সুপার এল নিনো কী এবং ২০২৬ সালে এর প্রভাব কতটা ভয়াবহ হবে? প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশের পানির তাপমাত্রা যখন স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে যায়, তখন সেই চরম অবস্থাকে ‘সুপার এল নিনো’ (Super El Nino) বলা হয়। মার্কিন ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টারের সর্বশেষ তথ্যমতে, ২০২৬ সালে এই সুপার এল নিনো তৈরির সম্ভাবনা প্রায় ৬২ শতাংশ। এর ফলে দীর্ঘ ১৪০ বছরের রেকর্ড ভেঙে বিশ্বের আবহাওয়া ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ওলটপালট হয়ে যেতে পারে। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে চরম তাপদাহ, খরা, ভয়াবহ বন্যা এবং শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
এল নিনো এবং সুপার এল নিনোর মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, এল নিনো তো প্রায়ই হয়, তাহলে এবারেরটি নিয়ে এতো ভয় কেন?
- স্বাভাবিক এল নিনো: সমুদ্রের উপরিভাগের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেলে তাকে সাধারণ এল নিনো বলে।
- সুপার এল নিনো: পানির তাপমাত্রা যখন স্বাভাবিকের চেয়ে কমপক্ষে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি বৃদ্ধি পায়। ১৯৫০ সালের পর থেকে পৃথিবীতে এই মাত্রার উষ্ণায়ন খুবই কম দেখা গেছে।
২০২৬ সালের বৈশ্বিক আবহাওয়ায় সুপার এল নিনোর ভয়াবহ প্রভাব
আলবানি ও মিয়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে পাওয়া সব তথ্য ও পর্যবেক্ষণ একটি শক্তিশালী দুর্যোগপূর্ণ বছরের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর সম্ভাব্য প্রভাবগুলো হলো:
- রেকর্ডভাঙা তাপমাত্রা: আগামী বছর বিশ্বের তাপমাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।
- ভয়াবহ খরা ও তাপদাহ: অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত এবং দক্ষিণ আমেরিকায় দীর্ঘস্থায়ী খরা ও তীব্র তাপদাহ দেখা দেবে।
- বন্যা ও অতিবৃষ্টি: দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে ভয়াবহ বজ্রবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়বে।
- শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়: উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে হারিকেন বা ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম আরও সহিংস ও ধ্বংসাত্মক হবে।
বাংলাদেশে এল নিনোর প্রভাব: আমাদের কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে?
বিশ্বের অন্যান্য দেশের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার দেশ হিসেবে বাংলাদেশেও এই সুপার এল নিনোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য নিচের সমস্যাগুলো প্রকট আকার ধারণ করতে পারে:
১. কৃষি খাতে চরম বিপর্যয়: প্রতিবেশী ভারতে খরার পূর্বাভাস থাকলেও, দক্ষিণ এশিয়ায় বজ্রবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশের কৃষিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। অসময়ে বৃষ্টি বা অতিবৃষ্টির ফলে মাঠের ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২. আকস্মিক বন্যা ও জলাবদ্ধতা: হঠাৎ করে অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃষ্টির কারণে নদ-নদীর পানি বেড়ে আকস্মিক বন্যা এবং শহর অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে।
৩. স্বাস্থ্য ঝুঁকি বৃদ্ধি: অস্বাভাবিক গরমের পর হঠাৎ বৃষ্টির কারণে তাপমাত্রার ব্যাপক ওঠানামা হবে। এতে পানিবাহিত রোগ (যেমন ডায়রিয়া, কলেরা) এবং মশাবাহিত রোগ (যেমন ডেঙ্গু) চরম আকার ধারণ করতে পারে।
৪. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট: তীব্র তাপদাহের সময় এসির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা বহুগুণ বাড়বে, যা জ্বালানি খাতের উপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করবে।
বিগত সুপার এল নিনো থেকে আমাদের কী শিক্ষা নেওয়া উচিত?
ইতিহাস বলে, ২০১৫ সালে সর্বশেষ সুপার এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বব্যাপী বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছিল। তখন ইথিওপিয়ায় মারাত্মক খাদ্য সংকট তৈরি হয়, পুয়ের্তোরিকোতে ভয়াবহ সুপেয় পানির অভাব দেখা দেয় এবং উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে একের পর এক শক্তিশালী হারিকেন তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এবারের সুপার এল নিনো কেবল জলবায়ু পরিবর্তন নয়, বরং বড় ধরনের মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
আমাদের প্রস্তুতি: বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে যে, কৃষি, স্বাস্থ্য ও জ্বালানি খাতের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এখনই আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত প্রস্তুতি প্রয়োজন। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো কঠিন হবে। কৃষকদের আগাম পূর্বাভাস দেওয়া এবং দুর্যোগ মোকাবেলায় মজুত বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি।
সাধারণ মানুষের জিজ্ঞাসা
সাধারণত ২ থেকে ৭ বছর পর পর প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো দেখা যায়। তবে ‘সুপার এল নিনো’ অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা, যা কয়েক দশক পর পর ঘটে। এবারের এল নিনো গত ১৪০ বছরের রেকর্ড ভাঙতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হ্যাঁ, নিশ্চিতভাবেই। এল নিনোর প্রভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশেও চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া বিরাজ করবে। অস্বাভাবিক তাপদাহের পাশাপাশি আকস্মিক অতিবৃষ্টির সম্মুখীন হতে হবে আমাদের।
সাধারণ মানুষকে আবহাওয়া পূর্বাভাস সম্পর্কে নিয়মিত আপডেট থাকতে হবে। কৃষিকাজে আগাম সতর্কতা অবলম্বন করা, তীব্র গরমে পানিশূন্যতা রোধে প্রচুর বিশুদ্ধ পানি পান করা এবং বন্যা বা বৃষ্টির পানি জমে যেন মশার বিস্তার না ঘটে সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
আপনার এলাকার সর্বশেষ আবহাওয়ার খবর এবং দুর্যোগকালীন সতর্কতা সম্পর্কে জানতে নিয়মিত বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যম ও আবহাওয়া অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট অনুসরণ করুন।
তথ্যসূত্র: আবহাওয়া বিজ্ঞানী, ইউএস ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টার ও বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO)
