লোকনাথ বাবার তিরোধান দিবস ২০২৬: তারিখ, সময়সূচি ও পূজার নিয়ম

লোকনাথ বাবার তিরোধান দিবস ২০২৬

২০২৬ সালে শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী বাবার ১৩৬তম তিরোধান দিবস পালিত হবে আগামী ২ জুন, ২০২৬ (মঙ্গলবার)। বাংলাদেশ ও ভারতের হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী পুণ্য এই তিথিটি হলো ১৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। প্রতি বছর এই দিনে বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের বারদী আশ্রমসহ দেশের সকল লোকনাথ মন্দিরে বিশেষ পূজা, বাল্যভোগ ও মহোৎসবের আয়োজন করা হয়।

এই বিস্তারিত আর্টিকেলে আমরা লোকনাথ বাবার তিরোধান দিবস ২০২৬-এর তারিখ ও সময়, পূজার সঠিক নিয়ম, বাবার প্রিয় ফুল ও ভোগ এবং ঘরে বসে কীভাবে লোকনাথ বাবার পূজা করবেন—তার সবকিছু জানব।

লোকনাথ বাবার ১৩৬তম তিরোধান দিবসের তাৎপর্য

ত্রিকালদর্শী মহাযোগী শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী ১১৩৭ বঙ্গাব্দে (১৭৩০ সাল) জন্মগ্রহণ করেন। দীর্ঘ ১৬০ বছর জীবিত থেকে তিনি মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। বাংলার ১২৯৭ সালের (১৮৯০ সাল) ১৯ জ্যৈষ্ঠ বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে অবস্থিত বারদী লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রমে বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই দিনটিকেই ভক্তরা ভক্তিভরে “তিরোধান দিবস” বা মহাপ্রয়াণ উৎসব হিসেবে পালন করে থাকেন।

লোকনাথ পূজা ২০২৬: তারিখ ও সময়সূচি

বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা ও বাংলাদেশের সরকারি পঞ্জিকা (১৪৩৩ বঙ্গাব্দ) অনুযায়ী ২০২৬ সালের পূজার নির্ঘণ্ট নিচে দেওয়া হলো:

  • ইংরেজি তারিখ: ২ জুন, ২০২৬ (মঙ্গলবার)
  • বাংলা তারিখ: ১৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  • পূজার শুভ সময়: ১৯ জ্যৈষ্ঠ সারা দিনই বাবার পূজার জন্য প্রশস্ত। তবে সাধুরা সাধারণত সকালবেলা এবং গোধূলি লগ্নে বা সন্ধ্যায় লোকনাথ বাবার আরাধনা করতে বেশি পছন্দ করেন।

২০২৬ সালের তিরোধান দিবসের পূজার বিশেষ লগ্ন

বিশেষজ্ঞ পঞ্জিকা গণনা অনুযায়ী ২ জুন ২০২৬ তারিখে পূজার শুভ সময়গুলো হলো:

  • প্রথম শুভ লগ্ন: সকাল ৬:৪৩ মিনিট
  • দ্বিতীয় শুভ লগ্ন: সকাল ৯:২৫ মিনিট
  • তৃতীয় শুভ লগ্ন: দুপুর ১২:০৬ মিনিট
  • চতুর্থ শুভ লগ্ন: দুপুর ২:৪৭ মিনিট

বারদী লোকনাথ আশ্রম: তিরোধান উৎসবের কেন্দ্রস্থল

আশ্রমের পরিচিতি

নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার বারদী বাজারের পশ্চিম-উত্তর কোণে অবস্থিত বারদী লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান তীর্থক্ষেত্র। আশ্রমের ভেতরে রয়েছে:

  • মহাপুরুষ লোকনাথ ব্রহ্মচারীর সমাধি মন্দির
  • শতবর্ষ প্রাচীন বিশাল বকুলগাছ
  • “কামনা সাগর” ও “জিয়স” নামের দুটি পুকুর
  • লোকনাথ ব্রহ্মচারীর বিশাল তৈলচিত্র
  • ভক্তদের থাকার জন্য তীর্থ নিবাস ও একটি দুর্গামণ্ডপ

বারদী কীভাবে যাবেন?

বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকেই বারদী যাওয়া মোটামুটি সহজ। ঢাকা থেকে যাওয়ার পথ হলো:
১. ঢাকার সায়েদাবাদ বা গুলিস্তান থেকে নারায়ণগঞ্জ বা সোনারগাঁওগামী বাসে উঠুন।
২. ঢাকা-চট্টগ্রাম জাতীয় মহাসড়ক ধরে মোগরাপাড়া চৌরাস্তায় নামুন।
৩. সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশায় (ভাড়া আনুমানিক ৬০-৮০ টাকা) সরাসরি বারদী পৌঁছান।

(বিশেষ পরামর্শ: উৎসবের দিন ভোরবেলা রওনা দেওয়াই ভালো, কারণ দুপুরের পর প্রচণ্ড ভিড় হয়।)

তিরোধান উৎসবে কী কী হয়?

প্রতি বছর ১৯ জ্যৈষ্ঠ লোকনাথ তিরোধান উৎসব উপলক্ষে বারদী আশ্রমে সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানমালা পরিচালিত হয়। এটি বাঙালি হিন্দু সমাজের অন্যতম বৃহত্তম মিলনমেলা।

  • ভোরবেলা: ঊষা কীর্তন ও মঙ্গলারতি
  • সকাল: পূজা অর্চনা, গীতা পাঠ ও বাল্যভোগ
  • দুপুর: লোকনাথ বাবার জীবনবৃত্তান্ত পাঠ ও রাজভোগ
  • বিকাল: প্রসাদ বিতরণ এবং ভক্তদের মধ্যে “হরি লুট”
  • সন্ধ্যা: বিশেষ আরতি ও কীর্তন

লোকনাথ বাবার পূজা পদ্ধতি (কিভাবে বাড়িতে পূজা করবেন)

বাবা লোকনাথ অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন, তাই তিনি অল্পতেই তুষ্ট হন। আড়ম্বর নয়, বরং ভক্তিই হলো তাঁর পূজার মূল মন্ত্র।

পূজার প্রয়োজনীয় উপকরণ:

  • লোকনাথ বাবার একটি ছবি বা মূর্তি
  • প্রদীপ, ধূপকাঠি ও কর্পূর
  • গঙ্গার জল বা পরিষ্কার জল
  • ফুল (বিশেষ করে নীল শাপলা বা নীল পদ্ম)
  • ভোগের জন্য মিছরি, মাখন ও ফলমূল

পূজার নিয়ম (Step-by-step):
১. শুদ্ধিকরণ: সকালে স্নান সেরে পরিষ্কার বস্ত্র পরিধান করুন।
২. আসন গ্রহণ: পূজার স্থানে বসে বাবার ছবি বা মূর্তিতে চন্দন পরিয়ে দিন।
৩. পুষ্পাঞ্জলি: বাবার চরণে ফুল ও তুলসী পাতা অর্পণ করুন।
৪. ভোগ নিবেদন: ভক্তিভরে বাবার প্রিয় ভোগ নিবেদন করুন।
৫. আরতি ও পাঁচালী: প্রদীপ ও ধূপ জ্বালিয়ে আরতি করুন এবং শেষে ‘লোকনাথ বাবার পাঁচালী’ বা মন্ত্র পাঠ করুন।

লোকনাথ বাবার প্রিয় ভোগ ও মিষ্টি

বাবার খাদ্যাভ্যাস ছিল খুবই সাধারণ।

  • প্রিয় মিষ্টি ও খাবার: মিছরি, মাখন, বাতাসা এবং তালমিছরি তাঁর অত্যন্ত পছন্দের।
  • প্রিয় ফল: জ্যৈষ্ঠ মাসের রসালো ফল যেমন- তালশাঁস, কালোজাম, লিচু এবং আম।
    ভারী ভোগের ক্ষেত্রে পোলাও বা পনির নয়; বরং সাধারণ সাদা ভাত, ডাল ও চচ্চড়ি বা খিচুড়ি বাবার বেশি পছন্দের।

বাবা লোকনাথের প্রিয় ফুল কী?

বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারীর সবচেয়ে প্রিয় ফুল হলো নীল শাপলা এবং নীল পদ্ম। বাবার কৃপা পেতে হলে পূজায় অন্তত একটি নীল রঙের শাপলা বা পদ্ম নিবেদন করা অপরিহার্য বলে ভক্তরা বিশ্বাস করেন। এছাড়া সাদা ফুলও ব্যবহার করা যায়।

ভয় ও বিপদ মুক্তির লোকনাথ মন্ত্র

পূজা শেষে ভক্তিভরে বাবার প্রণাম মন্ত্র জপ করলে মনের সকল ভয় ও বাধা দূর হয়:

“ওঁ নমঃ শিবায়, ওঁ নমঃ লোকনাথায়, ওঁ নমঃ ব্রহ্মচারিণ্যে নমঃ।”(সহজভাবে কেবল “জয় বাবা লোকনাথ” বলেও ডাকতে পারেন।)

বাবা লোকনাথের বিখ্যাত বাণী

তাঁর মূল বার্তা ছিল সর্বজনীন মানবতা। তাঁর কিছু বিখ্যাত অমর বাণী:

  • “মানবতাই মানুষের শ্রেষ্ঠ ধর্ম।”
  • “আমার মৃত্যু নেই — কেবল আমার জীর্ণ দেহটা পাত হবে, আমি তোদের কাছে ঠিক তেমনই থাকব।”
  • “রণে বনে জলে জঙ্গলে, যখনই বিপদে পড়িবে, আমাকে স্মরণ করিও, আমি রক্ষা করিব।”

সাধারণ জিজ্ঞাসা

১. ২০২৬ সালে লোকনাথ বাবার তিরোধান দিবস কবে?
২০২৬ সালে লোকনাথ বাবার তিরোধান দিবস বা মহাপ্রয়াণ উৎসব আগামী ২ জুন, মঙ্গলবার (১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ) পালিত হবে।

২. ১৯ জ্যৈষ্ঠ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলা ১২৯৭ সালের (১৮৯০ সাল) ১৯ জ্যৈষ্ঠ তারিখে বাবা লোকনাথ নারায়ণগঞ্জের বারদী আশ্রমে তাঁর নশ্বর দেহ ত্যাগ করেছিলেন বলে দিনটি তিরোধান দিবস হিসেবে পালিত হয়।

৩. লোকনাথ বাবার প্রিয় ফুল ও ভোগ কী কী?
বাবার প্রিয় ফুল হলো নীল শাপলা বা নীল পদ্ম। ভোগের মধ্যে মিছরি, মাখন, তালশাঁস, কালোজাম এবং বাতাসা তাঁর খুব পছন্দের।

৪. লোকনাথ বাবার জন্মস্থান কোথায়?
তাঁর জন্ম বাংলার ১১৩৭ সালের ভাদ্র মাসে, বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার অন্তর্গত চৌরাশি চাকলা বা কচুয়া গ্রামে।

শেষকথা

লোকনাথ তিরোধান দিবস ২০২৬ কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি বাবার আদর্শ ও আত্মত্যাগকে স্মরণ করার দিন। এই পুণ্য তিথিতে ঘরে ঘরে উচ্চারিত হোক বাবার সেই অভয়বাণী— “তুমি কখনও একা নও, আমি সর্বদা তোমার সঙ্গে আছি।”

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:

  • বাংলা পঞ্জিকা ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  • বারদী লোকনাথ আশ্রম অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (loknath.org)
  • সোনারগাঁও উপজেলা সরকারি ওয়েবসাইট
  • বাংলা ও ইংরেজি উইকিপিডিয়া: বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী

Leave a Comment

Scroll to Top