আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। উৎসবমুখর এই পরিবেশে অনেক নতুন মুখ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। আবার প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন এমন তরুণ ভোটারের সংখ্যাও এবার অনেক।
নির্বাচনের মাঠে প্রায়ই শোনা যায় “অমুক প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।” কিন্তু এই জামানত আসলে কী? কেনই বা টাকা বাজেয়াপ্ত হয়? নতুন ভোটার ও সাধারণ মানুষের মনে থাকা এমন সব প্রশ্নের উত্তর থাকছে আজকের এই গাইডে।
নির্বাচনে জামানত কী?
নির্বাচনী জামানত (Election Security Deposit) হলো একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ, যা একজন প্রার্থীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ‘সিরিয়াসনেস’ বা প্রাথমিক নিশ্চয়তা হিসেবে নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা রাখতে হয়।
সহজ কথায়, অহেতুক বা অগম্ভীর প্রার্থীরা যাতে নিছক প্রচার বা মজার ছলে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি না করতে পারেন, সেজন্য এই টাকার অংক জমা নেওয়া হয়। নির্দিষ্ট পরিমাণ ভোট না পেলে এই টাকা আর ফেরত পাওয়া যায় না, একেই ‘জামানত বাজেয়াপ্ত’ বলা হয়।
কোন নির্বাচনে জামানত কত টাকা?
নির্বাচনের ধরন ও ভোটার সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে জামানতের টাকার পরিমাণ ভিন্ন হয়। নিচে একটি চার্ট দেওয়া হলো যা দেখে আপনি সহজেই ধারণা পাবেন:
| নির্বাচনের ধরন | পদের নাম | জামানতের পরিমাণ (টাকা) |
| জাতীয় সংসদ নির্বাচন | সংসদ সদস্য (MP) | ২৫,০০০ টাকা |
| উপজেলা নির্বাচন | চেয়ারম্যান/ভাইস চেয়ারম্যান | ১০,০০০ টাকা |
| পৌরসভা নির্বাচন | মেয়র (২৫ হাজার পর্যন্ত ভোটার) | ১৫,০০০ টাকা |
| মেয়র (২৫,০০১ – ৫০,০০০ ভোটার) | ২০,০০০ টাকা | |
| মেয়র (৫০,০০১ – ১,০০,০০০ ভোটার) | ২৫,০০০ টাকা | |
| মেয়র (১ লাখের বেশি ভোটার) | ৩০,০০০ টাকা | |
| কাউন্সিলর | ৫,০০০ টাকা | |
| ইউনিয়ন পরিষদ | চেয়ারম্যান | ৯,৫০০ টাকা |
| মেম্বার/সংরক্ষিত নারী সদস্য | ১,০০০ টাকা |
নোট: এই টাকা নগদ দেওয়া যায় না, ট্রেজারি চালান বা ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে জমা দিতে হয়।
জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার নিয়ম
অনেকেই ভাবেন ভোটে হারলেই বুঝি জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। এটি ভুল ধারণা। জামানত রক্ষার জন্য একজন প্রার্থীকে একটি নির্দিষ্ট শতাংশ ভোট পেতে হয়।
শর্ত: কোনো প্রার্থী যদি নির্বাচনী এলাকায় প্রদত্ত মোট বৈধ ভোটের ৮ ভাগের ১ ভাগ (১২.৫%) ভোট পেতে ব্যর্থ হন, তবে তার জামানত বাজেয়াপ্ত হবে।
উদাহরণ দিয়ে বুঝুন:
ধরুন, আপনার নির্বাচনী এলাকায় মোট কাস্ট হওয়া বৈধ ভোটের সংখ্যা ৮০,০০০।
- জামানত বাঁচাতে আপনাকে পেতে হবে: ৮০,০০০ ÷ ৮ = ১০,০০০ ভোট।
- যদি আপনি ৯,৯৯৯টি ভোটও পান, তবুও আপনার জামানতের টাকা বাজেয়াপ্ত হবে এবং তা সরকারি কোষাগারে চলে যাবে।
জামানতের টাকা জমা ও ফেরতের প্রক্রিয়া
জামানত দেওয়া এবং ফেরত পাওয়ার বিষয়টি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। নিচে সহজভাবে প্রক্রিয়াটি আলোচনা করা হলো:
১. টাকা জমা দেওয়ার নিয়ম
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখের আগেই টাকা জমা দিতে হয়।
- পদ্ধতি: বাংলাদেশ ব্যাংক বা সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সরকারি কোড নম্বরে ট্রেজারি চালান করতে হয়। এছাড়া পে-অর্ডার বা ব্যাংক ড্রাফট-এর মাধ্যমেও রিটার্নিং অফিসারের অনুকূলে টাকা জমা দেওয়া যায়।
- প্রমাণপত্র: মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় চালানের মূল কপি বা রসিদ অবশ্যই সংযুক্ত করতে হয়। এটি ছাড়া মনোনয়নপত্র বাতিল বলে গণ্য হবে।
২. টাকা ফেরত পাওয়ার নিয়ম
নির্বাচন শেষ হওয়ার পর গেজেট প্রকাশের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন করে টাকা ফেরত নেওয়া যায়। কারা টাকা ফেরত পাবেন?
- যিনি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন।
- যিনি পরাজিত হয়েছেন কিন্তু মোট ভোটের অন্তত ১২.৫% (আট ভাগের এক ভাগ) ভোট পেয়েছেন।
- যারা মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের আগেই বা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
পাঠকদের মনে থাকা কিছু কমন প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:
১. বাজেয়াপ্ত হওয়া টাকা কোথায় যায়?
উত্তর: নির্বাচন কমিশন বাজেয়াপ্ত হওয়া জামানতের একটি তালিকা তৈরি করে। এরপর অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেলের অফিসের মাধ্যমে সেই টাকা সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা করা হয়।
২. স্বতন্ত্র প্রার্থীর জামানত কি ভিন্ন হয়?
উত্তর: না, দলীয় প্রার্থী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সবার জন্যই জামানতের টাকার পরিমাণ একই। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় ১% ভোটারের সমর্থন তালিকা জমা দেওয়ার অতিরিক্ত নিয়ম থাকে।
৩. কেউ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলে কী হবে?
উত্তর: যদি কেউ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন, তবে তিনি যেহেতু বিজয়ী, তাই নিয়ম অনুযায়ী তিনি তার জামানতের টাকা ফেরত পাবেন।
৪. নির্বাচনে কি নগদে জামানত দেওয়া যায়?
উত্তর: না। সরাসরি রিটার্নিং অফিসারের হাতে নগদ টাকা দেওয়া যায় না। অবশ্যই ব্যাংক ড্রাফট বা ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জমা দিতে হবে।
শেষ কথা
গণতন্ত্রের চর্চায় নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। জামানতের নিয়মটি রাখা হয়েছে যাতে শুধুমাত্র যোগ্য এবং সিরিয়াস প্রার্থীরাই ভোটের মাঠে আসেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আপনার ভোটাধিকার প্রয়োগ করুন এবং সঠিক প্রার্থীকে বেছে নিন।
নির্বাচন সংক্রান্ত আরও কোনো প্রশ্ন থাকলে নিচে কমেন্ট করতে পারেন। আমরা সঠিক তথ্য দিয়ে আপনাকে সহায়তা করব।
তথ্যসূত্র: নির্বাচন কমিশন আইন এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO).

আমি বিগত ৫ বছর ধরে রাজনীতি এবং অর্থনীতি ও সংবিধান নিয়ে গবেষণা ও লেখালেখি করছি। সরকারি প্রজ্ঞাপন, প্রশাসনিক আইন এবং নির্বাচনী আচরণবিধিকে সহজ ভাষায় সাধারণ মানুষের উপযোগী করে বিশ্লেষণ করতে চেষ্টা করি।

