পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ এলেই বাংলাদেশের অনেক মুসলিম পরিবারে একটি অত্যন্ত পরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দেয়— “কোরবানির গরুর সাথে আকিকা দেওয়া যাবে কি?” নতুন সন্তান পৃথিবীতে আসার পর আকিকা দেওয়া সুন্নাত। অনেকেই চান কোরবানির পশুর সাথেই সন্তানের আকিকা আদায় করে নিতে। কিন্তু সঠিক নিয়ম না জানার কারণে অনেকেই দ্বিধায় ভোগেন।
আপনি যদি কোরবানির পশুর সাথে আকিকা দেওয়ার সঠিক নিয়ম, ভাগ বা শেয়ার বন্টন এবং মাসআলা সম্পর্কে বিস্তারিত ও সঠিক তথ্য খুঁজছেন, তবে এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য।
হ্যাঁ, ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী কোরবানির গরুর সাথে আকিকা দেওয়া সম্পূর্ণ জায়েজ এবং এতে কোরবানি ও আকিকা দুটোই সহিহ বা শুদ্ধ হবে। গরু, মহিষ বা উটের মতো বড় পশুতে সর্বোচ্চ ৭টি ভাগ থাকে। এই ৭ ভাগের মধ্যে কোরবানির পাশাপাশি আকিকার অংশও রাখা যায়। নিয়ম অনুযায়ী— ছেলের আকিকার জন্য ২ ভাগ (তবে সামর্থ্য না থাকলে ১ ভাগ দিলেও আদায় হবে) এবং মেয়ের জন্য ১ ভাগ দিতে হয়। তবে প্রধান শর্ত হলো, পশুতে অংশগ্রহণকারী সকল শরিকের নিয়ত একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি (ইবাদত) হতে হবে; কেবল গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে কেউ শরিক হলে কারও কোরবানি বা আকিকা কবুল হবে না।
কোরবানির গরুর সাথে আকিকা দেওয়া কি জায়েজ?
ইসলামি ফিকহ ও ফতোয়া (বিশেষ করে হানাফি মাজহাব) অনুযায়ী, একই পশুতে কোরবানি এবং আকিকা একসাথে আদায় করা সম্পূর্ণ বৈধ। কোরবানি যেমন মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়, আকিকায়ও উদ্দেশ্য থাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও শুকরিয়া আদায়। দুটি ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য এক হওয়ায় একই পশুতে উভয় নিয়ত করা জায়েজ।
প্রখ্যাত ফতোয়ার কিতাব ‘রদ্দুল মুহতার’ (৬/৩২৬) এবং ‘ইলাউস সুনান’ (১৭/১২৬)-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোরবানির গরুতে আকিকার নিয়তে শরিক হলে কোরবানি ও আকিকা দুটোই শুদ্ধ হবে। প্রখ্যাত তাবেয়ি ইবনে সিরিন এবং হাসান বসরি (রহ.) থেকেও কোরবানির সাথে আকিকা আদায় করার বৈধতা প্রমাণিত।
কোরবানির পশুতে আকিকার ভাগ বা শেয়ার নির্ধারণের নিয়ম
কোরবানির গরুর সাথে আকিকা দিতে চাইলে শেয়ার বা ভাগ নির্ধারণের ক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়তের সুনির্দিষ্ট নিয়ম মানতে হবে:
- ছেলে সন্তানের আকিকার ভাগ: সুন্নত অনুযায়ী ছেলে সন্তানের জন্য ২টি ছাগল বা ভেড়া আকিকা দিতে হয়। তাই কোরবানির গরুতে শরিক হলে ছেলের জন্য ২টি ভাগ নেওয়া উত্তম। তবে যদি আর্থিক সামর্থ্য না থাকে, তবে ছেলের জন্য ১টি ভাগ দিলেও আকিকা আদায় হয়ে যাবে।
- মেয়ে সন্তানের আকিকার ভাগ: মেয়ে সন্তানের আকিকার জন্য কোরবানির গরুতে ১টি ভাগ নিতে হবে।
উদাহরণস্বরূপ: একটি গরুতে মোট ৭টি ভাগ থাকে। আপনি চাইলে ৩ ভাগে আপনার পরিবারের কোরবানি, ২ ভাগে আপনার ছেলের আকিকা এবং ১ ভাগে মেয়ের আকিকা দিতে পারেন। বাকি ১ ভাগ অন্য কাউকে কোরবানির জন্য দিতে পারেন বা নিজেও নিতে পারেন। মোট কথা, ৭ ভাগের বেশি হওয়া যাবে না।
কোরবানির সাথে আকিকা দিলে নিয়ত কীভাবে করবেন?
যেকোনো ইবাদতের প্রাণ হলো নিয়ত। কোরবানির পশুর সাথে আকিকা দেওয়ার সময় নিয়তের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে:
১. পশু জবাইয়ের আগে মনে মনে সুনির্দিষ্ট নিয়ত করতে হবে যে, পশুর কোন ভাগটি কোরবানির জন্য এবং কোনটি সন্তানের আকিকার জন্য। মুখে উচ্চারণ করা জরুরি নয়, মনের ইচ্ছাই যথেষ্ট।
২. কোনো শরিকের নিয়ত যেন শুধু ‘সস্তায় গোশত পাওয়া’ বা ‘গোশত খাওয়া’ না হয়। সবার নিয়ত হতে হবে খালেস ইবাদত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি।
গোশত বণ্টন ও খাওয়ার নিয়ম
অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে আকিকার গোশত কে খাবে বা কীভাবে বণ্টন করতে হবে?
- ওজন করে বণ্টন: যেহেতু গরুতে একাধিক শরিক থাকে, তাই জবাইয়ের পর সম্পূর্ণ গোশত পাল্লা দিয়ে সমানভাবে মেপে বণ্টন করতে হবে। অনুমান করে ভাগ করা শরিয়তে নিষিদ্ধ।
- আকিকার গোশত কে খেতে পারবে? কোরবানির গোশতের মতোই আকিকার গোশত ৩ ভাগ করা উত্তম (নিজেদের জন্য, আত্মীয়-স্বজনের জন্য এবং গরিব-মিসকিনদের জন্য)। সন্তানের পিতা-মাতা, দাদা-দাদী, নানা-নানী এবং পরিবারের অন্য সবাই এই গোশত খেতে পারবেন। এতে কোনো শরয়ি বাধা নেই।
⚠️ শর্তাবলি ও সতর্কতা (জরুরি মাসআলা)
কোরবানি ও আকিকা একসাথে দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা মেনে চলা আবশ্যক:
- হালাল উপার্জন: সকল শরিকের উপার্জনের টাকা সম্পূর্ণ হালাল হতে হবে। যদি ৭ জনের মধ্যে ১ জনেরও টাকা হারাম হয়, তবে বাকি ৬ জনের কোরবানি বা আকিকা—কোনোটাই কবুল হবে না।
- পশুর বয়স ও সুস্থতা: কোরবানির গরুর বয়স কমপক্ষে ২ বছর হতে হবে। পশু হৃষ্টপুষ্ট ও সুস্থ হওয়া বাঞ্ছনীয়। খোঁড়া, অন্ধ, কান বা লেজ কাটা এবং রুগ্ন পশু দিয়ে কোরবানি ও আকিকা হবে না।
- সঠিক শরিক নির্বাচন: যার আকিদা ও নিয়ত সঠিক, এমন পরহেজগার ব্যক্তিদের সাথেই শরিকে কোরবানি দেওয়া উচিত।
❓ সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর
১. কোরবানির ছাগল বা ভেড়ার সাথে কি আকিকা দেওয়া যায়?
উত্তর: না। ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা কেবল একজনের নামেই কোরবানি করা যায়। তাই একটি ছাগলে কোরবানি ও আকিকা একসাথে দেওয়া যাবে না। আকিকা ও কোরবানি একসাথে দিতে হলে অবশ্যই গরু, মহিষ বা উট নির্বাচন করতে হবে।
২. বড় হয়ে গেলে কি নিজের আকিকা নিজে কোরবানির সাথে দেওয়া যায়?
উত্তর: হ্যাঁ, যায়। শৈশবে যদি কারো আকিকা করা না হয়ে থাকে, তবে বড় হওয়ার পর সে নিজেই কোরবানির গরুর সাথে ভাগ নিয়ে নিজের আকিকা আদায় করতে পারবে।
৩. আকিকার গোশত কি সন্তানের বাবা-মা খেতে পারবে?
উত্তর: হ্যাঁ, সন্তানের বাবা-মা, দাদা-দাদি এবং পরিবারের সকল সদস্য আকিকার গোশত নিঃসঙ্কোচে খেতে পারবেন। কোরবানির গোশতের মতোই এটি খাওয়া সম্পূর্ণ হালাল।
৪. এক গরুতে সর্বোচ্চ কয়টি আকিকা দেওয়া যাবে?
উত্তর: একটি গরুতে সর্বোচ্চ ৭টি ভাগ থাকে। আপনি চাইলে এই ৭টি ভাগের পুরোটাই বিভিন্ন সন্তানের আকিকার জন্য ব্যবহার করতে পারেন। তবে ৭ ভাগের বেশি দেওয়া কোনোভাবেই জায়েজ নয়।
৫. কোরবানির সাথে আকিকা দিলে কি আলাদা কোনো দোয়া পড়তে হবে?
উত্তর: পশু জবাইয়ের মূল দোয়া (বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার) পড়েই পশু জবাই করতে হবে। যারা জবাই করছেন তারা মনে মনে কোরবানি ও আকিকাদাতাদের নাম স্মরণ করবেন। আলাদা কোনো বিশেষ দোয়া পড়া বাধ্যতামূলক নয়।
শেষকথা
কোরবানির গরুর সাথে আকিকা দেওয়ার নিয়ম ইসলামি শরিয়তে অত্যন্ত সহজ ও সুস্পষ্ট। এটি বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী একটি প্রচলিত ও প্রমাণিত আমল। সঠিক নিয়মে, হালাল টাকায় এবং একনিষ্ঠ নিয়তের সাথে কোরবানি ও আকিকা আদায় করলে মহান আল্লাহ তাআলা তা অবশ্যই কবুল করবেন ইনশাআল্লাহ। তবে আপনার নির্দিষ্ট কোনো জটিল পরিস্থিতি থাকলে স্থানীয় কোনো বিজ্ঞ মুফতি বা ইমাম সাহেবের সাথে সরাসরি পরামর্শ করে নেওয়া সবচেয়ে উত্তম।
বিঃদ্রঃ ইসলামি মাসআলায় নির্ভরযোগ্য মুফতি বা আলেমের পরামর্শ নেওয়া সর্বোত্তম। এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”


