দীর্ঘ এক মাস সিয়ামের পর মুসলিম উম্মাহর জন্য সবচেয়ে বড় আনন্দের দিন হলো ঈদুল ফিতর। ঈদের দিন সকালে আনন্দ উদযাপনের প্রধান অংশই হলো ঈদের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করা। কিন্তু বছরে মাত্র দু’বার এই নামাজ পড়া হয় বলে অনেকেই ঈদের নামাজের নিয়ম বা অতিরিক্ত ৬ তাকবিরের কথা ভুলে যান।
আপনার এই সমস্যার দ্রুত সমাধান দিতেই আমাদের আজকের এই আয়োজন। চলুন, শুরুতেই জেনে নিই সংক্ষেপে ঈদের নামাজ পড়ার মূল পদ্ধতি।
এক নজরে ঈদুল ফিতরের নামাজের নিয়ম
ঈদুল ফিতরের নামাজ মোট দুই রাকাত এবং এটি ওয়াজিব। এই নামাজে সাধারণ নামাজের চেয়ে অতিরিক্ত ৬টি তাকবির দিতে হয়। প্রথম রাকাতে সানা পড়ার পর ৩টি অতিরিক্ত তাকবির দিতে হয় এবং দ্বিতীয় রাকাতে রুকুতে যাওয়ার আগে আরও ৩টি অতিরিক্ত তাকবির দিতে হয়। ঈদের নামাজে কোনো আজান বা ইকামত নেই এবং নামাজের পর খুতবা শোনা সুন্নাত।
ঈদুল ফিতরের নামাজের নিয়ত
নামাজের মূল বিষয় হলো মনের ইচ্ছা বা সংকল্প। মুখে উচ্চারণ করা জরুরি নয়, তবে মনে মনে নিয়ত করা ফরজ। আপনি চাইলে আরবি অথবা বাংলায় ঈদের নামাজের নিয়ত করতে পারেন।
বাংলায় নিয়ত: > “আমি কেবলামুখী হয়ে এই ইমামের পেছনে অতিরিক্ত ৬ তাকবিরের সাথে ঈদুল ফিতরের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করছি, আল্লাহু আকবার।”
আরবি নিয়ত:
“নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তা’আলা, রাকয়াতাই সালাতি ইদিল ফিতর, মায়া সিত্তাতে তাকবীরাতি ওয়াজিবুল্লাহি তা’আলা, ইকতাদাইতু বিহাজাল ইমাম, মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কা’বাতিশ শারীফাতি, আল্লাহু আকবার।”
ঈদের নামাজ পড়ার নিয়ম
বাংলাদেশী মুসলমানদের জন্য হানাফি মাজহাব অনুযায়ী ঈদের নামাজ পড়ার নিয়ম ধাপে ধাপে নিচে দেওয়া হলো:
প্রথম রাকাতের নিয়ম
- নিয়ত ও তাকবিরে তাহরিমা: প্রথমে নিয়ত করে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে হাত বাঁধতে হবে।
- সানা পাঠ: হাত বেঁধে নীরবে সানা (সুবহানাকা আল্লাহুম্মা…) পড়তে হবে।
- অতিরিক্ত ৩ তাকবির: * এরপর ইমামের সাথে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে প্রথম তাকবির দিয়ে হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে ছেড়ে দিন।
- দ্বিতীয়বার ‘আল্লাহু আকবার’ বলে তাকবির দিয়ে একইভাবে হাত ছেড়ে দিন।
- তৃতীয়বার ‘আল্লাহু আকবার’ বলে তাকবির দিয়ে হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে এবার নাভির নিচে হাত বেঁধে নিন।
- কিরাত ও রুকু-সিজদাহ: এরপর ইমাম সাহেব সূরা ফাতিহা এবং অন্য একটি সূরা মেলাবেন। আপনি নীরবে শুনবেন। তারপর সাধারণ নামাজের মতোই রুকু ও সিজদাহ করে প্রথম রাকাত শেষ করতে হবে।
দ্বিতীয় রাকাতের নিয়ম
- কিরাত পাঠ: দ্বিতীয় রাকাতের শুরুতে ইমাম সাহেব সূরা ফাতিহা এবং অন্য একটি সূরা পড়বেন।
- অতিরিক্ত ৩ তাকবির: * সূরা মেলানো শেষ হলে রুকুতে যাওয়ার আগে ইমামের সাথে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে প্রথম তাকবির দিয়ে হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে ছেড়ে দিন।
- দ্বিতীয় তাকবির বলে হাত ছেড়ে দিন।
- তৃতীয় তাকবির বলেও হাত ছেড়ে দিন।
- রুকুর তাকবির: চতুর্থবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলে আর হাত না উঠিয়ে সরাসরি রুকুতে চলে যান।
- নামাজ শেষ করা: এরপর সিজদাহ শেষ করে তাশাহহুদ, দরুদ শরিফ এবং দোয়া মাসুরা পড়ে সালাম ফেরানোর মাধ্যমে দুই রাকাত নামাজ সম্পন্ন করুন।
ঈদের তাকবির (তাকবিরে তাশরিক)
ঈদের দিন সকাল থেকে নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় রাস্তায় বা ঈদগাহে বসে মৃদু স্বরে ঈদের তাকবির পাঠ করা সুন্নাত।
তাকবিরটি হলো:
“আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।”
অর্থ: আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান। আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান। এবং সমস্ত প্রশংসা কেবল আল্লাহর জন্যই।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর
১. ঈদের নামাজে কি আজান ও ইকামত আছে?
না, ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহা—কোনো ঈদের নামাজেই আজান এবং ইকামত নেই। সরাসরি ইমাম সাহেবের সাথে নিয়ত করে নামাজ শুরু করতে হয়।
২. ঈদের নামাজের খুতবা কখন পড়তে হয়?
জুমার নামাজে খুতবা নামাজের আগে পড়া হলেও, ঈদের নামাজে খুতবা পড়তে হয় নামাজের পর। নামাজের পর ইমাম সাহেবের দুটি খুতবা শোনা মুসল্লিদের জন্য সুন্নাত (অনেকের মতে ওয়াজিব)। খুতবা না শুনে উঠে যাওয়া মাকরুহ।
৩. ঈদের নামাজ ছুটে গেলে বা রাকাত না পেলে কী করব?
যদি কেউ ইমাম সাহেবের সাথে ঈদের নামাজ সম্পূর্ণ না পান, তবে ইমামের সালাম ফেরানোর পর নিজে দাঁড়িয়ে বাকি নামাজটুকু আদায় করে নেবেন। যদি ইমাম রুকুতে থাকেন, তবে তাকবিরে তাহরিমা বেঁধে অতিরিক্ত তাকবিরগুলো দাঁড়িয়ে বলে তারপর রুকুতে যাবেন।
৪. মহিলাদের ঈদের নামাজ পড়ার নিয়ম কি আলাদা?
ঈদের নামাজ পুরুষদের জন্য ওয়াজিব এবং এটি জামাতের সাথে ময়দানে বা মসজিদে আদায় করতে হয়। মহিলাদের জন্য ঘরে একা একা ঈদের নামাজ পড়ার বিধান নেই। তবে ইসলামিক পরিবেশে পর্দার সাথে ঈদগাহে ব্যবস্থা থাকলে তারা জামাতে অংশ নিতে পারেন।
আশা করি, আপনাকে ঈদুল ফিতরের নামাজের নিয়ম ঈদুল ফিতর সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা দিয়েছে। ঈদ আপনার জীবনে হয়ে উঠুক আনন্দের। ঈদ মোবারক।
