প্রস্তাবিত পে স্কেল ২০২৬

প্রস্তাবিত পে স্কেল ২০২৬

প্রস্তাবিত পে স্কেল ২০২৬ (নবম জাতীয় বেতন স্কেল) অনুযায়ী সর্বনিম্ন বেতন ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১,৬০,০০০ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। গড়ে প্রায় ১০৫% বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে ধাপে ধাপে কার্যকর হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রস্তাবিত পে স্কেল ২০২৬ কী?

বাংলাদেশ সরকার ২০২৫ সালের শেষের দিকে জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫ গঠন করে। এই কমিশন ২০২৬ সালের এপ্রিলে সরকারের কাছে নবম জাতীয় বেতন স্কেলের সুপারিশ জমা দেয়। এটিই প্রস্তাবিত পে স্কেল ২০২৬ নামে পরিচিত।

বর্তমানে প্রচলিত অষ্টম পে স্কেল (২০১৫) কার্যকর হওয়ার প্রায় ১১ বছর পর এই নতুন বেতন কাঠামো আসছে। দেশের প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগী এই নতুন কাঠামোর সুবিধা পাবেন।

প্রস্তাবিত পে স্কেল ২০২৬: সম্পূর্ণ গ্রেড তালিকা (১ম–২০তম গ্রেড)

নিচে বর্তমান মূল বেতন এবং ৫০% বৃদ্ধিতে প্রস্তাবিত নতুন বেতন পাশাপাশি দেওয়া হলো।

(সুপারিশ অনুযায়ী বেসিকের ৫০% বৃদ্ধিতে প্রথম ধাপের প্রস্তাবিত তালিকা)

১ম থেকে ১৫তম গ্রেড

গ্রেডবর্তমান মূল বেতন (টাকা)প্রস্তাবিত নতুন বেতন (টাকা)
১ম গ্রেড৭৮,০০০ (স্থির)১,১৭,০০০ (স্থির)
২য় গ্রেড৬৬,০০০ — ৭৬,৪৯০৯৯,০০০ — ১,১৪,৭৩৫
৩য় গ্রেড৫৬,৫০০ — ৭৪,৮০০৮৪,৭৫০ — ১,১১,৬০০
৪র্থ গ্রেড৫০,০০০ — ৭১,২০০৭৫,০০০ — ১,০৬,৮০০
৫ম গ্রেড৪৩,০০০ — ৬৯,৮৫০৬৪,৫০০ — ১,০৪,৭৭৫
৬ষ্ঠ গ্রেড৩৫,৫০০ — ৬৭,০১০৫৩,২৫০ — ১,০০,৫১৫
৭ম গ্রেড২৯,০০০ — ৬৩,৪১০৪৩,৫০০ — ৯৫,১১৫
৮ম গ্রেড২৩,০০০ — ৫৫,৪৭০৩৪,৫০০ — ৮৩,২০৫
৯ম গ্রেড২২,০০০ — ৫৩,০৬০৩৩,০০০ — ৭৯,৫৯০
১০ম গ্রেড১৬,০০০ — ৩৮,৬৪০২৪,০০০ — ৫৭,৯৬০
১১তম গ্রেড১২,৫০০ — ৩০,২৩০১৮,৭৫০ — ৪৫,৩৪৫
১২তম গ্রেড১১,৩০০ — ২৭,৩০০১৬,৯৫০ — ৪০,৯৫০
১৩তম গ্রেড১১,০০০ — ২৬,৫৯০১৬,৫০০ — ৩৯,৮৮৫
১৪তম গ্রেড১০,২০০ — ২৪,৬৮০১৫,৩০০ — ৩৭,০২০
১৫তম গ্রেড৯,৭০০ — ২৩,৪৯০১৪,৫৫০ — ৩৫,২৩৫

১৬তম থেকে ২০তম গ্রেড

গ্রেডবর্তমান মূল বেতন (টাকা)প্রস্তাবিত নতুন বেতন (টাকা)
১৬তম গ্রেড৯,৩০০ — ২২,৪৯০১৩,৯৫০ — ৩৩,৭৩৫
১৭তম গ্রেড৯,০০০ — ২১,৮০০১৩,৫০০ — ৩২,৭০০
১৮তম গ্রেড৮,৮০০ — ২১,৩১০১৩,২০০ — ৩১,৯৬৫
১৯তম গ্রেড৮,৫০০ — ২০,৫৯০১২,৭৫০ — ৩০,৮৮৫
২০তম গ্রেড৮,২৫০ — ২০,০১০১২,০৭৫ — ৩০,০১৫

⚠️ দ্রষ্টব্য: উপরের তালিকাটি প্রথম ধাপ (২০২৬-২৭) অনুযায়ী ৫০% বৃদ্ধির প্রস্তাব। চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ হলে সরকারি প্রজ্ঞাপনই আইনি ভিত্তি হবে।

নবম পে স্কেলে কতটা বেতন বাড়বে?

এটাই সবার প্রথম প্রশ্ন। সহজ উত্তর:

  • গড় বেতন বৃদ্ধি: প্রায় ১০৫%
  • নিম্ন গ্রেড (১১-২০): সর্বোচ্চ ১৪০% পর্যন্ত বৃদ্ধি
  • সর্বনিম্ন মূল বেতন: ৮,২৫০ টাকা → ২০,০০০ টাকা (প্রায় ১৪২% বৃদ্ধি)
  • সর্বোচ্চ মূল বেতন: ৭৮,০০০ টাকা → ১,৬০,০০০ টাকা (প্রায় ১০৫% বৃদ্ধি)

বাস্তব উদাহরণ: ২০তম গ্রেডের কর্মচারী

বিষয়বর্তমানপ্রস্তাবিত নতুন
মূল বেতন৮,২৫০ টাকা২০,০০০ টাকা
ভাতাসহ মোট (ঢাকায়)১৬,৯৫০ টাকাপ্রায় ৪১,৯০৮ টাকা

একজন ২০তম গ্রেডের সরকারি কর্মচারী ঢাকায় বর্তমানে সব মিলিয়ে ১৬,৯৫০ টাকা পাচ্ছেন। নতুন স্কেলে তা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৪১,৯০৮ টাকার বেশি — অর্থাৎ আয় প্রায় আড়াইগুণ হবে।

প্রস্তাবিত পে স্কেল ২০২৬ কবে কার্যকর হবে?

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী তিন ধাপে নবম পে স্কেল বাস্তবায়ন হবে:

ধাপ ১ — ২০২৬-২৭ অর্থবছর (জুলাই ২০২৬ থেকে)

  • নতুন বেসিক বেতনের ৫০% কার্যকর হবে
  • অর্থাৎ প্রথম বছর বেতন সম্পূর্ণ নতুন হবে না, অর্ধেক বৃদ্ধি পাবে

ধাপ ২ — ২০২৭-২৮ অর্থবছর

  • বাকি ৫০% বেসিক প্রদান করা হবে
  • এ পর্যায়ে পূর্ণ মূল বেতন কার্যকর হবে

ধাপ ৩ — ২০২৮-২৯ অর্থবছর

  • বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও সব ভাতা নতুন কাঠামো অনুযায়ী কার্যকর
  • পেনশন সুবিধাসহ সব সুবিধা পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন

বাজেট বরাদ্দ

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য বেতন-ভাতা ও পেনশন খাতে প্রায় ৩৫,০০০ কোটি টাকা বাড়তি বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।

নবম পে স্কেলের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও পরিবর্তনগুলো

১. বেতন বৈষম্য কমানো হচ্ছে

আগে ১ম ও ২০তম গ্রেডের মধ্যে বেতনের পার্থক্য ছিল ১:৯.৪। নতুন প্রস্তাবে এই অনুপাত কমিয়ে ১:৮ করা হয়েছে। এটি দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন বেতন বৈষম্য।

তুলনায়:

  • ১৯৭৩ সালে (প্রথম কমিশন): ১:১৫.৪
  • ২০১৫ সালে (অষ্টম স্কেল): ১:৯.৪
  • ২০২৬ সালে (নবম স্কেল, প্রস্তাব): ১:৮

২. টিফিন ভাতা বৃদ্ধি

১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের টিফিন ভাতা বর্তমান ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,০০০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।

৩. প্রথমবার স্বাস্থ্যবীমা চালু

এই পে স্কেলে প্রথমবারের মতো সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

৪. প্রতিবন্ধী সন্তানের ভাতা

সরকারি কর্মচারীর প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে মাসিক ২,০০০ টাকা বিশেষ ভাতার সুপারিশ করা হয়েছে (সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য)।

৫. পেনশন সংস্কার

বিদ্যমান পেনশন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও সহজ করার প্রস্তাব রয়েছে। ৯ লাখ পেনশনভোগী সরাসরি সুবিধা পাবেন।

৬. গ্রেড সংখ্যা অপরিবর্তিত

অনেকের ধারণা ছিল গ্রেড কমানো হবে, কিন্তু নতুন কাঠামোতে বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।

বর্তমান (অষ্টম) ও প্রস্তাবিত (নবম) পে স্কেলের তুলনা

বিষয়অষ্টম পে স্কেল (২০১৫)নবম পে স্কেল (২০২৬ প্রস্তাব)
সর্বনিম্ন বেতন৮,২৫০ টাকা২০,০০০ টাকা
সর্বোচ্চ বেতন৭৮,০০০ টাকা১,৬০,০০০ টাকা
বেতন অনুপাত১:৯.৪১:৮
গড় বৃদ্ধির হারপ্রায় ১০৫%
গ্রেড সংখ্যা২০টি২০টি (অপরিবর্তিত)
কার্যকরের পদ্ধতিএকসাথেতিন ধাপে

কারা সুবিধা পাবেন?

নতুন পে স্কেলে যারা অন্তর্ভুক্ত হবেন:

  • সকল সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী (১ম–২০তম গ্রেড)
  • সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক (নিজস্ব কাঠামোতে)
  • সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষক (সংশ্লিষ্ট স্কেলে)
  • অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী (পেনশনভোগী)
  • সরকারি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা (সংশ্লিষ্ট বিধিমতে)

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

❓ নবম পে স্কেল ২০২৬ কি চূড়ান্ত হয়েছে?

না, এখন পর্যন্ত এটি প্রস্তাব ও পর্যালোচনা পর্যায়ে রয়েছে। জাতীয় বেতন কমিশন সরকারের কাছে সুপারিশ জমা দিয়েছে এবং সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশিত হলে সেটিই আইনগতভাবে বৈধ হবে।

❓ প্রস্তাবিত পে স্কেল ২০২৬ কবে থেকে কার্যকর হবে?

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী জুলাই ২০২৬ থেকে প্রথম ধাপের বাস্তবায়ন শুরু হবে। তবে এটি পূর্ণাঙ্গ হতে ২০২৮-২৯ অর্থবছর পর্যন্ত সময় লাগবে।

❓ সর্বনিম্ন সরকারি বেতন কত হবে ২০২৬ সালে?

প্রস্তাবিত নবম পে স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০,০০০ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। ভাতাসহ মোট আয় দাঁড়াবে প্রায় ৪১,৯০৮ টাকার বেশি।

❓ নতুন পে স্কেলে পেনশন কত বাড়বে?

পেনশনভোগীরাও নতুন কাঠামোর সুবিধা পাবেন। তৃতীয় ধাপ (২০২৮-২৯) সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হলে পেনশন সংস্কারের পূর্ণ সুবিধা মিলবে। তবে চূড়ান্ত পরিমাণ সরকারি গেজেটের আগে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

❓ নতুন পে স্কেলে কি বাড়িভাড়া ভাতা বাড়বে?

হ্যাঁ। তৃতীয় ধাপে (২০২৮-২৯) বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও অন্যান্য ভাতা নতুন কাঠামো অনুযায়ী একযোগে কার্যকর হবে। ততদিন পর্যন্ত বিদ্যমান ভাতা চলতে থাকবে।

❓ সরকারি শিক্ষকরা কি নতুন পে স্কেলে পড়বেন?

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক সরকারি শিক্ষকরা সংশ্লিষ্ট বেতন কাঠামোর মাধ্যমে সুবিধা পাবেন। বিস্তারিত নীতিমালা আলাদাভাবে প্রকাশ হবে।

❓ বেতন কমিশনের রিপোর্ট কোথায় পাওয়া যাবে?

জাতীয় বেতন কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট (mof.gov.bd) এবং সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হবে।

পে স্কেল বাস্তবায়নে কী কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে?

নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে সরকারকে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে:

অর্থনৈতিক চাপ: একসাথে পুরো পে স্কেল বাস্তবায়ন করলে সরকারের বাজেটে বড় চাপ পড়বে, তাই তিন ধাপে করার সিদ্ধান্ত।

মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি: বেতন বৃদ্ধির কারণে বাজারে ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে।

বেসরকারি খাতে প্রভাব: সরকারি বেতন বাড়লে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও বেতন বৃদ্ধির চাপ আসতে পারে।

সর্বশেষ খবর: পে স্কেল ২০২৬ আপডেট

  • এপ্রিল ২০২৬: জাতীয় বেতন কমিশন সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ করেছে।
  • মে ২০২৬: অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জুলাই ২০২৬ থেকে প্রথম ধাপ কার্যকরের পরিকল্পনা আছে।
  • মে ২০২৬: ২০২৬-২৭ বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে ৩৫,০০০ কোটি টাকা বাড়তি বরাদ্দের পরিকল্পনা।
  • জুন ২০২৬: সরকারি গেজেট এখনো প্রকাশিত হয়নি। প্রকাশ হলেই চূড়ান্ত তালিকা জানা যাবে।

শেষকথা

প্রস্তাবিত পে স্কেল ২০২৬ বাংলাদেশের সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সত্যিকারের বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। বিশেষত নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন — কারণ তাদের বেতন প্রায় আড়াইগুণ হতে পারে।

তবে মনে রাখবেন: এখনো গেজেট প্রকাশ হয়নি। সরকারি নোটিফিকেশন প্রকাশিত হলেই চূড়ান্ত তথ্য জানা যাবে। এই আর্টিকেলটি নিয়মিত আপডেট করা হচ্ছে।

তথ্যসূত্র:

  • অর্থ মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
  • জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫ প্রতিবেদন
  • দৈনিক ইত্তেফাক (মে ২০২৬)
  • সমকাল (মে ২০২৬)
  • RTV Online (মে ২০২৬)
  • BDservicerules.com

এই আর্টিকেলটি তথ্যভিত্তিক উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সরকারি গেজেট দেখুন।

Leave a Comment

Scroll to Top