হোলাষ্টক ২০২৬ কখন শুরু ও শেষ?
হোলাষ্টক ২০২৬ শুরু: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (মঙ্গলবার), সকাল ৭টা ১ মিনিট থেকে
হোলাষ্টক ২০২৬ শেষ: ৩ মার্চ ২০২৬ (মঙ্গলবার), হোলিকা দহনের দিন সন্ধ্যায়
রঙের হোলি: ৪ মার্চ ২০২৬ (বুধবার)
হোলাষ্টক হলো হিন্দু বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ফাল্গুন মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথি থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত মোট ৮টি বিশেষ দিন, যা হোলির ঠিক আগে আসে এবং এই সময়কে ধর্মীয়ভাবে অশুভ বলে বিবেচনা করা হয়।
হোলাষ্টক কী? (Holashtak Kya Hota Hai)
“হোলাষ্টক” শব্দটি দুটি অংশ নিয়ে তৈরি — “হোলি” এবং “অষ্টক” (অর্থাৎ আট)। মানে হলো হোলির আগের আটটি বিশেষ দিন।
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই আট দিনে শুভ ও মাঙ্গলিক কাজকর্ম এড়িয়ে চলা উচিত। বিয়ে, গৃহপ্রবেশ, নামকরণ, মুণ্ডন সংস্কার বা নতুন ব্যবসা শুরু করার মতো কাজ এই সময় করা হয় না।
এটি মূলত উত্তর ভারতে, বিশেষত পাঞ্জাব, রাজস্থান, হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালিত হয়। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেও এই বিষয়ে সচেতনতা ক্রমশ বাড়ছে।
হোলাষ্টক ২০২৬-এর সম্পূর্ণ তারিখ তালিকা
| দিন | তারিখ | বিশেষত্ব |
|---|---|---|
| ১ম দিন (অষ্টমী) | ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (মঙ্গলবার) | হোলাষ্টক শুরু, হোলিকা স্থান নির্বাচন |
| ২য় দিন (নবমী) | ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (বুধবার) | কাঠ সংগ্রহ শুরু |
| ৩য় দিন (দশমী) | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (বৃহস্পতিবার) | — |
| ৪র্থ দিন (একাদশী) | ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (শুক্রবার) | — |
| ৫ম দিন (দ্বাদশী) | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (শনিবার) | — |
| ৬ষ্ঠ দিন (ত্রয়োদশী) | ১ মার্চ ২০২৬ (রবিবার) | — |
| ৭ম দিন (চতুর্দশী) | ২ মার্চ ২০২৬ (সোমবার) | — |
| ৮ম দিন (পূর্ণিমা) | ৩ মার্চ ২০২৬ (মঙ্গলবার) | হোলাষ্টক সমাপ্তি, হোলিকা দহন |
| রঙের হোলি | ৪ মার্চ ২০২৬ (বুধবার) | ধুলেন্ডি / রঙোৎসব |
নোট: ২০২৬ সালে তিথি পড়ার কারণে হোলাষ্টক কার্যত ৯ দিন ব্যাপী অনুভূত হলেও ধর্মীয়ভাবে এটি ৮ দিনের পর্ব।
হোলাষ্টক কেন অশুভ মনে করা হয়?
হোলাষ্টককে অশুভ মনে করার পেছনে দুটি প্রধান পৌরাণিক কাহিনী আছে।
১. ভক্ত প্রহ্লাদের কাহিনী (বিষ্ণু পুরাণ)
রাক্ষস রাজ হিরণ্যকশিপু নিজেকে ঈশ্বর বলে দাবি করতেন এবং চাইতেন তাঁর পুত্র প্রহ্লাদও তাকেই পূজা করুক। কিন্তু প্রহ্লাদ ছিলেন ভগবান বিষ্ণুর পরম ভক্ত। এই কারণে ফাল্গুন শুক্লপক্ষের অষ্টমী থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত টানা আট দিন হিরণ্যকশিপু তাঁকে নানাভাবে কষ্ট দিয়েছিলেন — আগুনে ফেলা, বিষ দেওয়া, হাতির পায়ে পিষ্ট করা ইত্যাদি। এই কারণে এই আট দিনকে কষ্ট ও অশুভ সময়ের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। শেষে হোলিকা দহনের রাতে ভগবান বিষ্ণুর কৃপায় প্রহ্লাদ বেঁচে যান এবং হোলিকা জ্বলে যায়।
২. কামদেবের দাহ (শিব পুরাণ)
শিব পুরাণ অনুযায়ী, দেবী সতীর মৃত্যুর পর শিব গভীর ধ্যানে মগ্ন হয়ে যান। দেবী পার্বতী তাঁকে বিবাহ করতে চাইলে কামদেবকে পাঠানো হয় শিবের মনে প্রেমের অনুভূতি জাগাতে। কিন্তু কামদেবের বাণে ধ্যানভঙ্গ হলে ক্ষুব্ধ শিব তৃতীয় নেত্র খুলে কামদেবকে ভস্ম করে দেন — এই ঘটনাও ঘটেছিল ফাল্গুন শুক্লপক্ষের অষ্টমীতে। তাই এই দিন থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত এই আট দিনকে অশুভ ধরা হয়।
হোলাষ্টকে কোন গ্রহের প্রভাব বাড়ে?
হিন্দু জ্যোতিষশাস্ত্র মতে, হোলাষ্টকের আট দিনে বিভিন্ন গ্রহ উত্তেজিত বা উগ্র অবস্থায় থাকে:
- অষ্টমী: চন্দ্র
- নবমী: সূর্য
- দশমী: শনি
- একাদশী: শুক্র
- দ্বাদশী: বৃহস্পতি
- ত্রয়োদশী: বুধ
- চতুর্দশী: মঙ্গল
- পূর্ণিমা: রাহু
এই কারণেই এই সময়ে মাঙ্গলিক কাজ এড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
হোলাষ্টকে কী করবেন না?
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই আট দিনে নিচের কাজগুলো করা থেকে বিরত থাকুন:
- বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠান: বিবাহ, বিবাহ নিশ্চিত করা বা রিং সেরিমনি করবেন না।
- গৃহপ্রবেশ: নতুন বাড়িতে ওঠা বা বাড়ির মেরামত শুরু করবেন না।
- নতুন ব্যবসা: কোনো নতুন উদ্যোগ বা ব্যবসা চালু করবেন না।
- সম্পত্তি ক্রয়: জমি, ফ্ল্যাট বা যানবাহন কেনার চুক্তি করবেন না।
- মুণ্ডন ও নামকরণ: শিশুর মুণ্ডন বা নামকরণ সংস্কার করবেন না।
- শিক্ষার নতুন পাঠ: বিদ্যারম্ভ বা নতুন কোনো শিক্ষার সূচনা করবেন না।
- ষোলো সংস্কার: যেকোনো হিন্দু ষোলো সংস্কারমূলক অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলুন।
হোলাষ্টকে কী করবেন?
হোলাষ্টক শুধু বিধিনিষেধের সময় নয় এটি আত্মিক উন্নতি ও সেবার বিশেষ সুযোগ।
ভালো কাজ যা করতে পারেন:
- দান করুন: বস্ত্র, খাদ্য, অর্থ দান করুন। এই সময়ের দান বিশেষ পুণ্য বলে বিবেচিত।
- পূজা-অর্চনা: বিষ্ণু সহস্রনাম, হনুমান চালিশা বা মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করুন।
- ধ্যান ও সাধনা: এই সময় তান্ত্রিক সাধনা বা ধ্যান অত্যন্ত ফলদায়ক বলে মনে করা হয়।
- হোলিকা স্থান পরিষ্কার: পাড়ায় হোলিকা দহনের স্থান নির্বাচন ও পরিষ্কার করুন।
- কাঠ সংগ্রহ: প্রতিদিন কিছু শুকনো কাঠ সংগ্রহ করে হোলিকা দহনের স্থানে রাখুন।
- গরিবদের সহায়তা: সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের সাহায্য করুন।
হোলাষ্টকের গুরুত্ব বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য
বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায় ঐতিহ্যগতভাবে দোল পূর্ণিমা বা হোলি উৎসব পালন করেন। হোলাষ্টকের বিধান মূলত উত্তর ভারতীয় হিন্দু ঐতিহ্যের অংশ হলেও বর্তমানে বাংলাদেশে ধর্মীয় সচেতনতা বৃদ্ধির সাথে সাথে অনেক পরিবারই এই আট দিনে বিয়ে বা মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলছেন।
বিশেষ করে:
- যারা উত্তর ভারতীয় হিন্দু ঐতিহ্য মেনে চলেন
- যারা জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাস রাখেন
- বৈষ্ণব মতাবলম্বী পরিবার
তাদের জন্য হোলাষ্টক একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় পর্ব।
হোলাষ্টকে হোলিকা দহনের প্রস্তুতি কীভাবে হয়?
হোলাষ্টকের প্রথম দিনে মাটিতে পবিত্র স্থান চিহ্নিত করা হয়। সেই স্থানে গঙ্গাজল বা পবিত্র নদীর জল ছিটিয়ে পরিষ্কার করা হয়।
এরপর প্রতিদিন গাছ থেকে স্বাভাবিকভাবে ঝরে পড়া শুকনো কাঠ সংগ্রহ করে সেখানে রাখা হয়। অষ্টম দিনে, অর্থাৎ পূর্ণিমার রাতে সেই কাঠের স্তূপে আগুন দেওয়া হয় — এটিই হোলিকা দহন।
হোলিকা দহন মন্দের বিরুদ্ধে ভালোর জয়ের প্রতীক। হিরণ্যকশিপুর বোন হোলিকা — যাঁর অগ্নিতে না পোড়ার বরদান ছিল — তিনি প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুনে বসেছিলেন। কিন্তু ভগবানের ইচ্ছায় হোলিকা পুড়ে যান, প্রহ্লাদ বেঁচে যান।
হোলাষ্টকের পর কখন থেকে শুভ কাজ শুরু করা যাবে?
হোলাষ্টক শেষ হওয়ার পরদিন, অর্থাৎ ৪ মার্চ ২০২৬ থেকে শুভ ও মাঙ্গলিক কাজ শুরু করা যাবে।
তবে মনে রাখবেন, এর পরেই খরমাস শুরু হতে পারে (মার্চের মাঝামাঝি থেকে), যে সময়েও বিবাহ ইত্যাদি করা হয় না। তাই বিয়ের মুহূর্ত ঠিক করার আগে একটি ভালো পঞ্জিকা বা জ্যোতিষীর পরামর্শ নিন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
হোলাষ্টক ২০২৬ কবে থেকে শুরু?
২০২৬ সালে হোলাষ্টক শুরু হচ্ছে ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (মঙ্গলবার) সকাল ৭টা ১ মিনিট থেকে।
হোলাষ্টক ২০২৬ কবে শেষ হবে?
হোলাষ্টক শেষ হবে ৩ মার্চ ২০২৬ (মঙ্গলবার), হোলিকা দহনের দিন। পরদিন ৪ মার্চ রঙের হোলি উৎসব।
হোলাষ্টক কি শুধু উত্তর ভারতে পালিত হয়?
মূলত হ্যাঁ। হোলাষ্টকের প্রভাব পাঞ্জাব, রাজস্থান, হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশে সবচেয়ে বেশি। দক্ষিণ ভারতে এটি তেমন প্রচলিত নয়। তবে বাংলাদেশে ও পশ্চিমবঙ্গে ধর্মপ্রাণ পরিবারে এটি মেনে চলা হয়।
হোলাষ্টকে কি সম্পত্তি কেনা যাবে?
না, হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী হোলাষ্টকে সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয় বা বড় আর্থিক চুক্তি এড়ানো উচিত।
হোলাষ্টকে কি ব্যবসা শুরু করা যায়?
না। হোলাষ্টকে নতুন ব্যবসা বা উদ্যোগ শুরু করা শুভ নয় বলে মনে করা হয়। হোলাষ্টকের পর উপযুক্ত মুহূর্ত দেখে শুরু করুন।
হোলাষ্টকে দান করলে কি পুণ্য হয়?
হ্যাঁ! হোলাষ্টকে দান করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলে ধর্মীয় মতে বিশ্বাস করা হয়। বস্ত্র, খাদ্য, অর্থ বা যেকোনো প্রয়োজনীয় জিনিস দান করুন।
হোলাষ্টকে কি বিয়ে হয়?
না। হোলাষ্টকে বিয়ে, বাগদান বা যেকোনো মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান করা হয় না।
হোলাষ্টকে কি পূজা করা যায়?
হ্যাঁ। পূজা, ধ্যান, মন্ত্র জপ, হোমযজ্ঞ করা শুধু যায় না — বরং বিশেষভাবে ফলদায়ক বলে মনে করা হয়।
হোলাষ্টক কতদিন থাকে?
হোলাষ্টক মোট ৮ দিন থাকে — ফাল্গুন শুক্লপক্ষের অষ্টমী থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত।
হোলাষ্টক ২০২৭ কবে?
২০২৭ সালে হোলাষ্টক শুরু হবে প্রায় ১৬ মার্চ ২০২৭ থেকে (চূড়ান্ত তারিখের জন্য পঞ্জিকা দেখুন)।
হোলাষ্টক শুধু বিধিনিষেধের সময় নয় এটি হলো আত্মশুদ্ধি ও ভক্তির বিশেষ মুহূর্ত। ঠিক যেমন বীজকে অঙ্কুরিত হওয়ার আগে মাটির মধ্যে কিছুটা সময় থাকতে হয়, তেমনি হোলির আনন্দময় রঙের উৎসবের আগে এই আট দিন আমাদের মনকে পবিত্র ও প্রস্তুত করে তোলে।
এই আর্টিকেলটি হিন্দু পঞ্জিকা, বিষ্ণু পুরাণ, শিব পুরাণ এবং DrikPanchang.com, Astroyogi.com, এবং India TV News-এর তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।
বিঃদ্রঃ: হোলাষ্টক একটি ধর্মীয় বিশ্বাসভিত্তিক পর্ব। এটি পালন করা বা না করা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সিদ্ধান্ত।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”
