শবে বরাত কবে এই প্রশ্নটি এখন ধর্মপ্রাণ প্রতিটি মুসলমানের মনে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশে পবিত্র শবে বরাত পালিত হবে ফেব্রুয়ারি মাসের ৩ তারিখ, মঙ্গলবার দিবাগত রাতে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই তারিখ নিশ্চিত করা হয়েছে।
এই আর্টিকেলে আমরা জানবো শবে বরাতের সঠিক তারিখ, এই রাতের ফজিলত, করণীয় ও বর্জনীয় কাজ এবং রোজা রাখার সঠিক নিয়ম।
একনজরে: ২০২৬ সালের শবে বরাতের সময়সূচি
| বিষয় | তারিখ ও বার |
| শবে বরাত কবে (রাত)? | ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, মঙ্গলবার দিবাগত রাত |
| সরকারি ছুটি কবে? | ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বুধবার |
| শবে বরাতের রোজা কবে? | ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বুধবার (১৫ই শাবান) |
| ইসলামিক তারিখ | ১৪ই শাবান, ১৪৪৭ হিজরি (রাত) |
নোট: ইসলামি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সূর্যাস্তের পর থেকে নতুন তারিখ বা রাত গণনা শুরু হয়। তাই ৩ ফেব্রুয়ারি মাগরিবের আজানের পর থেকেই পবিত্র শবে বরাতের বা লাইলাতুল বরাতের মহিমান্বিত রজনী শুরু হবে।
শবে বরাত বা লাইলাতুল বরাতের গুরুত্ব ও ফজিলত
‘শবে বরাত’ শব্দটি ফারসি। ‘শাব’ অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ অর্থ মুক্তি বা নিষ্কৃতি। আরবিতে একে বলা হয় ‘লাইলাতুল বরাত’ বা মুক্তির রজনী। হাদিস শরীফে এই রাতকে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ বা শাবান মাসের মধ্য রজনী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই রাতের প্রধান ফজিলতগুলো হলো:
- গুনাহ মাফ: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এই রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টির প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ছাড়া সকল ক্ষমা প্রার্থনাকারীকে ক্ষমা করে দেন। (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৩৯০)
- দোয়া কবুল: এটি বছরের সেই বিশেষ ৫টি রাতের একটি, যে রাতে করা দোয়া আল্লাহ ফিরিয়ে দেন না।
- রমজানের প্রস্তুতি: এই রাত মূলত আসন্ন পবিত্র রমজান মাসের প্রস্তুতির বার্তা নিয়ে আসে।
শবে বরাতে করণীয়: আমল ও ইবাদত
এই রাতে নির্দিষ্ট কোনো গৎবাঁধা ইবাদতের নিয়ম নেই। তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরামদের আমল অনুযায়ী নিচের কাজগুলো করা উত্তম:
১. নফল নামাজ আদায় করা
শবে বরাতের প্রধান আমল হলো নফল নামাজ। সারারাত জেগে তাহাজ্জুদ, সালাতুল তাসবিহ বা সাধারণ নফল নামাজ পড়া যেতে পারে।
- পদ্ধতি: দুই রাকাত করে যত খুশি নফল নামাজ পড়ুন।
- সূরা: যেকোনো সূরা দিয়েই এই নামাজ পড়া যায়। আলাদা কোনো নির্দিষ্ট সূরা বা নিয়ম নেই।
২. কুরআন তিলাওয়াত ও জিকির
নামাজের পাশাপাশি বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করুন। এছাড়া ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’, এবং ‘আল্লাহু আকবার’ এর জিকির করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
৩. কবর জিয়ারত
সম্ভব হলে নিকটাত্মীয়দের কবর জিয়ারত করুন। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই রাতে জান্নাতুল বাকিতে গিয়ে মৃতদের জন্য দোয়া করেছিলেন। তবে দলবেঁধে মাজারে গিয়ে ভিড় করা সুন্নাহ নয়।
৪. ক্ষমা প্রার্থনা (ইস্তিগফার)
যেহেতু এটি মুক্তির রাত, তাই আল্লাহর কাছে নিজের কৃতকর্মের জন্য কায়মনোবাক্যে ক্ষমা চান। বেশি বেশি ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পাঠ করুন।
শবে বরাতের রোজা: কয়টি ও কবে রাখবেন?
শবে বরাতের পরের দিন রোজা রাখা মুস্তাহাব। অর্থাৎ, ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ইবাদত করে ৪ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) রোজা রাখা উত্তম।
এছাড়া প্রতি চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে (আইয়ামে বিজের) রোজা রাখার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। তাই আপনি চাইলে ৩, ৪ ও ৫ ফেব্রুয়ারি এই তিন দিনই রোজা রাখতে পারেন।
শবে বরাতে বর্জনীয় কাজ ও ভুল ধারণা
সমাজে শবে বরাত নিয়ে কিছু ভুল প্রথা চালু আছে, যা ইসলাম সমর্থন করে না। এগুলো থেকে বিরত থাকা জরুরি:
- আতশবাজি ও পটকা ফাটানো: এটি সম্পূর্ণ অনৈসলামিক এবং অর্থের অপচয়।
- হালুয়া-রুটি নিয়ে বাড়াবাড়ি: শবে বরাতে হালুয়া-রুটি খেতেই হবে। এমন কোনো বিধান ইসলামে নেই। এটি উৎসব নয়, ইবাদতের রাত।
- আলোকসজ্জা করা: ঘরবাড়ি বা মসজিদ আলোকসজ্জা করা বিদআত এবং অপচয়ের শামিল।
- নির্দিষ্ট রাকাত নামাজের ধরাবাধা নিয়ম: শবে বরাতে ১০০ রাকাত নামাজ পড়তে হবে বা নির্দিষ্ট সূরা দিয়ে পড়তে হবে। এমন কোনো ভিত্তিহীন কথায় কান দেবেন না।
শেষ কথা
পবিত্র শবে বরাত আমাদের জন্য আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা লাভের এক অনন্য সুযোগ। ২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতটি অবহেলায় না কাটিয়ে ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে অতিবাহিত করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। হালুয়া-রুটি বা উৎসবে মেতে না থেকে আসুন আমরা আল্লাহর কাছে নিজেদের গুনাহ মাফ চাই এবং আগামী দিনের জন্য কল্যাণ কামনা করি।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে শবে বরাতের সঠিক হক আদায় করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
