একাদশীতে কী কী খাওয়া নিষেধ?
উত্তর: একাদশীর দিন চাল, ডাল, গম এবং যেকোনো ধরণের শস্যদানা ও আমিষ খাবার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ব্রতের আগের দিন (দশমী) থেকেই মসুর ডাল, ছোলা, পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি বর্জন করা উচিত।
প্রশ্ন: একাদশী ব্রত কারা পালন করতে পারেন?
উত্তর: জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে ৮ থেকে ৮০ বছর বয়সী যেকোনো সুস্থ ব্যক্তি এই ব্রত পালন করতে পারেন।
প্রশ্ন: পারণ মন্ত্র কি?
উত্তর: পারণ করার সময় এই মন্ত্রটি পাঠ করা হয়: “অজ্ঞানতিমিরান্ধস্য ব্রতেনানেন কেশব। প্রসীদ সুমুখো নাথ জ্ঞানদৃষ্টিপ্রদো ভব।।”
এই বিস্তারিত তথ্যাবলী আপনাকে ২০২৬ সালের পদ্মিনী একাদশী সঠিকভাবে পালন করতে সহায়তা করবে। ভক্তি ও নিষ্ঠার সাথে এই ব্রত পালন করে ভগবান বিষ্ণুর অপার কৃপা লাভ করুন।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”
