রমজান মাস মুসলমানদের জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এই মাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও ফজিলতপূর্ণ রজনী হলো ‘লাইলাতুল কদর’ বা শবে কদর। পবিত্র কোরআনের বর্ণনামতে, এই এক রাতের ইবাদত হাজার মাস অর্থাৎ ৮৩ বছর ৪ মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম। কিন্তু কিভাবে এই রাতের পূর্ণ বরকত অর্জন করা যায়? চলুন জেনে নিই বিস্তারিত।
শবে কদরের রাতে কী করলে ৮৩ বছরের ইবাদতের সওয়াব পাওয়া যায়? রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে (২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯তম রাত) উদাসীন না থেকে মাগরিব, এশা এবং তারাবির নামাজ মসজিদে জামাতের সাথে আদায় করতে হবে। পাশাপাশি অহেতুক কাজ ও চোখের গুনাহ থেকে বেঁচে বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত, তাহাজ্জুদ ও জিকির করতে হবে। শবে কদর পাওয়ার নিয়তে বিশেষ দোয়া “আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুওউ্যন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি” পাঠ করার মাধ্যমে মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে হাজার মাসের ইবাদতের সওয়াব লাভ করা সম্ভব।
শবে কদর বা লাইলাতুল কদর কবে?
শবে কদর মূলত রমজানের শেষ দশকের যেকোনো রাতেই হতে পারে। তবে, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের বেজোড় রাতগুলোতে এই মহিমান্বিত রজনী তালাশ করতে বলেছেন। ২১, ২৩, ২৫, ২৭ এবং ২৯—এই বেজোড় রাতগুলোতে শবে কদর হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেকেই শুধু ২৭শে রমজানের রাতকেই শবে কদর ভেবে উদযাপন করেন, যা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। জোর বা বেজোড় সব রাতেই সম্ভাবনা থাকে, তবে শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
শবে কদরের রাতে করণীয় আমলসমূহ
শবে কদরের বরকত থেকে যে বঞ্চিত হয়, সে সত্যিই হতভাগা। এই রাতের পূর্ণ সওয়াব পেতে নিচের আমলগুলো ধাপে ধাপে করতে পারেন:
- জামাতে নামাজ আদায়: মাগরিব, এশা এবং তারাবির নামাজ অবশ্যই মসজিদে জামাতের সাথে আদায় করার চেষ্টা করুন।
- নফল ইবাদত বৃদ্ধি: রাতের বাকি অংশে তাহাজ্জুদ, জিকির এবং কোরআন তেলাওয়াত করুন।
- গুনাহ থেকে বিরত থাকা: জবান, চোখ ও কানের গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়া বা অহেতুক আড্ডায় সময় নষ্ট করা যাবে না।
- আল্লাহর কাছে ধরনা দেওয়া: বিনয়ের সাথে আল্লাহর কাছে নিজের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।
শবে কদরের বিশেষ দোয়া
হাদিস শরিফে শবে কদরের জন্য একটি নির্দিষ্ট দোয়া শেখানো হয়েছে। রাতটি শবে কদর হওয়ার সম্ভাবনা মনে হলে বেশি বেশি এই দোয়াটি পড়ুন:
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুওউ্যন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি। অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করাকে আপনি ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করে দিন।
এতেকাফের সঠিক নিয়ম ও স্মার্টফোন ব্যবহারের বিধান
রমজানের শেষ দশকে এতেকাফ করা একটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ সুন্নাত ইবাদত। কিন্তু অনেকেই এতেকাফের সঠিক নিয়ম ও আদব সম্পর্কে সচেতন নন।
- মসজিদের সীমানা: শরীয়তসম্মত ওজর ছাড়া মসজিদের নির্দিষ্ট সীমানা থেকে বের হলে এতেকাফ ভেঙে যায়। মসজিদের বাইরে থাকা চত্বর বা বর্ধিত বারান্দা যা মূল মসজিদের অংশ নয়, সেখানে বিনা প্রয়োজনে যাওয়া যাবে না।
- স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার: এতেকাফকারী যদি মসজিদে বসে স্মার্টফোন, ফেসবুক বা ইউটিউব ব্যবহার করেন, তবে এতেকাফের মূল রুহ বা প্রাণ নষ্ট হয়ে যায়। এতেকাফ মানে হলো দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আল্লাহর দরবারে ধরনা দেওয়া। স্মার্টফোন সাথে রাখা মানে পুরো দুনিয়াকে সাথে রাখা। তাই, এতেকাফে বসার সময় ফোনটি পরিবারের কাছে জমা দিয়ে আসা বা সম্পূর্ণ বন্ধ (ফ্লাইট মোড) রাখা উচিত।
জাকাত আদায় ও সুদ বর্জনের গুরুত্ব
ইসলামিক জীবনব্যবস্থায় শুধু ইবাদতই নয়, বরং হালাল উপার্জনের গুরুত্ব অপরিসীম। মুফতি সাহেবের বয়ান অনুযায়ী, যেকোনো দেশের অর্থনীতি ঠিক করতে দুটি প্রধান কাজ করতে হবে:
- যথাযথ খাতে জাকাত আদায়: পাই পাই হিসাব করে জাকাত বের করতে হবে এবং সঠিক হকদারকে তা পৌঁছে দিতে হবে।
- সুদ (রিবা) বর্জন: ব্যক্তি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত অর্থনীতিকে সুদমুক্ত করতে হবে। শুধু ‘ইসলামী ব্যাংক’ নাম দিলেই তা সুদমুক্ত হয় না, বরং শরীয়তের পূর্ণ বিধান মেনে চলতে হয়। আল্লাহ সুদকে ধ্বংস করেন এবং সদকা বা দানে বরকত দান করেন।
বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
শবে কদরের নামাজ কয় রাকাত এবং এর নিয়ত কী?
শবে কদরের নির্দিষ্ট কোনো নামাজ নেই। আপনি নফল হিসেবে যত রাকাত খুশি দুই রাকাত করে নামাজ আদায় করতে পারেন। এর জন্য আলাদা কোনো নিয়ত আরবিতে করার প্রয়োজন নেই, মনে মনে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নফল নামাজ পড়ার নিয়ত করাই যথেষ্ট।
এতেকাফ অবস্থায় গোসল করা যাবে কি?
শুধুমাত্র ফরজ গোসল বা ওযুর প্রয়োজন হলে এতেকাফকারী মসজিদের বাইরে যেতে পারবেন। তবে শরীর ঠান্ডা করার জন্য সাধারণ গোসলের উদ্দেশ্যে মসজিদ থেকে বের হলে এতেকাফ ভেঙে যাবে।
নারীরা কি ঘরে এতেকাফ করতে পারবেন?
হ্যাঁ, নারীরা তাদের ঘরের নির্দিষ্ট একটি পরিচ্ছন্ন স্থানে এতেকাফ করতে পারবেন। সেখানে তারা নামাজ, তেলাওয়াত ও জিকিরে মশগুল থাকবেন এবং দুনিয়াবী কাজ থেকে বিরত থাকবেন।
যাকাত কাদেরকে দেওয়া যাবে?
পবিত্র কোরআনে যাকাত ব্যয়ের ৮টি খাতের কথা উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো গরিব, মিসকিন, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি এবং মুসাফির।
(তথ্যসূত্র: মুফতি আব্দুল মালেক সাহেবের রমজান ও শবে কদর বিষয়ক বয়ান)
আশা করি, এই লেখাটি আপনাদের রমজানের শেষ দশকের ইবাদতকে আরও ফলপ্রসূ করতে সাহায্য করবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে লাইলাতুল কদরের পূর্ণ বরকত নসিব করুন। আমিন!
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”
