২০২৬ সালে মানুষ আবার চাঁদে: নাসার আর্টেমিস মিশন ও বাংলাদেশের নতুন দিগন্ত

মানুষ কি আবার চাঁদে যাচ্ছে? হ্যাঁ, দীর্ঘ ৫০ বছর পর মানুষ আবার চাঁদে ফিরছে এবং এবার লক্ষ্য শুধু পদচিহ্ন আঁকা নয়, বরং সেখানে স্থায়ী বসতি গড়া। নাসার আর্টেমিস প্রোগ্রাম (Artemis Program)-এর আওতায় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতেই আর্টেমিস ২ (Artemis II) মিশনের মাধ্যমে ৪ জন নভোচারী চাঁদের কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করতে যাচ্ছেন। এই ঐতিহাসিক যাত্রায় এবার বাংলাদেশও পরোক্ষভাবে যুক্ত হয়েছে ‘আর্টেমিস একর্ডস’-এ স্বাক্ষরের মাধ্যমে।

আর্টেমিস মিশন কী?

আর্টেমিস হলো নাসার নেতৃত্বে পরিচালিত একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মহাকাশ অভিযান। গ্রিক মিথলজি অনুযায়ী আর্টেমিস ছিলেন অ্যাপোলোর যমজ বোন। নাসার বিখ্যাত ‘অ্যাপোলো মিশন’ মানুষকে প্রথম চাঁদে নিয়েছিল, আর এবার ‘আর্টেমিস’ মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে চাঁদে দীর্ঘমেয়াদে বসবাসের জন্য।

এই মিশনের মূল উদ্দেশ্য তিনটি:

  • চাঁদে প্রত্যাবর্তন: ১৯ ৭১ সালে অ্যাপোলো ১৭-এর পর এই প্রথম মানুষ চাঁদের সীমানায় যাচ্ছে।
  • স্থায়ী ঘাটি নির্মাণ: শুধুমাত্র ঘুরে আসা নয়, চাঁদের বুকে ‘আর্টেমিস বেস ক্যাম্প’ তৈরি করা।
  • মঙ্গলের প্রস্তুতি: চাঁদকে ‘লঞ্চপ্যাড’ বা গ্যাস স্টেশন হিসেবে ব্যবহার করে ভবিষ্যতে মঙ্গলে মানুষ পাঠানো।

আর্টেমিস ২: চার নভোচারীর ঐতিহাসিক যাত্রা

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আর্টেমিস ২ মিশন লঞ্চ হওয়ার কথা রয়েছে। এটি একটি লুনার ফ্লাইবাই (Lunar Flyby) মিশন, অর্থাৎ নভোচারীরা চাঁদে অবতরণ করবেন না, বরং চাঁদের চারপাশ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন।

আর্টেমিস ২ মিশনের চারজন নভোচারী:

নাসার ওরিয়ন (Orion) মহাকাশযানে চড়ে যারা ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন:

১. রিড ওয়াইজম্যান (Reid Wiseman): কমান্ডার (যুক্তরাষ্ট্র)।

২. ভিক্টর গ্লোভার (Victor Glover): পাইলট (যুক্তরাষ্ট্র) – চাঁদের সীমানায় যাওয়া প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি।

৩. ক্রিস্টিনা কোক (Christina Koch): মিশন স্পেশালিস্ট (যুক্তরাষ্ট্র) – চাঁদের সীমানায় যাওয়া প্রথম নারী।

৪. জেলেমি হ্যানসেন (Jeremy Hansen): মিশন স্পেশালিস্ট (কানাডা) – যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের প্রথম ব্যক্তি যিনি পৃথিবীর কক্ষপথ ছাড়িয়ে মহাকাশের গভীরে যাচ্ছেন।

তথ্য: এই মিশনে ব্যবহৃত হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রকেট SLS (Space Launch System) এবং লকহিড মার্টিনের তৈরি Orion Spacecraft

কেন মানুষ আবার চাঁদে যাচ্ছে?

অনেকের মনেই প্রশ্ন, এত বছর পর আবার কেন? এর উত্তর শুধু ‘কৌতূহল’ নয়, বরং সুনির্দিষ্ট কিছু বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে:

১. মঙ্গলে যাওয়ার প্রস্তুতি (Gateway to Mars)

চাঁদ হলো মঙ্গলে যাওয়ার প্র্যাকটিস গ্রাউন্ড। নাসার পরিকল্পনা হলো চাঁদের কক্ষপথে ‘লুনার গেটওয়ে’ (Lunar Gateway) নামে একটি ছোট স্পেস স্টেশন তৈরি করা। এটি পৃথিবী ও চাঁদের মাঝখানে একটি ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে কাজ করবে, যা ভবিষ্যতে মঙ্গল অভিযানের খরচ ও ঝুঁকি কমাবে।

২. চাঁদের বুকে পানির সন্ধান

বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর চিরস্থায়ী অন্ধকার গর্তগুলোতে (যেমন: শ্যাকেলটন ক্রেটার) বরফ আকারে প্রচুর পানি জমে আছে।

  • পানীয় জল: নভোচারীদের জন্য পানি।
  • রকেটের জ্বালানি: পানিকে ভেঙে হাইড্রোজেন (জ্বালানি) ও অক্সিজেন (বাতাস) তৈরি করা সম্ভব। এটি চাঁদকে মহাকাশের ‘গ্যাস স্টেশন’-এ পরিণত করবে।

৩. খনিজ সম্পদ আহরণ

চাঁদে সোনা, প্লাটিনাম এবং টাইটানিয়ামের মতো মূল্যবান ধাতুর পাশাপাশি হিলিয়াম-৩ (Helium-3) পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা ভবিষ্যতের পৃথিবীর জ্বালানি সমস্যার সমাধান হতে পারে।

আর্টেমিস মিশনে বাংলাদেশের অবস্থান ও সম্ভাবনা

বাংলাদেশীদের জন্য সুখবর হলো, মহাকাশ গবেষণার এই নতুন যুগে বাংলাদেশ আর দর্শক মাত্র নয়। ২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে নাসার ‘আর্টেমিস একর্ডস’ (Artemis Accords)-এ স্বাক্ষর করে।

বাংলাদেশের জন্য এর মানে কী?

  • ৫জি ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তি: এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশ নাসার কাছ থেকে উন্নত প্রযুক্তি ও ডেটা শেয়ারিং সুবিধা পাবে, যা স্পারসো (SPARRSO) এবং বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ এর জন্য গেমচেঞ্জার হতে পারে।
  • শিক্ষার্থীদের সুযোগ: বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা এখন নাসার বিভিন্ন রিসার্চ প্রজেক্ট ও ইন্টার্নশিপে অগ্রাধিকার পাবে।
  • মহাকাশ গবেষণা: যদিও সরাসরি কোনো বাংলাদেশি নভোচারী এখনই চাঁদে যাচ্ছেন না, তবুও এই চুক্তির ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের নাসার ল্যাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এক নজরে মিশনের ধাপসমূহ

মিশনের নামসময়কাল (সম্ভাব্য)উদ্দেশ্য
আর্টেমিস ১২০২২ (সম্পন্ন)মানুষবিহীন টেস্ট ফ্লাইট, সফলভাবে চাঁদ ঘুরে এসেছে।
আর্টেমিস ২ফেব্রুয়ারি ২০২৬৪ জন নভোচারী নিয়ে চাঁদের কক্ষপথ প্রদক্ষিণ।
আর্টেমিস ৩২০২৮মানুষ (প্রথম নারী) সরাসরি চাঁদের বুকে অবতরণ করবে।
আর্টেমিস ৪২০৩০+লুনার গেটওয়ে স্পেস স্টেশন স্থাপন ও স্থায়ী বেস ক্যাম্প নির্মাণ।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১. আর্টেমিস ২ মিশনে কি মানুষ চাঁদের মাটিতে নামবে?

না। আর্টেমিস ২ মিশনে নভোচারীরা চাঁদের চারপাশে ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। মানুষ চাঁদের মাটিতে নামবে আর্টেমিস ৩ মিশনে, যা ২০২৮ সালের দিকে হতে পারে।

২. বাংলাদেশ কি নাসার সাথে কাজ করছে?

হ্যাঁ, বাংলাদেশ ২০২৫ সালে ‘আর্টেমিস একর্ডস’ সই করেছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ মহাকাশ অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের পার্টনার হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা পাবে।

৩. অ্যাপোলো আর আর্টেমিসের মধ্যে পার্থক্য কী?

অ্যাপোলোর উদ্দেশ্য ছিল শুধু চাঁদে পৌঁছানো (রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত বিজয়)। আর আর্টেমিসের উদ্দেশ্য হলো চাঁদে ‘থাকা’ বা স্থায়ী বসতি গড়া এবং সেখান থেকে মঙ্গলে যাওয়া।

৪. চাঁদে পানি দিয়ে কী হবে?

চাঁদের বরফগলা পানি পান করা ছাড়াও, এটি ভেঙে রকেটের জন্য লিকুইড হাইড্রোজেন ফুয়েল তৈরি করা হবে। পৃথিবী থেকে জ্বালানি নিয়ে যাওয়া অনেক ব্যয়বহুল, তাই চাঁদ থেকেই জ্বালানি সংগ্রহ করা হবে।

লেখকের মন্তব্য

মহাকাশ বিজ্ঞান এখন আর কল্পবিজ্ঞানের বিষয় নয়। আর্টেমিস মিশন মানবজাতিকে ‘মাল্টি-প্ল্যানেটারি স্পিসিস’ বা বহু-গ্রহের প্রাণীতে রূপান্তরের প্রথম ধাপ। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য এখন সময় এসেছে মহাকাশ বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করার এবং এআই (AI) ও রোবোটিক্সের দক্ষতা অর্জন করার, কারণ আগামীর পৃথিবী (এবং চাঁদ) তাদেরই দখলে থাকবে।

উৎস ও তথ্যসূত্র: নাসা অফিসিয়াল ওয়েবসাইট, আর্টেমিস মিশন প্রেস রিলিজ এবং স্পেস.কম (জানুয়ারি ২০২৬ আপডেট)।

Leave a Comment

Scroll to Top