ইসলামি বিশ্বাস এবং ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক বিভিন্ন প্রমাণের ভিত্তিতে আল-কুরআন হলো মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর অবতীর্ণ করা সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ঐশী গ্রন্থ। এটি কোনো মানুষের রচনা নয়। দেড় হাজার বছর আগে নাযিল হওয়া এই গ্রন্থে এমন অনেক বৈজ্ঞানিক সত্য (যেমন: ভ্রূণতত্ত্ব, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ, সমুদ্রবিজ্ঞান, ফিঙ্গারপ্রিন্ট ইত্যাদি) নিখুঁতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা আধুনিক বিজ্ঞান মাত্র কয়েক দশক আগে আবিষ্কার করেছে। নিরক্ষর নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পক্ষে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া এমন অলৌকিক গ্রন্থ রচনা করা অসম্ভব। তাছাড়া, দীর্ঘ ১৪০০ বছর ধরে এই গ্রন্থের একটি শব্দও পরিবর্তিত হয়নি, যা এর ঐশী সত্যতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
কুরআন কীভাবে অবতীর্ণ হয়েছিল?
পবিত্র কুরআন কোনো সাধারণ বইয়ের মতো একবারে লিখিত আকারে আসেনি। মহান আল্লাহ তাআলা ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে ধাপে ধাপে, দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর এটি নাযিল করেছেন।
- বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপট, প্রশ্নের উত্তর এবং নৈতিক দিকনির্দেশনা দিতে প্রয়োজন অনুযায়ী আয়াতগুলো অবতীর্ণ হতো।
- জিবরাঈল (আ.) মৌখিকভাবে আয়াত শোনাতেন এবং নবীজি (সা.) তা মুখস্থ করে সাহাবীদের শোনাতেন।
- সাহাবীরা তা তাৎক্ষণিকভাবে মুখস্থ করতেন এবং বিভিন্ন উপকরণের ওপর লিখে রাখতেন।
কুরআন যে মানুষের রচনা নয়, তার অন্যতম বৈজ্ঞানিক প্রমাণসমূহ
পবিত্র কুরআন কোনো বিজ্ঞান গ্রন্থ নয়, এটি জীবনব্যবস্থার গাইডলাইন। তবে এতে এমন কিছু সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক তথ্য রয়েছে, যা ৭ম শতাব্দীর আরবে কোনো মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না।
প্রাণীবিজ্ঞান: মৌমাছি ও পিঁপড়ার লিঙ্গ পরিচয়
সূরা আন-নাহল (আয়াত ৬৮-৬৯) এবং সূরা আন-নামল (আয়াত ১৮)-এ মৌমাছি এবং পিঁপড়ার কাজের বর্ণনায় ‘স্ত্রীবাচক’ ক্রিয়াপদ ও সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, মধু সংগ্রহ, চাক বানানো বা উপনিবেশ রক্ষার মতো কাজগুলো কেবল স্ত্রী মৌমাছি ও স্ত্রী পিঁপড়াই করে থাকে।
মানব ভ্রূণতত্ত্ব (Embryology)
সূরা আল-মুমিনুন-এ মানুষের সৃষ্টির ধাপগুলো (শুক্রবিন্দু থেকে রক্তপিণ্ড, গোশতপিণ্ড, অস্থিপঞ্জর এবং সবশেষে পূর্ণাঙ্গ রূপ) অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। আধুনিক ভ্রূণতত্ত্বের সাথে এই ধাপগুলো হুবহু মিলে যায়, যা সেই যুগে মাইক্রোস্কোপ ছাড়া জানা অসম্ভব ছিল।
মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ (Expansion of the Universe)
সূরা আয-যারিয়াত (আয়াত ৪৭)-এ আল্লাহ বলেছেন যে, তিনি মহাকাশ নির্মাণ করেছেন এবং তিনি একে সম্প্রসারিত করছেন। বিংশ শতাব্দীতে এসে আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, মহাবিশ্ব প্রতিনিয়ত সম্প্রসারিত হচ্ছে।
ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙুলের ছাপের ভিন্নতা
সূরা আল-কিয়ামাহ-এ আল্লাহ মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের প্রসঙ্গে বলেছেন যে, তিনি মানুষের আঙুলের অগ্রভাগ পর্যন্ত নিখুঁতভাবে পুনর্গঠন করতে সক্ষম। আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষের আঙুলের ছাপ (Fingerprint) সম্পূর্ণ আলাদা।
দুই সমুদ্রের পানির মিলন না হওয়া
কুরআনে উল্লেখ রয়েছে যে, দুটি সাগর পাশাপাশি প্রবাহিত হলেও তাদের মাঝে একটি অদৃশ্য পর্দা থাকে, ফলে তারা একে অপরের সাথে মিশে যায় না। আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞান (Oceanography) নিশ্চিত করেছে যে, লবণাক্ততা, তাপমাত্রা ও ঘনত্বের পার্থক্যের কারণে দুই সাগরের পানি মেশে না।
উম্মী নবী: নিরক্ষর ব্যক্তির পক্ষে কি এমন গ্রন্থ রচনা সম্ভব?
ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, হযরত মুহাম্মদ (সা.) পড়তে বা লিখতে জানতেন না। কুরআনে তাকে “উম্মী নবী” বা নিরক্ষর নবী বলা হয়েছে।
- প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা সত্ত্বেও তিনি যে আইনগত, বৈজ্ঞানিক, ঐতিহাসিক এবং নৈতিক দিক থেকে এমন সুবিন্যস্ত একটি গ্রন্থ উপস্থাপন করেছেন, তা প্রমাণ করে যে এটি সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান।
- নবীজির কোনো মানবীয় শিক্ষক ছিলেন না, যাতে অবিশ্বাসীরা বলতে না পারে যে তিনি অন্য কারও কাছ থেকে শিখে কুরআন রচনা করেছেন।
কুরআনে মুহাম্মদ (সা.)-এর চেয়ে অন্য নবীদের নাম বেশি কেন?
অবিশ্বাসীরা দাবি করে কুরআন মুহাম্মদ (সা.)-এর নিজের লেখা। কিন্তু কোনো মানুষ নিজের লেখা বইয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের বদলে অন্যকে বেশি গুরুত্ব দেয় না।
- কুরআনে হযরত মুসা (আ.)-এর নাম সবচেয়ে বেশি ১৩৬ বার এসেছে।
- ইব্রাহিম (আ.) ৬৯ বার, নূহ (আ.) ৪৩ বার, ঈসা (আ.) ২৫ বার উল্লেখ হয়েছেন।
- অথচ হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নাম সরাসরি মাত্র ৫ বার (মুহাম্মদ ৪ বার ও আহমদ ১ বার) এসেছে। এমনকি কুরআনে আল্লাহ তাকে ভুল শোধরানোর নির্দেশও দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে, কুরআন নবীজির নিজের লেখা নয়, বরং তিনি কেবল বাহক ছিলেন।
অবিকৃত থাকার ঐতিহাসিক প্রমাণ (১৪০০ বছরের মুজেজা)
কুরআনের সবচেয়ে বড় মুজেজা বা অলৌকিকত্ব হলো এর সংরক্ষণ।
- আল্লাহ নিজেই এই গ্রন্থ সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন।
- দেড় হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও কুরআনের একটি শব্দ বা অক্ষরও পরিবর্তিত হয়নি।
- লক্ষ লক্ষ হাফেজ সম্পূর্ণ কুরআন নিজেদের স্মৃতিতে মুখস্থ রেখেছেন, যা মানব ইতিহাসে অন্য কোনো বইয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। মানুষের তৈরি সংবিধান যেখানে কয়েক বছরেই বারবার বদলাতে হয়, সেখানে আল্লাহর দেওয়া এই সংবিধান আজও অবিকৃত।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
প্র: কুরআন কীভাবে নাযিল হয়েছিল?
উ: পবিত্র কুরআন দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে বিভিন্ন ঘটনা ও প্রেক্ষাপটের ওপর ভিত্তি করে ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর ধাপে ধাপে নাযিল হয়।
প্র: কুরআনে কি বিজ্ঞানের কথা বলা আছে?
উ: কুরআন কোনো বিজ্ঞান গ্রন্থ নয়, তবে এতে ভ্রূণতত্ত্ব, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ, সমুদ্রবিজ্ঞান, প্রাণীবিজ্ঞান এবং ফিঙ্গারপ্রিন্ট সম্পর্কিত এমন অনেক সূক্ষ্ম তথ্য রয়েছে, যা আধুনিক বিজ্ঞান মাত্র কয়েক দশক আগে প্রমাণ করেছে।
প্র: মুহাম্মদ (সা.) কে “উম্মী নবী” বলা হয় কেন?
উ: “উম্মী নবী” অর্থ নিরক্ষর নবী, অর্থাৎ যিনি কোনো মানুষের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা লিখন-পঠনবিদ্যা গ্রহণ করেননি। সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে ওহীর মাধ্যমে তিনি জ্ঞান লাভ করেছেন।
প্র: কুরআনে কার নাম সবচেয়ে বেশি উল্লেখ আছে?
উ: পবিত্র কুরআনে হযরত মুসা (আ.)-এর নাম সবচেয়ে বেশি (১৩৬ বার) উল্লেখ করা হয়েছে। বিপরীতে, হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নাম এসেছে মাত্র ৫ বার।
শেষকথা
কুরআনের সাহিত্যিক মান, বৈজ্ঞানিক তথ্যের নিখুঁততা, ঐতিহাসিক নির্ভুলতা এবং ১৪০০ বছর ধরে সম্পূর্ণ অবিকৃত থাকার বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, এটি কোনো মানুষের রচনা হতে পারে না। এটি এমন এক মহাগ্রন্থ যা শুধুমাত্র সর্বজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময় স্রষ্টা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসা সম্ভব। বিশ্বাসীদের জন্য কুরআনের প্রতিটি আয়াতই ঈমান বৃদ্ধির মাধ্যম।
